ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

চার হাসপাতালের তথ্য

পরীক্ষার ৩০ শতাংশ নমুনায় চিকুনগুনিয়া শনাক্ত

পরীক্ষার ৩০ শতাংশ নমুনায় চিকুনগুনিয়া শনাক্ত
×

.

তবিবুর রহমান

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:২১ | আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৪:১২

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত রাজধানীর চারটি হাসপাতালে ৭৮৫ জনের রক্তের নমুনায় চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার ৩০ দশমিক ২৬ শতাংশ। আক্রান্তদের অধিকাংশই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বাস করেন।

রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর), ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার (এনআইএলএমআরসি) ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এডিস মশাবাহিত রোগগুলোর মধ্যে ডেঙ্গু ছাড়াও চিকুনগুনিয়া উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এখনই পদক্ষেপ না দিলে ডেঙ্গুর মতোই চিকুনগুনিয়া ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে এ বছর জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত এক হাজার ৬৭০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হয়েছে ৩১৯ জনের নমুনায়। আইইডিসিআরের ৫১৮ নমুনায় ২৫৩ জনের এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এনআইএলএমআরসিতে ২৩৫ নমুনায় ৩৩ জনের চিকুনগুনিয়া ধরা পড়েছে। এ ছাড়া আইসিডিডিআর,বির ১৭১ নমুনায় ১৪০ জনের চিকুগুনিয়া শনাক্ত হয়েছে। এই চার হাসপাতালে দুই হাজার ৫৯৪ নমুনা পরীক্ষায় ৭৮৫ জনের শরীরে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। রাজধানীর মহাখালী, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, উত্তরা, লালবাগ, আজিমপুর, মুগদা, রামপুরা, শাহজাহানপুরসহ অন্তত ২০টি এলাকায় বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে।

পরীক্ষার সুযোগ সরকারি দুই প্রতিষ্ঠানে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আইইডিসিআর এবং এনআইএলএমআরসিতে এই ভাইরাস পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। সক্ষমতা থাকলেও কিট সংকটে অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকুনগুনিয়া পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। দেশে ২০০৮ সালে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রথম চিকুনগুনিয়া রোগী শনাক্ত হয়। এরপর ২০১১ সালে ঢাকার দোহারে রোগী পাওয়া যায়। ২০১৭ সালে দেশে প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ওই বছর প্রায় ১৪ হাজার মানুষ আক্রান্ত হন। এর পর থেকে চিকুগুনিয়া পরীক্ষার কিট ক্রয় করেনি সরকার। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় আগের কিট মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. হালিমুর রশিদ বলেন, ‘২০১৭ সালের পর কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো চিকুনগুনিয়া টেস্ট কিট কেনা হয়নি। কিছু কিছু হাসপাতালে এই কিট থাকলেও সেগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এখন পরিস্থিতি খারাপ হলে হাসপাতালগুলো নিজস্ব বাজেট থেকে টেস্ট কিট কিনে পরীক্ষা করবে। আলাদা করে প্রস্তুতি নেওয়ার পর্যায়ে চিকুনগুনিয়া এখনও যায়নি। বাস্তবে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রস্তুতি একই।’

দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ 
চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত ব্যক্তিরা শুধু জ্বরেই কষ্ট পান না, অনেকের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ দেখা যায়। আইইডিসিআর এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, আক্রান্তদের ৯৬ শতাংশের অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, ২৯ শতাংশের ক্লান্তি এবং ১৯ শতাংশের ক্ষেত্রে অস্থিসন্ধি ফুলে যাওয়ার উপসর্গ থাকে। 
এ গবেষণায় আরও দেখা গেছে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের গড়ে ১০ দশমিক ৫ কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে।
 
বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, চিকুনগুনিয়ায় মৃত্যুঝুঁকি নেই। তবে যারা অন্যান্য রোগে ভোগেন যেমন– ডায়াবেটিস, কিডনি, লিভার বা হৃদরোগ, ক্যান্সার ও হাঁপানিতে আক্রান্ত তাদের বেলায় রোগটি ঝুঁকিপূর্ণ। চিকুনগুনিয়ার কোনো ভ্যাকসিন বা টিকা এখনও আবিষ্কার হয়নি। এই রোগ থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রতিরোধে গুরুত্ব দিতে হবে। সে জন্য মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করা এবং এডিস মশার বংশবিস্তার রোধে এর আবাসস্থল এবং আশপাশের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করা, অর্থাৎ ব্যক্তিগত সতর্কতা এবং মশা প্রতিরোধ জরুরি।

কীটতত্ত্ববিদ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘এডিস মশার দুটি প্রজাতি– এডিস ইজিপটাই ও এলবোপিকটাস দেশে আগে থেকেই রয়েছে। এরাই ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা ও ইয়েলো ফিভার ছড়াতে পারে। মশা নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে এসব রোগে আক্রান্তের হার বাড়তেই থাকবে।’

সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে আগামী ৩০ থেকে ৪০ বছর চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু, জিকার মতো রোগ দেশে ছড়াতেই থাকবে। ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয়েছিল ২০০০ সালে, কিন্তু আজও নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। ঢাকার বাইরে পৌর এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাই নেই।

এক পরীক্ষায় তিন ভাইরাস শনাক্ত
আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন বলেন, ‘ল্যাবরেটরির নমুনা পরীক্ষায় আমরা যে ফলাফল দেখছি, তাতে মনে হচ্ছে, চিকুনগুনিয়া পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার ঝুঁকি আছে। এ ছাড়া আমরা দেশের সব হাসপাতালের তথ্য পাচ্ছি না। বহু মানুষ এই রোগে ভুগছেন বা ভুগবেন। তবে আশার বিষয়, নতুন ধরনের কিটে একটি পরীক্ষার মাধ্যমেই ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকা শনাক্ত করা যায়। তাই আলাদা পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। তবে এবার চিকুনগুনিয়ার রোগী বেশি পাওয়া যাচ্ছে।’ 

তিনি বলেন, চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে প্রধান করণীয় হলো, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ। পরিষ্কার পানি জমে থাকা যে কোনো স্থান, ফুলদানি,পাত্র, ছাদ বা এসির নিচে নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিক সচেতনতা ও স্থানীয় সরকারের উদ্যোগে সমন্বিত মশা নিধন কার্যক্রম জরুরি হয়ে পড়েছে।

আরও পড়ুন

×