ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ছাত্র সংসদ নির্বাচন

ভোটের ফলে প্রভাব ফেলতে পারে হল ও আঞ্চলিকতা

ভোটের ফলে প্রভাব ফেলতে পারে হল ও আঞ্চলিকতা
×

.

 মাজহারুল ইসলাম রবিন ও যোবায়ের আহমদ

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৫ | ০১:২৪

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ভোটদানের ক্ষেত্রে প্রার্থীর পরিচিতি বড় ভূমিকা পালন করে। এর পাশাপাশি প্রার্থীর এলাকা, বিভাগ, বিজ্ঞান কিংবা মানবিক বিভাগগুলোর হল, রাজনৈতিক মতাদর্শও প্রভাব ফেলে। বিশেষত ছাত্রীদের পাঁচটি হল এবং জগন্নাথ হলের ভোটকে বেশি ‘সুইং’ হিসেবে ধরা হয়। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও প্রভাব ফেলতে পারে।

আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শও নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে ছাত্রদল, শিবির, গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ কিংবা বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর নিজস্ব ভোট আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ১৮টি। এর মধ্যে ছাত্রদের ১৩টি এবং ছাত্রীদের পাঁচটি। নির্বাচনে হলের একটি বড় প্রভাব থাকে। ৩৯ হাজার ৭৭৫ ভোটারের মধ্যে মেয়েদের পাঁচটি হলে ভোটার সংখ্যা ১৮ হাজার ৯০২ জন, ৪৭ শতাংশ। 
অন্যদিকে ছাত্রদের হলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভোট বেশি জগন্নাথ হলে। এখানে ২ হাজার ২০০ ভোটার থাকেন। ফলে এই ভোটগুলোর ব্যাপারে সব প্রার্থীর আলাদা কৌশল থাকে। জগন্নাথ হলে মুসলিম ভিন্ন অন্য ধর্মাবলম্বীরা থাকেন। এই হলের ভোট টানতে ছাত্রদলের প্যানেল থেকে চিম চিম্যা চাকমা, শিবিরের প্যানেল থেকে সর্ব মিত্র চাকমা, উমামা ফাতেমার প্যানেল থেকে ববি বিশ্বাসসহ অন্য প্যানেলেও এই হলের শিক্ষার্থী রাখা হয়েছে। 

ছাত্রীদের হলগুলোতে ধর্ম কিংবা বিভাগের কোনো হিসাব নেই। সবাই একসঙ্গে থাকেন। 
তবে ছাত্রী হলগুলোতে রাজনৈতিক প্রার্থীদের তুলনায় সাধারণ প্রার্থীদের বেশি পছন্দ। ছাত্রী হল থেকে ভোটার টানতে শিবিরসহ অন্য ইসলামিক ছাত্র সংগঠনগুলোর প্যানেলে প্রার্থী রাখার নজির রয়েছে। 
কবি সুফিয়া কামাল হলের শিক্ষার্থী সুমাইয়া জাহান বলেন, ডাকসু ও হল সংসদে এমন প্রতিনিধি দরকার, যারা শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবেন। 
রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে তারা শিক্ষার্থীদের একাডেমিক, আবাসিক সমস্যাসহ সব সমস্যা দূর করতে সচেষ্ট থাকবেন। 

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্রী রুবাইয়াত ইসলাম বলেন, হলের ক্ষেত্রে প্রার্থীকে অবশ্যই শুধু হলের স্বার্থেই কাজ করতে হবে। তাঁর নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য নয়। সবচেয়ে বড় ব্যাপার নির্বাচিত প্রতিনিধিকে যেন সহজেই পাওয়া যায়। স্বাস্থ্য সম্পর্কিত পদগুলোতে নারী নেতৃত্ব পছন্দ করি।  

আবার ছেলেদের হলগুলোর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগের তিনটি হল ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হল, অমর একুশে হল এবং ফজলুল হক মুসলিম হল মিলিয়ে পাঁচ হাজার ৫৫ ভোটার রয়েছেন। এগুলো ক্যাম্পাসের দক্ষিণ সীমানায় কার্জন হল এলাকায় অবস্থিত। প্রার্থীদের শীর্ষ পদের মধ্যে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী আবু বাকের মজুমদার ফজলুল হক মুসলিম হলের এবং একই প্যানেলের সমাজসেবা সম্পাদক প্রার্থী মহির আলম অমর একুশে হলের ছাত্র। বিজ্ঞান বিভাগগুলোর মধ্যে প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী উমামা ফাতেমা ভিপি প্রার্থী। তিনি কবি সুফিয়া কামাল হলের ছাত্রী। 

