পুষ্প
দইগোটার অপরূপ ফুল
খুলনার দৌলতপুরের ঋষিপাড়া থেকে সম্প্রতি তোলা ফুল-ফলসহ দইগোটা গাছের ছবি - লেখক
মৃত্যুঞ্জয় রায়
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:৩৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
আশ্বিনের সকালটা এখন শরৎ শরৎ মনে হচ্ছে। রোদ উঠেছে, আকাশটাও নীল। দুর্গাপূজার ছুটিতে বাড়ি এসে এমন এক সকালে হাঁটতে বেরিয়ে ঋষিপাড়ার রাস্তার কোলে একটা গাছের বেশ বড়োসড়ো ঝোপ চোখে পড়ল। প্রায় প্রতিটি ডালের মাথায় ফুটে আছে হালকা মিষ্টি গোলাপিরঙা চমৎকার ফুল। সিঁদুররঙা কোমল কাঁটাওয়ালা ফল তার। ফুল থেকে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত কাঠ মৌমাছির দল। এ ফুল আগেও দেখেছি। তবে এমন বিপুল প্রস্ফুরণ কখনও চোখে পড়েনি। প্রাণভরে ছবি তুলে বাড়িতে এসে এ গাছটাকে দেখে ফিরে গেলাম সেই শৈশবে।
ছোটবেলায় যে পাড়ায় থাকতাম, সেখানে বাসার কাছেই ছিল কয়েকজন ঘোষের বাস। তারা দই পাততেন, ঘোল বানাতেন, ঘিয়ের ঘ্রাণে মাঝে মাঝে বাতাস ভরিয়ে দিতেন। এগুলো বানানোর সময় মাঝে মাঝে লক্ষ্য করতাম, ছোট একটা নারিকেলের মালা বা খোলের ভেতর বাদামি রঙের সুরকি দানার মতো কীসের যেন কতগুলো দানা জলে চটকে কমলা রং বের করতেন। তেল বা ডালডায় ভিজিয়ে রেখে তা মেশাতেন ঘিয়ে। এতে ওইসব জিনিসের বেশ একটা আকর্ষণীয় রং আসত, সাদা রংটা বদলে ঘিয়ে রং তৈরি হতো। তখন এসব দানার নাম জানতাম না। বহুকাল পর সে দানাগুলোকে চিনেছিলাম, সেগুলো ছিল দইগোটার বীজ।
দইয়ে ঘিয়ের মতো রং আনার জন্য ঘোষেরা ওই বীজ ব্যবহার করতেন, সে জন্যই বোধ হয় এর নাম হয়েছে দইগোটা। অন্য নাম লটকন। কিন্তু লটকন কেন বইপত্রে এর নাম, সেটা জানা গেল না। লটকন নামে এ দেশে একটি ফল আছে। কাজেই নামটি বিভ্রান্তির। ইংরেজি নাম Lipstick tree ও উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Bixa orellana, গোত্র বিক্সাসি। এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম রেখেছিলেন লিনিয়াস, প্রজাতিগত নামের শেষাংশ ওরেলানা আমাজন নদীর আবিষ্কারক ফ্রান্সিস ডি ওরেলানার নামের স্মারক।
দইগোটা চিরসবুজ গুল্ম বা ছোট বৃক্ষ, গাছ বেশ দ্রুত বাড়ে, গাছ ৮ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। কাঠবাদামি থেকে হলদে, ওজনে হালকা ও দুর্বল। শাখার অগ্রভাগে প্রায় পাঁচ সেন্টিমিটার ব্যাসের কয়েকটা ফুল থোকায় ফোটে। পাপড়ি চারটি, কেন্দ্রস্থলে অনেক পুরুষ কেশর গুচ্ছাকারে থাকে। ফলের অগ্রভাগ মুকুটের মতো, খোসায় লালচে-বাদামি সরু খাটো খাড়া নরম কাঁটা। প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট ফলের ভেতরে ৪০ থেকে ৪৫টি বীজ থাকে। ফল শুকালে শক্ত হয়ে ফেটে যায় ও বীজ বেরিয়ে পড়ে।
খাদ্যের প্রাকৃতিক রং হিসেবে এর বীজ ব্যবহৃত হলেও এ গাছ সাধারণত বাগানে বাহারি গাছ হিসেবে লাগানো হয়। একটানা চার মাস বৃষ্টি না থাকলেও বেঁচে থাকতে পারে। তবে সারাবছর কম-বেশি বৃষ্টি হলে গাছের চেহারা ও বৃদ্ধি ভালো হয়। বয়স দুই বছর হলেই গাছে ফুল ও ফল ধরা শুরু হয়। গাছ বাঁচে প্রায় ২০ বছর। এক কেজি বীজ থেকে ২০ থেকে ৫০ গ্রাম রং পাওয়া যায়।
বীজ স্বাদহীন, গরম তেলে ভিজিয়ে বীজ থেকে রং পাওয়া যায়, যা খাদ্যদ্রব্যে জাফরানের মতো ব্যবহার করা যায়। এ জন্য এ দেশে কেউ কেউ এ গাছকে জাফরান গাছ নামেও ডাকেন। বীজ চূর্ণ করে যে গুঁড়া পাওয়া যায়, তাও হলুদ বা কমলা রঞ্জক হিসেবে শিল্পে ব্যবহার করা যায়। বীজ বা রঞ্জকের কোনো বিষাক্ততা নেই।
বীজের খোসা থেকে যে রং পাওয়া যায় তা দিয়ে প্রাচীনকালে নারীরা ঠোঁট ও ত্বক রাঙাত, এ কারণেই এই গাছের নাম রাখা হয়েছিল লিপস্টিক ট্রি। আলো ও বাতাসে রং ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়। দইগোটা বীজের গুঁড়া মলমের মতো ত্বকে মাখলে তা সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে ত্বককে রক্ষা করে। খোসা থেকে বিক্সিন তৈরি করা হয়, যা কীটপতঙ্গ বিতাড়নে ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে মশা তাড়াতে কার্যকর।
মাটিতে বীজ বুনলে ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে চারা গজায়। ভালো করে রোদে শুকিয়ে কৌটায় আটকে রাখলে বীজ এক বছর পর্যন্ত ভালো থাকে। শাখা কেটে মাটিতে পুঁতেও চারা তৈরি করা যায়। দইগোটা গাছের জন্ম দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায়। ষোড়শ থেকে সপ্তদশ শতকে এ গাছ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আসে।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
- বিষয় :
- ফুল চাষ
