ফিরে দেখা মুর্তজা
মুর্তজা বশীর
মিরাজুল ইসলাম
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৫ | ১৭:৫৪
মুর্তজা বশীর আমার বন্ধু ছিলেন। দীর্ঘ দুই দশকের পরিচয়ে তাঁকে নিয়ে লিখেছিলাম ‘নার্সিসাসে প্রজাপতি’। যিনি আপন আলোয় বিভোর থাকতে ভালোবাসতেন।
বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পকলার পথিকৃৎ এই শিল্পী তাঁর পছন্দের শিল্পী পাবলো পিকাসোর মতো অন্তত বিরানব্বই বছর বাঁচতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে চলে যেতে হয়েছিল অষ্টাশি বছর বয়সে।
১৯৩২ সালের ১৭ আগস্ট ঢাকায় ফুলার রোডে জন্ম নেওয়া মুর্তজা বশীর ছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ৯ জন সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। কিন্তু আজীবন লড়াই করে গেছেন বটগাছের মতো পিতার বিশাল ছায়া হতে নিজেকে মুক্ত করে নিজ পরিচয়ে পরিচিতি লাভ করার জন্য।
সাফল্য আর সুনামের চূড়ায় আবার নতুন করে উপলব্ধি করেছিলেন তিনি আদতে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পুত্র হিসেবে তাঁর ছায়াতেই বেঁচে আছেন। পিতা-পুত্রের এই অমোঘ বন্ধন শিল্পরসিকদের সব সময় ভাবনার খোরাক জোগায়।
মুর্তজা বশীর ১৯৪৯ সালে ভর্তি হন ঢাকা সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউটে (বর্তমান চারুকলা ইনস্টিটিউট) দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র হিসেবে। ক্রমে কলকাতা, ইতালি, ফ্রান্সে চারুকলাবিষয়ক অধীতবিদ্যা অর্জন করেন। ১৯৫৮ সালে জীবনের প্রথম একক প্রদর্শনী করেন ইতালির ফ্লোরেন্সে গ্যালারি লা পারমানেন্তে।
শতাধিক প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেশে-বিদেশে ‘বাংলার পিকাসো’ হিসেবে প্রভূত সুনাম অর্জন করলেও তাঁর কাজের দর্শনের সঙ্গে দিয়াগো রিভেরার ছায়া দেখতে পাই। মূর্ত হতে বিমূর্ত মাধ্যমে শিল্পীর পথচলা পরবর্তী সকল প্রজন্মের শিল্পীদের একাধারে আদর্শ ও অনুপ্রেরণা জুগিয়ে এসেছে।
১৯৭৩ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলার শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছিলেন। মূলত তেলরঙে স্বচ্ছন্দ হলেও ম্যুরাল শিল্পে তাঁর অগ্রগণ্য অনস্বীকার্য। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অক্ষয় বট’, বাংলাদেশ ব্যাংকের ঢাকা ও সিলেটে ম্যুরাল শিল্পকর্ম উল্লেখযোগ্য।
১৯৫১ সালে তৎকালীন ‘ঢাকা আর্ট গ্রুপ’-এর মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে সর্বপ্রথম যে চারুকলা প্রদর্শনী হয়, তরুণ মুর্তজা অংশ নিয়েছিলেন জয়নুল আবেদিন, সফিউদ্দীন আহমেদ, আনোয়ারুল হক, আব্দুর রাজ্জাক, কামরুল হাসান প্রমুখ প্রথিতযশা শিল্পীর সঙ্গে। সেই থেকে তাঁর নিরবচ্ছিন্ন পথচলা শুরু।