এ ছাড়া শাহবাগ-সংলগ্ন কলাভবন এলাকায় মানবিক বিভাগের হলগুলো রয়েছে। এর মধ্যে কবি জসীম উদ্‌দীন হল, শেখ মুজিবুর রহমান হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, বিজয় একাত্তর হল এবং মাস্টার দা সূর্য সেন হল এলাকাটি হলপাড়া নামে খ্যাত। এখানে আট হাজার ১৮৪ ভোটার রয়েছে। 
ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে অধিকাংশ হেভিওয়েট প্রার্থী এই হলগুলোতে সংযুক্ত। ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান ও জিএস প্রার্থী তানভীর বারী হামিম, ছাত্রশিবিরের জিএস প্রার্থী এস এম ফরহাদ কবি জসীম উদ্‌দীন হলের ছাত্র। গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের ভিপি প্রার্থী আব্দুল কাদের বিজয় একাত্তর হল, ছাত্রশিবিরের ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়েম মাস্টার দা সূর্য সেন হলের ছাত্র। 
জানতে চাইলে বিজয় একাত্তর হলের ছাত্র আবির অয়ন বলেন, আমি এমন প্রার্থী চাই যে আদর্শভিত্তিক নয়, ইস্যুভিত্তিক রাজনীতি করবে। যার যার রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে শিক্ষার্থীদের অধিকার, নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে বেশি প্রাধান্য দেবে। 

মানবিকের হলগুলোর মধ্যে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, স্যার এ এফ রহমান হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র নীলক্ষেত-সংলগ্ন এলাকায় পাশাপাশি অবস্থিত। এই হলগুলোতে ভোটার চার হাজার ৭৩৬ জন। 

অঞ্চলভিত্তিক ভোটেরও প্রভাব থাকবে
কেবল হল কিংবা বিভাগ নয়, অঞ্চলভিত্তিক ভোটাররাও নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এবারের নির্বাচনে মূল ৯টি প্যানেলের শীর্ষ ২৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৩ জন প্রার্থীর বাড়ি চট্টগ্রাম বিভাগে। এ ছাড়া উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গেরও প্রার্থী আছে। এসব অঞ্চলের শিক্ষার্থীর পক্ষে থাকলে ভোটে ভালো ফল করা সম্ভব বলে মনে করছেন প্রার্থীরা। এ কারণে তারা তাদের এলাকাভিত্তিক সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গেও যোগাযোগ শুরু করেছেন। 
স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্যের জিএস পদপ্রার্থী আল সাদী ভূঁইয়ার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তিনি জানান, এবারের নির্বাচনে তাঁর এলাকায় বড় সংখ্যক ভোটার রয়েছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে তিনি ইতিবাচক সাড়া পেয়েছেন। এলাকাভিত্তিক সংগঠনগুলো নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। এ ছাড়া নিজ হলেও তাঁর ভোটার রয়েছে।

বিভাগ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনেরও ভূমিকা থাকবে
বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩ অনুষদে ৮৩টি বিভাগ রয়েছে। এসব বিভাগ ভোটে বড় একটা ভূমিকা রাখবে। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগগুলোর ফেসবুক গ্রুপগুলোতে প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া সামাজিক মাধ্যমেও নিজেদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকেও প্রচারণা চালাচ্ছেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২৫ জন শিক্ষার্থী ডাকসু ও হল সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তাদের পক্ষে বিভাগের শিক্ষার্থীরা জোর প্রচার চালাচ্ছেন। 
পাশাপাশি টিএসসিকেন্দ্রিক অন্তত ২৩টি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি, ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং ক্লাব, ঢাকা ইউনিভার্সিটি কালচারাল সোসাইটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবৃত্তি সংসদ, জয়ধ্বনি সাংস্কৃতিক সংগঠন ইত্যাদি। ঢাবিতে ভর্তির পরপরই অনেক শিক্ষার্থী টিএসসিকেন্দ্রিক বিভিন্ন সংগঠনে যোগ দেয়। আবার অনেক প্রার্থী এসব সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত। ফলে এসব সংগঠন খুব বড় প্রভাব ফেলতে না পারলেও ভূমিকা রাখবে। 

ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ
ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবার থেকেই আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করতে পারবেন প্রার্থীরা। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ৯ সেপ্টেম্বর।
এদিকে ছাত্রদলের মনোনীত ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। তিনি গত রোববার হল পাড়ায় আসেন শিক্ষার্থীদের কাছে। এর আগের দিন তিনি অমর একুশে হলের রিডিংরুমে প্রবেশ করে একাধিক শিক্ষার্থীর কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে দোয়া চান এবং কয়েকজনের সঙ্গে কোলাকুলি করেন। এই ঘটনায় রোববার নির্বাচন কমিশনের চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন কবি জসীম উদ্‌দীন হলের শিক্ষার্থী ও ভোটার শাহজামাল সায়েম।

এ বিষয়ে আবিদুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনী প্রচারণায় নামার আগেই আমাদের নেতাকর্মীদের, বিশেষ করে নারী কর্মীরা, সাইবার বুলিং এবং হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। এ ছাড়া আমাদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি না মানার অনৈতিক অভিযোগও আনা হচ্ছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে সেটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


 

আরও পড়ুন

×