জবানবন্দিতে ডা. জাকিয়া
গণ-অভ্যুত্থানে ৪৯৩ জন চিরতরে এক চোখ হারিয়েছেন
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৫ | ২১:৩৪
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় নির্বিচারে গুলি চালিয়ে নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের হতাহতের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন প্রসিকিউশনের আরও পাঁচ সাক্ষী। এরা হলেন-জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী, সহকারী অধ্যাপক (রেটিনা) ডা. জাকিয়া সুলতানা নিলা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. ইদ্রিস, লক্ষীপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী আমেনা আক্তার ও দেবীদ্বারের শহীদ রাজ্জাকের মা হাসনে আরা বেগম।
তারা হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা হিসেবে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ জড়িতদের বিচার দাবি করেন।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সোমবার অষ্টম দিনে ৮১ জনের মধ্যে ২৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলো। পরে তাদের জেরা করেন পলাতক আসামিপক্ষের (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবী আমির হোসেন। মঙ্গলবার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে। শুনানির সময় ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন।
২১তম সাক্ষীর জবানবন্দি: জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (রেটিনা) ডা. জাকিয়া সুলতানা নীলা জবানবন্দিতে বলেন, গত বছর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ১৭ জুলাই থেকে আমাদের হাসপাতালে রোগী আসা শুরু হয়। ওইদিন আমরা পিলেটবিদ্ধ পাঁচ জন রোগী পেয়েছিলাম। পরদিন ১৮ জুলাই ছিল একটি রক্তস্নাত দিন। ওইদিন দুপুরের দিকে আমার কাছে খবর আসে, হাসপাতালে অনেক আহত রোগী এসেছে। ওইদিন প্রায় একশ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়। এর বাইরে আনুমানিক আরও একশ রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে আমি জরুরি বিভাগে এসে একটি ভয়াবহ চিত্র দেখতে পাই। সেদিন যারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছিল তাদের বয়স ছিল ১৪ থেকে ২৫। তাদের কেউ কেউ এক হাত দিয়ে এক চোখ, দুই হাত দিয়ে দুই চোখ ধরে আছে। ওইদিন রাত ৯টার দিকে আমরা হাসপাতালের দশটা টেবিলে অপারেশন করতে থাকি। পরদিন শুক্রবার ১৯ জুলাই হাসপাতালে প্রায় একই চিত্র দেখতে পাই। ওইদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত হাসপাতালের দশটা টেবিলে অস্ত্রপাচার হয়। ওইদিন হাসপাতালে যারা চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন তাদের অধিকাংশ পিলেট ও বুলেটের আঘাতে আহত হন। অধিকাংশ রোগীর কর্নিয়া ও তাদের চোখের ভেতরের সাদা অংশ ছিদ্র হয়ে গেছে, অনেকের চোখ ফেটে বের হয়ে গিয়েছিল। চোখের রেটিনায় আঘাত প্রাপ্ত হওয়ায় রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। ৪, ৫ ও ৬ আগস্ট আমরা অসংখ্য রোগী গ্রহণ করি এবং তাদের চোখে অপারেশন করা হয়।
এই সাক্ষী বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসা আহত ৪৯৩ জন একচোখ চিরতরে হারিয়েছেন। ১১ জন দুই চোখ চিরতরে হারিয়েছেন। ২৮ জন দুই চোখের দৃষ্টি স্বল্পতায় ভুগছেন। ৪৭ জন একচোখে দৃষ্টি স্বল্পতায় ভুগছেন। এছাড়া ৪৩ জন একচোখে গুরুতর দৃষ্টি স্বল্পতায় ভুগছেন। ওই সময়ে রোগীরা ভীত সন্ত্রস্ত ছিল। নিরাপত্তার কারণে অনেক রোগী তাদের নাম ঠিকানা গোপন করে ছদ্মনাম দিয়েছেন। মোবাইল নম্বর ভুল দিয়েছেন এবং তাদের পরিচয়ও ভুল দিয়েছেন।
২২তম সাক্ষীর জবানবন্দি: ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. ইদ্রিস। তিনি জুলাই আন্দোলনে শহীদ মারুফ হোসেনের বাবা। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ১৯ জুলাই দুপুরে খাওয়া-দাওয়া শেষে সাড়ে ৩টার দিকে আমার ছেলে এইচএসসি শিক্ষার্থী মারুফ আন্দোলনের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। পরে তার মামা ফয়সালকে ফোন করে বাসা থেকে ডেকে নেয়। কিছুক্ষণ পর ফয়সাল আমাকে ফোন করে জানায় যে, রামপুরা ব্রিজের উপর থেকে পুলিশ, বিজিপি ও ছাত্রলীগ আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ছুঁড়ছে। পৌনে ৬টার দিকে সে আবার জানায় যে, মারুফ গুলিবিদ্ধ হয়েছে বাড্ডা ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে। তখন তাকে এএমজেড হাসপাতালে নিয়ে যায়, সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে নেওয়ার পথে রামপুরা ব্রিজের ওপর আওয়ামী লীগ, পুলিশ, বিজিবি মিলে আমার ছেলেকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি আটকায়। তখন মারুফের শরীরে অক্সিজেন লাগানো ছিল, সে তখন বেঁচে ছিল। ১৫-২০ মিনিট ধরে রেখে পুলিশ জানায় যে, সে মারা গেছে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার দরকার নেই। আমার ছেলের গুলিবিদ্ধ স্থানটি তখন গামছা দিয়ে পেঁছানো ছিল। তখন তার রাইফেলের বাট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখে বলে সে মারা গেছে তাকে বাসায় নিয়ে যাও, তখন আমাদের ছেলে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। সেখান থেকে সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়। এরপর ৭টা ২০ মিনিটের দিকে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তখন আমার ছেলের লাশ নিয়ে যেতে চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পোস্টমর্টেম ছাড়া লাশ দিতে চায়নি। দুই দিন পর ২১ জুলাই পোস্টমর্টেম করে আমার ছেলের লাশ হস্তান্তর করা হয়। পুলিশি বাধার কারণে আমার ছেলের লাশের পোস্টমর্টেম করতে দেরি হয়েছে। তবে বাড্ডা থানার ওসি তার এলাকায় এমন ঘটনা ঘটেনি বলে অস্বীকার করেন।
তিনি জানান, পূর্ব বাড্ডার কবরস্থানে ছেলের লাশ দাফন করা হয়। ছেলে হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা হিসেবে শেখ হাসিনা, ওবায়েদুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, স্থানীয় এমপি ওয়াকিল উদ্দিন, কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম ও বিজিবির রেজোয়ানের বিচার দাবি করেন তিনি।
২৩তম সাক্ষীর জবানবন্দি: প্রসিকিউশনের ২৩তম সাক্ষী লক্ষীপুর সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ২০ বছর বয়সী আমেনা আক্তার জবানবন্দিতে বলেন, ‘গত বছর ৪ আগস্ট সকাল ৯টার দিকে শহরের বাগবাগি মোড়ে সমবেত হয়ে ৯টার সময় ঝুমুর চত্তরে আসি। সেখানে ১২টা পর্যন্ত মিছিল হয়। ওই সময় মাদাম ব্রিজ এলাকা থেকে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের ১২০-১৩০ জন সশস্ত্র অবস্থায় আমাদের ওপর হামলা চালায়। মাদাম ব্রিজের কাছে যাওয়ার পর বিপরীত দিক থেকে ছাত্রলীগের লোকজনের গুলিতে একজন ছাত্র গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যায়। পরে জেনেছি তার নাম ছাদ আল আফনান। আফনান সেখানেই মারা যায়।’
সাক্ষী তার জবানবন্দিতে বলেন, ‘ওই সময় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা আমাকে ধাওয়া করে ধরে ফেলে মারধর করতে থাকে। অজ্ঞাতনামা দুজন আন্দোলনকারী আমাকে উদ্ধার করে লক্ষীপুর আধুনিক হাসপাতালে নিয়ে যায়। আমি সেখানে দুই দিন চিকিৎসাধীন ছিলাম। পরে বাড়ি গিয়ে শুনেছি ৪ আগস্ট আরও ৪ থেকে ৫ জন শহীদ হয়েছে। ২০০ এর বেশি আহত হয়েছে।’
এই ঘটনার জন্য শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনসহ দায়ীদের বিচার চান এই সাক্ষী।
২৪তম সাক্ষীর জবানবন্দি: কুমিল্লার দেবিদ্বারে গুলিতে বাসচালক আবদুর রাজ্জাকের মা ৫৫ বছর বয়সী হাসনে আরা বেগম তার জবানবন্দিতে বলেন, গত বছর ৪ আগস্ট সকালে আমার ছেলে রাজ্জাক নাস্তা খেয়ে আন্দোলনে যায়। বেলা দেড়টার দিকে আমরা খবর পাই আমার ছেলে আহত হয়েছে দেবীদ্বার থানার বানিয়াপাড়া আজগত আলী স্কুলের কাছে। সেখানে গিয়ে আমার ছেলের বউ ও আমার মেয়েকে দেখতে পাই। তখন লোকজন জানায় আমার ছেলে মারা গেছে। আমি তখন অজ্ঞান হয়ে যাই। জবানবন্দিতে সাক্ষী বলেন, ‘রাত ৯টার দিকে থানার নয়ন দারোগা ফোন দিয়ে থানায় ডেকে নিয়ে পোস্টমর্টেম করতে হবে বলে একটি কাগজে স্বাক্ষর নেয়। সেখানে আওয়ামী লীগের নেতা মোস্তাফিজুর রহমান সরকার আমাকে বলে নগদ সাত লাখ টাকা, দুইটা দোকান দিচ্ছি, ছেলের বউ নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবা। মামলা করার দরকার নেই। আমি টাকা নেই নাই।’ তিনি বলেন, ‘পরদিন ছেলের লাশ পোস্টমর্টেম করে বাড়িতে আনার পর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। মোবাইলে দেখেছি হাসিনা লোক দিয়ে আমার ছেলেকে মেরেছে। নৌকা পার্টির লোক সালাউদ্দিন আমার ছেলেকে গুলি করেছে। অন্যান্যরা আমার ছেলেকে কুপিয়েছে। ছেলে হত্যার জন্য শেখ হাসিনার ফাঁসি চাই।’
পলাতক চারজনের বিরুদ্ধে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় একটি ভবনের ছাদের কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে গুলি করাসহ দুইজনকে হত্যা মামলায় পলাতক চারজনকে হাজির হতে জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ সোমবার এ আদেশ দেন।
ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান হাবিব ছাড়া বাকি তিন আসামি হলেন- খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান ও রামপুরা থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া। এদিন এ মামলায় গ্রেফতার রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। গত ১০ আগস্ট পলাতক চার আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল।
- বিষয় :
- অভ্যুত্থান
- জবানবন্দি