চিত্রকলার ওপর শিক্ষা গ্রহণ করেছেন ইতালির ফ্লোরেন্সে। সংগ্রামী শিল্পীজীবন কাটিয়েছেন লন্ডন, প্যারিস, করাচি, লাহোর ও কলকাতায়। ১৯৫৯ সালে করাচিতে বাঙালি শিল্পী হিসেবে মুর্তজার প্রথম একক প্রদর্শনী হয়েছিল।
১৯৫২ সালে ভাষাসৈনিক হিসেবে এঁকেছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলনের জন্য অসামান্য ড্রয়িং, পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ম্যুরাল, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি উৎসর্গকৃত ‘এপিটাফ’ সিরিজ, সমাজের দমবন্ধ করা বৈষম্য ও ব্যক্তিগত জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের বিমূর্ত ক্যানভাসের ‘দেয়াল’ সিরিজ, অন্তর্গত বোধের আনন্দ আখ্যানমূলক রং মাখানো ‘পাখা’ সিরিজ, আধ্যাত্মিক অনুভাবনার ‘কলেমা’ সিরিজসহ মূর্ত-বিমূর্ত অসংখ্য শিল্পকর্মে আমাদের শিল্পজগৎকে ঋণী করে গেছেন।
১৯৮০ সালে ‘একুশে পদক’ ও ২০১৯ সালে ‘স্বাধীনতা পদক’ শিল্পীর কাজের স্বীকৃতির প্রাপ্তিকে সম্পূর্ণ করেছে। আঁকাআঁকি জগতের বাইরে মুর্তজার রয়েছে নিজস্ব লেখক ও গবেষক সত্তা। ১৯৭৮ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রার ঈদসংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয় তাঁর আলোচিত উপন্যাস ‘আলট্রামেরিন’।
তবে শিল্পীর প্রথম ছোটগল্প ‘পার্কের একটি পরিবার’ প্রকাশিত হয় ১৯৫০ সালে দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতায়। তা ছাড়া মুর্তজা প্রকাশ করেছেন গল্প সংকলন ‘গল্পসমগ্র’ ও চারটি কাব্যগ্রন্থ। সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থের নাম ‘সাদায় এলিজি’।
তিনি ছিলেন বামপন্থি আদর্শে উজ্জীবিত। ছাত্রাবস্থায় ১৯৪৭ সালে বগুড়া করোনেশন ইনস্টিটিউটে নবম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন। সেই সময় পরিচয় হয় কমিউনিস্ট নেতা ভবানী সেনের সঙ্গে। মুর্তজা অটোগ্রাফ চাইলে ভবানী সেন লিখলেন, ‘আর্টিস্টের কাজ হলো শোষিত জনগণের ভাব ও দুঃখ-দুর্দশাকে চিত্রের ভেতর দিয়ে এমনভাবে ফুটিয়ে তোলা, যাতে সমাজে সে আর্ট নবজীবন সৃষ্টি করতে পারে।’
মুর্তজার সঙ্গে পরিচয়ের পর দেখেছি, ভবানী সেনের এই লাইনটি তাঁর মুখস্থ। সঙ্গে এটাও বলতে ভুলতেন না, ১৯৫০ সালে হাজং বিদ্রোহের সময় পার্টির নির্দেশে পোস্টার লাগাতে গিয়ে তিনি পাঁচ মাস কারাগারে ছিলেন। মূলত সেই অনুপ্রেরণা থেকেই তিনি ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন এবং মিছিলে অংশ নিয়ে গুলি খাওয়া শহীদ আবুল বরকতকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। নিজের ঘামে ভেজা রুমাল নিংড়ে মৃত্যুপথযাত্রী বরকতের তৃষ্ণা মেটানোর চেষ্টা করেছিলেন।
