ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বেলার গণশুনানি

বায়ুদূষণে ২৮ শতাংশ দায় যানবাহনের ধোঁয়ার

বায়ুদূষণে ২৮ শতাংশ দায় যানবাহনের ধোঁয়ার
×

ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ২২:২৯

বাংলাদেশে বায়ুদূষণের এক বড় উৎস যানবাহনের ধোঁয়া। মোট বায়ুদূষণের ২৮ শতাংশের জন্য দায়ী গাড়ি। এরপর আছে কারখানা, ইটভাটা ও নির্মাণকাজের ধুলোবালি। 

মঙ্গলবার রাজধানীর পর্যটন ভবনে গণশুনানিতে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ‘বায়ুদূষণ প্রতিরোধে করণীয়’ শীর্ষক এ শুনানির আয়োজন করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। শুনানিতে ভুক্তভোগী নাগরিক, চিকিৎসক, পরিবেশবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ, গবেষক, আইনপ্রণেতা ও সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। 

শুনানিতে বেলা জানিয়েছে, ২০১৮ সাল থেকে বিশ্বে বায়ুদূষণের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম। বেলার উপস্থাপনায় দেখা যায়– যানবাহনের ধোঁয়া ২৮ শতাংশ, কারখানা ১৩ শতাংশ, ইটভাটা ১১ শতাংশ এবং নির্মাণ প্রকল্পের ধুলোবালি ৮ শতাংশ বায়ুদূষণের জন্য দায়ী। বাকি অংশ আসে আবর্জনা পোড়ানো, গৃহস্থালির ধোঁয়া ও জীবাশ্ম জ্বালানির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার থেকে। 

এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকায় বসবাসকারীদের গড় আয়ু কমেছে প্রায় সাত বছর। ঢাকার বাইরে গড় আয়ু কমেছে ৬ দশমিক ২ বছর, আর সারাদেশে ২ দশমিক ৪ বছর। বায়ুদূষণের স্বল্পমেয়াদি প্রভাবে কাশি, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, চোখের প্রদাহ, অ্যালার্জি ও উচ্চ রক্তচাপ বাড়ছে। দীর্ঘ মেয়াদে দেখা দিচ্ছে ফুসফুস ক্যান্সার, হৃদরোগ, আলঝেইমার, পারকিনসন্স, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস, বন্ধ্যত্ব– এমনকি ত্বকের ক্যান্সারের মতো জটিল রোগ।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. সম্প্রীতি ইসলাম বলেন, একজন মানুষ প্রতিদিন ১৬ কেজি বাতাস গ্রহণ করেন। বাতাসের ক্ষুদ্র কণা শরীরে ছড়িয়ে গিয়ে নানা রোগের ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই বাতাস রক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

বেলার প্রধান নির্বাহী তাসলিমা ইসলাম বলেন, আমাদের পরিবেশ রক্ষায় দুই শতাধিক আইন আছে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫, পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ২০২৩, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২২– সবই কাগজে-কলমে আছে। প্রশ্ন হলো, বাস্তবে কাজ হচ্ছে না কেন? তাঁর মতে, কারিগরি সীমাবদ্ধতা, জনবল সংকট, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের ওভারল্যাপের কারণে আইন বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

গণশুনানিতে ভুক্তভোগী নাগরিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সাভারের সালাউদ্দিন খান বলেন, সাভারের বাতাসকে ডিগ্রেডেড এয়ারশেড ঘোষণা করা হয়েছে; কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ কোথায়?
পুরান ঢাকার আসিফ উদ্দিনের অভিযোগ, রাস্তা পরিষ্কার হলেও ময়লা পাশে ফেলে রাখায় দূষণ আবারও বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। সেচ্ছাসেবী সংগঠন গ্রিন ভয়েসের সদস্য ফাহমিদা নাজনিন বলেন, ফিটনেসহীন গাড়ি সরানো, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করা, নির্ধারিত এলাকায় শিল্প স্থাপন ও বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পারভিন ইসলাম বলেন, নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিচালক নাজনিন হোসেন জানান, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত এক হাজার ১০০ গাড়ি ডাম্প করা হয়েছে; মামলা হয়েছে ১৮ হাজার; জরিমানা আদায় হয়েছে ১০ কোটি টাকা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মাহবুবুর আলম বলেন, আট হাজার কর্মী দরকার, কিন্তু আছে মাত্র চার হাজার। নতুন ওয়ার্ড যুক্ত হলেও জনবল বাড়ানো হয়নি। তবু আমরা চেষ্টা করছি।

বাংলাদেশ ইট প্রস্তুতকারক মালিক সমিতির সভাপতি ফিরোজ হায়দার খান বলেন, দেশে আট হাজার ইটভাটা আছে। মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া হঠাৎ করে ভাটা বন্ধ করলে হাজারো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ক্ষতিপূরণ দিয়ে বিদায় করতে হবে।

গণশুনানিতে বিশেষজ্ঞ ও অংশগ্রহণকারীরা বলেন, বায়ুদূষণ রোধে আইন প্রয়োগ, সমন্বিত উদ্যোগ, শিল্প-কারখানার আধুনিকায়ন, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কোনো পথ নেই। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক মো. জিয়াউর রহমান বলেন, অন্তত ১৫টি মন্ত্রণালয় সরাসরি বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে জড়িত। কার্যকর সমন্বয়ের অভাবই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু সরকার নয়, জনগণকেও সচেতন হতে হবে।

আরও পড়ুন

×