ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকাল এক্সপ্লেইনার

নির্বাচনে এআই দিয়ে অপপ্রচার, ইসি কী করবে

নির্বাচনে এআই দিয়ে অপপ্রচার, ইসি কী করবে
×

প্রতীকী ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বানানো।

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৫ | ১৯:৪১ | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২৫ | ১৩:১২

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২ (আরপিও) এর সংশোধন চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বলা হচ্ছে এতে ইসির হারানো ক্ষমতা ফিরছে। পুরো আসনের ফল বাতিলের ক্ষমতা পুনর্বহালসহ সংশোধনীতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে ‘না ভোট’ এর বিধান। নতুন করে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে অপপ্রচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধানও। প্রশ্ন উঠেছে, এই বিধান কীভাবে প্রয়োগ করবে ইসি।

আরপিও হলো নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত মূল আইন। নির্বাচন নিয়ে যেসব গণঅধিকার আছে কমিশন কীভাবে সেগুলো রক্ষা করবে সেটিই বলা আছে আরপিওতে। 

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সবশেষ ২০২৩ সালে আরপিওতে সংশোধনী আনা হয়েছিল। তখন এআই সংক্রান্ত কোনো বিধান ছিল না। পরের বছর ২০২৪ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই বছর বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশেও জাতীয় নির্বাচন হয়। ওই নির্বাচন যজ্ঞের মাঝে বৈশ্বিক ঝুঁকির পূর্বাভাস নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। 

প্রতিবেদনে পরবর্তী দুই বছরে সবচেয়ে গুরুতর বৈশ্বিক ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয় ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য। পূর্বাভাসে বলা হয়, আগামী দুই বছরে প্রায় তিনশ কোটি মানুষ ভোট দিতে যাবে। এই সময়ে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর টুলের ব্যাপক ব্যবহার নতুনভাবে নির্বাচিত সরকারের বৈধতাকে দুর্বল করতে পারে। 

ইসি যা করতে চায়
আরপিও সংশোধনী চূড়ান্ত করা নিয়ে গত রোববার সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। ওইদিন তিনি জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অপপ্রচার, মিথ্যাচার বা অপবাদ ছড়ালে প্রার্থী, রাজনৈতিক দল, প্রতিষ্ঠান বা গণমাধ্যম-সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

কিন্তু এর প্রয়োগ কীভাবে হবে? ৭ আগস্ট ইসির নবম সভা শেষে মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, এআইয়ের অপব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রতিহতের বিষয়টি নির্বাচনী আচরণবিধিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। 

নির্বাচনী আচরণবিধি শুধু প্রার্থী এবং দলের জন্য। সেক্ষেত্রে তাদের হয়ে অন্য কেউ এআইয়ের অপব্যহার করতে পারে। মো. সানাউল্লাহ বলেন, এটা দেশের ভেতর থেকে করবে, বাইরে থেকেও করবে। এগুলো প্রতিহতের জন্য একটা কমিটি গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। 

অপতথ্য রোধে ইন্টারনেটের গতি কি কমানো হতে পারে? ইসি সানাউল্লাহ বলেন, প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যান্ডউইথ না কমিয়ে, কোনো ধরনের সেবার বিঘ্ন না ঘটিয়ে নির্বাচন আয়োজন করা। একান্তই বাধ্য না হলে কোনো প্ল্যাটফর্মকে লিমিট করার ইচ্ছা কমিশনের নেই।

বিশ্লেষক যা বলছেন
ইসির অতিরিক্ত সচিব ছিলেন জেসমিন টুলি। তিনি এখন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য। তিনি বলছেন, ইসির নিজস্ব কোনো নির্বাচনী সাইবার সিকিউরিটি সেল, শাখা বা ইউনিট নেই। অপতথ্য রোধে ফ্যাক্ট চেকিং ও মনিটরিং সেলের দরকার হতে পারে। 