পরবর্তী দশকে ইতালি ও ফ্রান্সে পশ্চিমা শিল্পের সঙ্গে নিবিড় সম্পৃক্তিতে মুর্তজার চিত্রভাষায় পরিবর্তন আসে। সেই সঙ্গে ভারতীয় অজন্তা-ইলোরা-কাংড়া-রাজপুত ঘরানার সঙ্গে মুসলমানি সংস্কৃতির ঘাত-প্রতিঘাতে মুর্তজার শিল্পভাষা নিজস্বতা ধারণ করে। একদিকে পাশ্চাত্যের রেমব্রান্ট-পিকাসো-রিভেরা-শাগাল প্রমুখ এবং অন্যদিকে ভারতীয় তেরাকেটা-লোকশিল্প, মোগল মিনিয়েচার মুর্তজাকে প্রলুব্ধ করেছে।
ঢাকা আর্ট স্কুলে জয়নুল-সফিউদ্দীন-কামরুল ছিলেন তাঁর শিক্ষাগুরু, কলকাতায় প্যালেট নাইফে ছবি আঁকার কৃৎকৌশল শিখেছেন পরিতোষ সেনের কাছ থেকে, জলরঙে শহুরে দৃশ্য আঁকার কৌশল শিখেছিলেন শিল্পী দিলীপ দাসগুপ্তের মাধ্যমে এবং শিল্পী রামকিঙ্কর বেজের কাছ থেকে শিখেছেন রঙের মিশ্র ব্যবহারের কৌশল।
বিশেষ করে নারীর মুখায়ব বা ফিগার আঁকার ক্ষেত্রে মুর্তজা ছিলেন ব্যতিক্রম। এই ধারা তিনি রপ্ত করেছিলেন ১৯৫৬ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে পা রাখার পর। বলা যায়, আধুনিক ইউরোপিয়ান চিত্রকলার সঙ্গে মুর্তজা নতুনভাবে পরিচিত হলেন ফ্লেরেন্স এবং পরে লন্ডনে ছবি আঁকা সূত্রে।
ব্যক্তিজীবনে পিকাসোর মতো ‘চিরসবুজ’ ছিলেন মনের গহিনে। শিল্পের বিষয় বৈচিত্র্য নিয়ে প্রতিনিয়ত গবেষণা করেছেন। ছবি আঁকার পাশাপাশি শেষ বয়সে ধর্মের প্রতি ঝুঁকেছিলেন। একাধারে নগ্নিকার ছবি এবং পরবর্তী সময়ে কলেমা তৈয়বা নিয়ে ইসলামী ক্যালিগ্রাফি আঁকার মধ্যে শিল্পীর কোনো সংকোচ ছিল না। ছবি আঁকা এবং ধর্ম পালনের এমন যুগলবন্দি নৈরাশ্যবাদীদের হতাশ করেছিল। ধার্মিকতা নিয়ে মুর্তজার নিজস্ব বয়ান ছিল। বলতেন, ইউরোপের ওল্ডমাস্টাররা বাইবেল নিয়ে ছবি আঁকলে তাদের ধার্মিক বলা হয় না, কিন্তু এ দেশে একজন শিল্পী নামাজ-রোজা করলে তাকে ‘ইসলামিস্ট’ তকমা কেন দেওয়া হবে?
মুর্তজার অন্তস্থ মনোভূমিতে নারীর প্রতি ভালোবাসায় সমিল খুঁজে পাই খানিকটা ব্রিটিশ শিল্পী লুসিয়ান ফ্রয়েডের সঙ্গে। মুর্তজার মতো শিল্পী ফ্রয়েড বেঁচেছিলেন অষ্টাশি বছর। ছবি আঁকার বিষয় হিসেবে ফ্রয়েডের মতো মুর্তজাও পছন্দ করতেন তরুণী এবং মধ্যবয়সী রমণী। ব্যতিক্রম ছিল বিভিন্ন সময়ে তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর আঁকা পোর্ট্রেটগুলো। ফ্রয়েড বিখ্যাত সেলিব্রেটিদের পোর্ট্রেট ও ন্যুড এঁকেছেন অসংখ্য। ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথ থেকে শুরু করে সুপার মডেল কেট মস, জেরি হল প্রমুখকে ক্যানভাসে মূর্ত করেছেন।
অন্যদিকে মুর্তজা এঁকেছেন অসংখ্য প্রিয়মুখ। পাশাপাশি এঁকেছেন বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি নারী চরিত্রদের। যেমন– কপিলা, আনোয়ারা, রুবী, বাসন্তী, জমিলা, টুনি, সালেহা ছাড়াও অসংখ্য পুরুষ চরিত্র। শৈল্পিক ও জীবিকার তাড়নায় ইতালি, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে ন্যুড এঁকেছেন প্রকাশ্যে; কিন্তু সামাজিক বাধ্যবাধকতায় ঢাকা-চট্টগ্রামে এঁকেছেন গোপনে।
