একের পর এক ট্রান্সফরমার চুরি
চিরকুট রেখে টাকা নিয়ে যায় ধরা পড়ে না মিটার চোর
.
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:৪৯ | আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১০:১৯
রাতে চুরি করে মিটার ও ট্রান্সফরমারের জায়গায় চিরকুট লিখে ফোন নম্বর দিয়ে যাচ্ছে চোর। উল্লিখিত নম্বরে যোগাযোগ করে দাবি করা টাকা পাঠালেই ফেরত দেওয়া হচ্ছে যন্ত্র। এভাবে একের পর এক মিটার চুরি হলেও ধরা পড়ছে না চোর। অবাধে চুরির ঘটনায় পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ও থানার লোকজনের যোগসূত্র থাকতে পারে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। পাবনার ঈশ্বরদী ও নাটোরের লালপুর এলাকা ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধি।
নাটোরের লালপুরে জুলাই থেকে আগস্ট
মাসে সেচ পাম্পের ৯টি ট্রান্সফরমার ও ৫টি মিটার চুরি হয়েছে; যার আনুমানিক দাম ৫ লাখ ৮ হাজার ৬৬১ টাকা। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে চুরি হয়েছে ৫টি মিটার। এর সংখ্যা আরও বেশি হবে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ভুক্তভোগীরা জানান, দক্ষ লোক বা টেকনিশিয়ান ছাড়া ট্রান্সফরমার বা মিটার খোলা সম্ভব না। এ কাজে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের লোকজন জড়িত থাকতে পারে। এ ছাড়া চোর চিরকুট লিখে বিকাশ নম্বর দিয়ে যাচ্ছে। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলছে। টাকা দিলে নির্ধারিত স্থানে মিটারও রেখে যাচ্ছে। অথচ থানায় অভিযোগ করলে পুলিশ তাদের ধরতে পারছে না। প্রশাসনের সংশ্লিষ্টতা না থাকলে চোর এভাবে পার পেয়ে যেতে পারে না।
ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে চোর চক্রের রেখে যাওয়া মোবাইল নম্বর (০১৭৯৭০১৫০৯০-পার্সোনাল, ০১৩২৭৭২২৩৪৪-এজেন্ট) নিয়ে যোগাযোগ করা হয়। অপর প্রান্ত থেকে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি জানান, তাঁর বাড়ি রাজশাহীর কাটাখালীতে। বিভিন্ন এলাকায় তারা কাজ করেন। পুলিশ বা পল্লী বিদ্যুতের কেউ তাদের কিছু করতে পারবে না। কেননা, তাদের কিছু লোকের সহায়তায় এ কাজ নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছেন। চলতি মাসে কতগুলো মিটার চুরি করেছেন জানতে চাইলে বলেন, ‘১২ সেপ্টেম্বর রাতে নাটোরের লালপুর ও পাবনার দাশুড়িয়া অঞ্চলে ৩১টি মিটার চুরি করেছি। এসব বহন করতে প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল ব্যবহার করেছি।’
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বড়াইগ্রাম সার্কেল) শোভন চন্দ্র হোড় বলেন, ট্রান্সফরমার ও মিটার চুরির ঘটনা কয়েক মাস বন্ধ ছিল। ভুক্তভোগীরা থানায় আসাকে ঝামেলা মনে করেন। এ কারণে আবার চুরি বেড়েছে। এই চক্রকে ধরতে কাজ চলছে।
পল্লী বিদ্যুৎ অফিস সূত্রে জানা গেছে, শিল্প গ্রাহকদের মিটারগুলো বিভিন্ন ক্যাটেগরির হয়। একটি মিটারের দাম ২০ হাজার থেকে ২১ হাজার টাকা। পাঁচ কেভিএ ট্রান্সফরমারের দাম ৫২ হাজার ৭০০ টাকা, ১০ কেভিএর দাম ৬৭ হাজার ৩৩ টাকা। চুরি হওয়া মিটারের ক্ষেত্রে গ্রাহক থানায় জিডি করে নতুন মিটারের জন্য অর্ধেক টাকা দিয়ে আবেদন করলে দুই দিনের মধ্যে মিটার লাগিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে গ্রাহককে বাকি অর্ধেক টাকা পরিশোধ করতে হবে।