জেসমিন টুলি বলছেন, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রচারণার ক্ষেত্রে ভোটাররা বিভ্রান্ত হতে পারেন। এখানে কোনো প্রার্থী, কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী অপপ্রচার চালাতে পারে। সব ক্ষেত্রে দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তিকে শাস্তির আওতায় আনাটা ইসির দায়িত্ব। আশা করি, নির্বাচনী খরচের ক্ষেত্রে ৩০০ আসনের জন্য ৩০০ মনিটরিং সেল গঠন করবে ইসি।

ভোটে এআই নির্ভর যত প্রোপাগান্ডা
দ্য কনভারসেশনের নিবন্ধ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে স্লোভাকিয়ার নির্বাচনের কয়েক দিন আগে নির্বাচনী ছলচাতুরী নিয়ে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। যেটি ছিল এআই দিয়ে তৈরি। ২০২৪ সালেও এমন ঘটনা বহুবার ঘটে। তবে এগুলোর প্রভাব কেমন ছিল তা স্পষ্ট হওয়া যায়নি।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে জো বাইডেনের কণ্ঠ সাদৃশ্য একটি অডিও ছড়ায়। এতে শোনা যায়, নিউ হ্যাম্পশায়ারের ভোটারদের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে (দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া) ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন বাইডেন। 

যুক্তরাষ্ট্রের ওই নির্বাচনী মৌসুমে আঘাত হেনেছিল হারিকেন হেলেন। তখনও ডেমোক্রেটদের ব্যর্থতা দেখাতে এআই দিয়ে বানানো দুর্যোগ কবলিত এলাকার ছবি ছড়ানো হয়। ওই নির্বাচনে ইরানের প্রভাব নিয়েও বিভিন্ন অপতথ্য ছড়ানো হয়। ওপেনএআই তখন দাবি করেছিল, চ্যাটজিপিটির মাধ্যমে ভুয়া নিবন্ধ তৈরি করে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ছড়ানো হচ্ছে। এমন অভিযোগে তারা বেশকিছু অ্যাকাউন্টও বন্ধ করে দেয়। 

ওপেনএআই কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, অপতথ্য ছড়ানোর পেছনে ‘স্টর্ম-২০৩৫’ নামের এক গোপন ইরানি সংগঠনের যোগসূত্র পায় তারা। যেটি রাজনৈতিক খবর প্রকাশের ওয়েবসাইট চালুর মাধ্যমে মার্কিন ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। 

যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও নীতি বিষয়ক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ব্রেনান সেন্টার ফর জাস্টিস এর তথ্য অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ায় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে শীর্ষে থাকা এক সাবেক জেনারেল নিজেকে তরুণ ভোটারদের কাছে আরও মানবিকভাবে উপস্থাপনের জন্য এআইয়ের তৈরি কার্টুন ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু দেশের সামরিক একনায়কতন্ত্রে তাঁর আগের ভূমিকার কারণে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।

পাকিস্তানে, কারাবন্দি ইমরান খান তাঁর সমর্থকদের উদ্দেশে এআইয়ের তৈরি ভিডিও ব্যবহার করেন। বেলারুশের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য এক প্রার্থীর নামে প্রচার চালানো হয়। পরে দেখা যায় ওই প্রার্থী আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চ্যাটবট। 

ব্রেনান সেন্টারের পরামর্শ
ডিপফেক প্রযুক্তি যতই উন্নত ও সহজলভ্য হয়ে উঠছে, ততই তা বিশ্বের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য একটি গুরুতর হুমকি তৈরি করছে। এ ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই পরিস্থিতির প্রাসঙ্গিকতা উপলব্ধি করতে হবে। এবং নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্রিয় পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় গুরুত্ব দিতে হবে। যেমন বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে নতুন নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করতেই পারে। তাদের সে ইচ্ছাকেও সম্মান জানাতে হবে।

ভোটারদের কখন, কোথায় এবং কীভাবে ভোট দিতে হবে এ নিয়ে কেউ বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ালে তখন অবশ্যই নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপ নিতে হবে।

আরও পড়ুন

×