শতাধিক প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেশে-বিদেশে ‘বাংলার পিকাসো’ হিসেবে সুনাম অর্জন করলেও আমার ব্যক্তিগত মতামতে তাঁর কাজের দর্শনের সঙ্গে মেক্সিকোর ম্যুরাল শিল্পী দিয়াগো রিভেরার ছায়া দেখতে পেয়েছি। বিশেষ করে ফিলাডেলফিয়া ও ডেট্রয়েটে সরাসরি রিভেরার কাজ দেখার পর তুলনাটা পোক্ত হয়।
রিভেরার মতো মুর্তজা নিজেকে শোষিত সমাজের একজন ভাবতেন। আমার ধারণা, প্রকাশ্যে পিকাসোর কিউবিজম ধারার সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করলেও গোপনে অনুসরণ করতেন রিভেরার দর্শন। ধারণাটা পোক্ত হয়েছিল যখন মুর্তজার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে প্রথম দেখেছিলাম দিয়াগো রিভেরার লেখা আত্মজীবনী। ‘মাই আর্ট, মাই লাইফ’ বইটি ১৯৯৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণকালে সংগ্রহ করেছিলেন।
১৯১০ থেকে ১৯৩০ সাল অবধি রিভেরার আঁকা ফিগারেটিভ কাজের সঙ্গে মুর্তজার ফিগারের প্রচ্ছন্ন সমিল খুঁজে পাই। রিভেরার মতোই ম্যুরাল শিল্পে মুর্তজার নিজস্ব ঐতিহ্য এবং শিকড়ের ভাবনা ছিল। অন্যদিকে পিকাসোর কাজের সঙ্গে সমিলতা অস্বীকার করতেন মুর্তজা। বলতেন, গ্রিক ইট্রুসকান ঘরানা তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল আয়তনয়না নারীর মুখায়ব আঁকতে।
ক্ষণজন্মা চিত্রপরিচালক জহির রায়হান ১৯৬৯ সালে মুর্তজার সার্বিকতা নিয়ে লিখেছিলেন, ‘মুর্তজা বশীর একজন নিঃসঙ্গ মানুষ। নিঃসঙ্গ চিত্রকর। নিঃসঙ্গ লেখক। তাঁর জীবনের এই নিঃসঙ্গতার অন্ধকারের মধ্যে থেকেও তিনি চান হীরের মতো উজ্জ্বল দ্যুতি। তিনি মানুষকে ঘৃণা করেন। ঘৃণা করেন বলেই হয়তো তাদের গভীরভাবে ভালোবাসতেও জানেন।’
আজ এত বছর পরও কথাগুলো প্রাসঙ্গিক মনে হয়। মনে হয়, মুর্তজা এখনও মাথা নেড়ে বলছেন, ‘জানো তো, আমার মতো করে কেউ আগে এই কাজটি করেনি। আমিই প্রথম এমন করে আঁকলাম।’
মুর্তজার গড়া মূর্ত-বিমূর্ত কাজগুলো খুঁটিয়ে দেখলে কথাটা অমূলক মনে হয় না।
১৯৮০ সালে শিল্পী নিজ সমাধির জন্য এপিটাফে লিখে রেখেছিলেন। মৃত্যুচিন্তা তখন থেকেই তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াত। পাকিস্তানের বিখ্যাত ছোটগল্পকার সাদাত হাসান মান্টো নিজের এপিটাফে যা লিখতে চেয়েছিলেন, তা ধর্ম-সমাজ এবং লোকভয়ে তাঁর পরিবার লিখতে পারেনি। কিন্তু মুর্তজার ক্ষেত্রে তা হয়নি। বনানী কবরস্থানে মুর্তজার এপিটাফে কোরআন শরিফের সুরা ইব্রাহিমের ২৪ নম্বর আয়াতের ওপরে বড় অক্ষরে লেখা আছে, ‘সে পাখি হতে চেয়েছিল, কিন্তু তার ডানা ছিল না।’
লেখক : মিনেসোটা, যুক্তরাষ্ট্র
- বিষয় :
- চিত্রকর্ম