লালপুর মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স-সংলগ্ন ভাঙারি কারখানার মালিক আনারুল ইসলাম জানান, চুরির বিষয়ে বিদ্যুৎ অফিসে জানালে তারা টাকার বিনিময়ে মিটার লাগিয়ে দেয়। তবে নিজ দায়িত্বে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে বলে। এতেই বোঝা যায়, এই চক্রের সঙ্গে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের লোক জড়িত। আরেক ভুক্তভোগী শালেশ্বর গ্রামের আজিজুর রহমানের সেচ পাম্প থেকে ট্রান্সফরমার চুরি হলে লালপুর পল্লী বিদ্যুৎ অফিসকে জানান। তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে থানায় জিডি করার পরামর্শ দিয়ে চলে যায়। জিডি করার এক মাস পার হলেও চোর ধরা পড়েনি।
চোর চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ লালপুর জোনাল অফিসের (ডিজিএম) রেজাউল করিম। তাঁর ভাষ্য, সারাদেশেই মিটার ও ট্রান্সফরমার চুরি হচ্ছে। গ্রাহকরা চোরকে টাকা না দিলে চুরি বন্ধ হয়ে যাবে। পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ দিতে পারলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লালপুর থানার ওসি রফিকুল ইসলাম জানান, অপরাধীদের ধরতে পুলিশ কাজ করছে। একটি সিম ব্যবহার করে নষ্ট করে ফেলছে। এ কারণে তাদের ধরা সম্ভব হচ্ছে না।
পাবনার ঈশ্বরদীতে একের পর এক বৈদ্যুতিক মিটার চুরির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। থানায় জানালেও কাজ হচ্ছে না। রাতে পাহারা বসিয়েও ঠেকানো যাচ্ছে না মিটার চুরি।
ঈশ্বরদীর জয়নগর, ছিলিমপুর, আওতাপাড়া, নতুন হাট মোড় ও কদিমপাড়া গ্রামে গত রোববার রাতে ১২টি চালকলের বৈদ্যুতিক মিটার চুরি হয়। এর আগে মঙ্গলবার ৪টি ও বুধবার ৩টি মিটার চুরি হয়েছে। চোরেরা প্রতিটি মিটার চুরি করে নেওয়ার সময় বৈদ্যুতিক পিলারে বিকাশ নম্বর লিখে ৬ হাজার টাকা পাঠাতে বলেছে।
চালকল মালিকরা জানান, বিকাশের মাধ্যমে ৬ হাজার করে টাকা পাঠিয়ে অনেকে মিটার ফেরত পেয়েছেন। তবে চুরি হওয়া এসব মিটার ফিরে পাওয়ার পর তা পুনঃসংযোগ দিতে তাদের গুনতে হচ্ছে ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা।
ছিলিমপুর গ্রামের ফকির রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী শরিফ ফকির জানান, মিটার চুরি হওয়ার পর বিকাশে টাকা দিয়ে মিটার ফেরত পেয়েছেন। নতুন করে সংযোগ দিতে পল্লী বিদ্যুৎকে ৩ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এ ছাড়া ৪০ কিলোওয়াটের মিটারের জন্য বাড়তি ৪০ হাজার টাকা, মিটার স্থাপনের জন্য আরও ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা করে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করতে হচ্ছে।
উপজেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দুলাল মণ্ডল বলেন, ‘এমনিতেই ব্যবসা মন্দা। তার ওপর এভাবে একের পর এক মিটার
চুরি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন। সম্মিলিতভাবে থানায় গিয়ে চোর চক্রকে আটকের দাবি জানিয়েছি। ওসি আশ্বস্ত করেছেন। কিন্তু ৩ দিনে একজনকেও ধরতে পারেননি।’
এ বিষয়ে ঈশ্বরদী থানার ওসি আ.স.ম. আব্দুন নূর বলেন, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। চোর চক্রকে ধরতে মাঠে কাজ করছে পুলিশ।
- বিষয় :
- ট্রান্সফরমার
