জবানবন্দিতে রাজসাক্ষী মামুন
শেখ হাসিনা ও কামালের নির্দেশে জুলাই গণহত্যা
আবদুল্লাহ আল-মামুন
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:২৪ | আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১০:০১
জুলাই অভ্যুত্থানে গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায় স্বীকার করে দেশবাসী ও হতাহত ব্যক্তির পরিবারের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন পুলিশের সাবেক আইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অশ্রুসজল চোখে রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন সাবেক এই পুলিশপ্রধান।
সাবেক আইজিপি তাঁর জবানবন্দিতে বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন করতে মারণাস্ত্র ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর গত বছরের ১৮ জুলাই সে সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মাধ্যমে তিনি ওই নির্দেশ পান।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে সাবেক এই আইজিপি মামুনও এ মামলার আসামি। আবদুল্লাহ আল-মামুন আসামি হলেও গত ১০ জুলাই অপরাধের দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হয়েছেন। এ নিয়ে মামলার ৮১ সাক্ষীর মধ্যে ৩৬ জনের জবানবন্দি নেওয়া হলো। আজ বুধবার মামুনকে জেরা করবেন শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন।
জবানবন্দিতে আইজিপি মামুন বলেন, ‘আমি ৩৬ বছর পুলিশে চাকরি করেছি। পুলিশের বিরুদ্ধে সব সময় অভিযোগ আসে। তবে চাকরিজীবনে আমার বিরুদ্ধে কখনও অভিযোগ আসেনি। আমি যথেষ্ট মানবিকতা ও সচেতনতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। তবে চাকরির শেষ পর্যায়ে এত বড় গণহত্যা আমার দায়িত্বকালে হয়েছে। এর দায় আমি স্বীকার করছি। শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের নির্দেশে এই গণহত্যা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘গণহত্যার শিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিবার, আহত ব্যক্তি, দেশবাসী ও ট্রাইব্যুনালের কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আমাকে দয়া করে ক্ষমা করবেন। আমার এই সত্য ও পূর্ণ বর্ণনার কারণে সত্য উদ্ঘাটন হলে আল্লাহ যদি আমাকে আরও হায়াত দান করেন, বাকি জীবনটা কিছুটা হলেও অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পাব।’ তিনি আরও বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে সরকারের নির্দেশে ছাত্র-জনতার ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করে হতাহত করায় পুলিশপ্রধান হিসেবে আমি লজ্জিত, অনুতপ্ত ও ক্ষমাপ্রার্থী। যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড হয়েছে, এ জন্য অপরাধবোধ ও বিবেকের তাড়নায় আমি রাজসাক্ষী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
রাজসাক্ষী মামুন বলেন, ‘গত বছর ৪ আগস্ট আন্দোলনে উত্তাল গোটা দেশ। এক দিন পরই ছিল ‘মার্চ টু ঢাকা’। এ কর্মসূচি ঠেকাতে আগের দিন রাতেই গণভবনের বৈঠকে নেওয়া হয় নানা পরিকল্পনা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ওই বৈঠকে অংশ নেন শেখ রেহানা, কয়েকজন মন্ত্রীসহ বিভিন্ন বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। ৫ আগস্ট কোথায়-কীভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে, সেসব সিদ্ধান্তও নেওয়া হয় বৈঠকে।’
তিনি বলেন, ‘৪ আগস্ট গণভবনে বেলা ১১টার দিকে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নিরাপত্তা সমন্বয় কমিটির একটি বৈঠক হয়। সেখানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তিন বাহিনীর প্রধান, এসবিপ্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিজিএফআই-এনএসআই প্রধানসহ কমিটির ২৭ জন অংশ নেন। আমিও ওই বৈঠকে ছিলাম। সেখানে আন্দোলন দমন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে এক পর্যায়ে আন্দোলনের পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন পেশ করে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এর মধ্যেই চারদিকের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হওয়ায় বৈঠক মুলতবি করা হয়।’
আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, ‘ওই রাতেই আবার গণভবনে ডাকা হয়। সেখানে আমি, আনিসুল হক, কামাল, তিন বাহিনীর প্রধান, র্যাবের ডিজি, লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুজিব উপস্থিত ছিলেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে শেখ রেহানাও ছিলেন। আর বাইরে অপেক্ষমাণ ছিলেন ডিজিএফআই ও এসবিপ্রধান। সেখানে ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। পুলিশ-সেনাবাহিনী সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। এরপর আমরা আর্মির অপারেশন কন্ট্রোল রুমে যাই। সেখানে ঢাকা শহরের প্রবেশমুখে ফোর্স মোতায়েন করে কাঠোর অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।’
জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, ‘৫ আগস্ট সকালে আমি পুলিশ হেডকোয়ার্টারে যাই। এর মধ্যে উত্তরা, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন পথ দিয়ে স্রোতের মতো ছাত্র-জনতা ঢুকতে থাকে। দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে জানতে পারি ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি কোথায় যাবেন তা আমরা জানতাম না। এরপর বিকেলে আর্মির হেলিকপ্টার এসে পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে আমাকে প্রথমে তেজগাঁও বিমানবন্দরের হেলিপ্যাডে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ক্যান্টনমেন্টের অফিসার্স মেসে নেওয়া হয়। হেলিকপ্টারে আমার সঙ্গে এসবিপ্রধান মনিরুল, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান হাবিব ও ডিআইজি আমেনা ছিলেন। পরের ধাপে হেলিকপ্টারে অ্যাডিশনাল ডিআইজি প্রলয় জোয়ারদার, অ্যাডিশনাল আইজি লুৎফুল কবিরসহ অন্যদেরও সেখানে নিয়ে আসা হয়।’
তিনি বলেন, ‘৬ আগস্ট আইজিপি হিসেবে আমার নিয়োগ বাতিল করা হয়। ক্যান্টনমেন্টে থাকাকালে ৩ সেপ্টেম্বর আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়।’
অতি-উৎসাহী ছিলেন হাবিব ও হারুন
সাবেক আইজিপি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ১৮ জুলাই আমাকে ফোন করে জানান শেখ হাসিনা সরাসরি লেথাল উইপেন ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। ওই সময় আমি পুলিশ হেডকোয়ার্টারে ছিলাম। আমার সঙ্গে অ্যাডিশনাল ডিআইজি প্রলয়ও ছিলেন। নির্দেশনার বিষয়টি জানানোর পর ডিএমপি কমিশনারসহ সারাদেশের পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে বার্তা পৌঁছে দেন প্রলয়। এরপর থেকেই আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার শুরু হয়। তবে মারণাস্ত্র ব্যবহারে অতি-উৎসাহী ছিলেন ডিএমপির কমিশনার হাবিব ও ডিবির হারুন। মূলত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা ছিল যে কোনোভাবে আন্দোলন দমাতে হবে। এ ছাড়া প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে প্রধানমন্ত্রীকে প্ররোচিত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, মেয়র ফজলে নূর তাপস, সালমান এফ রহমান, ওবায়দুল কাদের, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, মির্জা আযম, হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেননসহ কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা।’
হারুনকে ‘জিন’ নামে ডাকতেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মামুন বলেন, ‘আন্দোলন দমনে ১৯ জুলাই থেকে আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসায় নিয়মিত কোর কমিটির বৈঠক হতো। আমি কোর কমিটির সদস্য হিসেবে উপস্থিত থাকতাম। সেখানে স্বরাষ্ট্র সচিব জাহাঙ্গীর আলম, অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক) টিপু সুলতান, অতিরিক্ত সচিব রেজা মোস্তাফা, এসবিপ্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিবিপ্রধান হারুনুর রশিদ, র্যাবের ডিজি ব্যারিস্টার হারুনুর রশিদ, ডিএমপি কমিশনার মো. হাবিবুর রহমান, বিজিপির ডিজি মেজর জেনারেল আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, আনসারের ডিজি মেজর জেনারেল এ কে এম আমিনুল হক, এনটিএমসির ডিজি মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান ও ডিজিএফআইর প্রধান উপস্থিত থাকতেন। সেখানে আন্দোলন দমন থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদক্ষেপের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতো।’
তিনি বলেন, ‘কোর কমিটির সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ডিজিএফআই ও ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদকে সমন্বয়কদের আটকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাদের ডিবি হেফাজতে নিয়ে সরকারের সঙ্গে আপস করতে বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হয়। নিয়ে আসা হয় তাদের আত্মীয়স্বজনকেও। এছাড়া সমন্বয়কদের আন্দোলন প্রত্যাহারের জন্য টেলিভিশনে বিবৃতি দিতে বাধ্য করা হয়।’ মামুন বলেন, “কোর কমিটির বৈঠকে তাদের আটকের বিষয়ে আমি বিরোধিতা করি। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের আটক করা হয়। ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদের সঙ্গে আসাদুজ্জামান খান কামালের গভীর সম্পর্ক ছিল। তিনি হারুনকে ‘জিন’ নামে ডাকতেন। তাঁকে খুব কর্মতৎপর ও সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে রাজনৈতিকভাবে খুব কার্যকর মনে করতেন তিনি।”
ভেঙে পড়েছিল পুলিশের চেইন অব কমান্ড
জবানবন্দিতে সাবেক এই আইজিপি বলেন, ‘২০১৮ সালের নির্বাচনের পর পুলিশে রাজনৈতিক প্রভাব আরও বেড়ে যায়। প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন কিছু কর্মকর্তা। ঊর্ধ্বতন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগাযোগ ছিল।’
তিনি বলেন, ‘এসব কর্মকর্তা প্রায় গভীর রাত পর্যন্ত আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসায় বৈঠক করতেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা হলেন সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ, এসবির মনিরুল ইসলাম, ঢাকার ডিআইজি নুরুল ইসলাম, অ্যাডিশনাল ডিআইজি বিপ্লব কুমার, এএসপি আব্দুল্লাহ আল কাফী, ওসি মাজহার, ফোরকান অপূর্বসহ আরও অনেকে। এর মধ্যে কারও কারও সঙ্গে শেখ হাসিনার সরাসরি যোগাযোগ ছিল।’ তিনি বলেন, ‘সরকারের ওপর মহলে সরাসরি যোগাযোগ থাকায় চেইন অব কমান্ড মানতেন না এসব কর্মকর্তা। মূলত পুলিশ বাহিনীতে গড়ে তোলা দুটি গ্রুপই এসব কর্মকাণ্ড চালাত।’
রাতের ভোটের মাস্টারমাইন্ড জাবেদ পাটোয়ারী
সাবেক আইজিপি বলেন, ‘২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আগের রাতে ৫০ শতাংশ ভোট ব্যালট বাক্সে ভরে রাখতে শেখ হাসিনাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন জাবেদ পাটোয়ারী।’
র্যাবে থাকাকালে টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন বা টিএফআই সেলসহ বহু বন্দিশালার বর্ণনাও দেন সাবেক এই আইজিপি। তিনি বলেন, ‘র্যাব-১ এ টিআইএফ নামে গোপন বন্দিশালা ছিল। রাজনৈতিক ভিন্ন মত ও সরকারের জন্য হুমকি হয় এমন মানুষকে এখানে ধরে আনা হতো।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আসত এসব নির্দেশনা। কখনও নির্দেশনা দিতেন প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক সিদ্দিকী। আর আয়নাঘরে আটক ও ক্রসফায়ারে হত্যার মতো কাজগুলো করতেন র্যাবের এডিসি অপারেশন ও গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক।
ট্রাইব্যুনালে গতকাল প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। তবে জেরার জন্য বুধবার দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। দুপুর পৌনে ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সাবেক আইজিপি মামুনের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। গত ২৪ মার্চ মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।
- বিষয় :
- রাজসাক্ষী
