ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটর
শেখ হাসিনার ১৪শ বার ফাঁসি হওয়া উচিত
চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। ছবি: ফাইল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৫ | ২৩:০৯
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ড (চরম দণ্ড) চেয়েছে প্রসিকিউশন। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে দুই সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ বৃহস্পতিবার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে এ আর্জি জানান চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
এ সময় তিনি বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের নিউক্লিয়াস ছিলেন শেখ হাসিনা। তিনি হার্ডনট ক্রিমিনালের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। এই ট্রাইব্যুনালের মামলায় তিনি যেহেতু সব অপরাধীর প্রাণভোমরা ছিলেন, তাই তাঁকে আইনানুযায়ী চরম দণ্ড দেওয়া শ্রেয়। তাঁকে যদি চরম দণ্ড না দেওয়া হয়, এটা অবিচার হবে।’
তিনি আরও বলেন, জুলাই-আগস্টে দেশব্যাপী হামলায় ১৪০০ জন নিহত এবং ২৫ হাজার আহত হয়েছেন। একজনের জন্য একবার হলে শেখ হাসিনার ১৪০০ বার ফাঁসি হওয়া দরকার। এ ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা শহীদ ও আহত হয়েছেন, তাদের পরিবারের ক্ষতিপূরণের জন্য আসামিদের সম্পদ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া যেতে পারে বলে ট্রাইব্যুনালকে অবহিত করেন তিনি।
এদিন প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শেষে মামলার পলাতক আসামি শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী (স্টেট ডিফেন্স) মো. আমির হোসেনকে আগামী সোমবার যুক্তি উপস্থাপনের জন্য দিন ঠিক করে দেন ট্রাইব্যুনাল। মামলার অন্য আসামি সাবেক আইজিপি রাজসাক্ষী হওয়া চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন। চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন সম্পর্কে তাজুল বলেন, সাবেক আইজিপি তাঁর জবানবন্দিতে ঘটনা সম্পর্কে সত্য প্রকাশ করেছেন। তথ্য দিয়ে মামলায় সহযোগিতা করেছেন। তাঁর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে ট্রাইব্যুনাল।
প্রসিকিউশনের যুক্তি উপস্থাপন
বৃহস্পতিবার কার্যক্রমের শুরুতেই প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম এ মামলায় তিন নম্বর অভিযোগ রংপুরে আবু সাইদ হত্যার বিষয়ে যুক্তিতর্ক তুলে ধরেন। এ সময় তিনি আবু সাইদকে গুলি করা কনস্টেবল আমির আলী ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্রের নাম উল্লেখ করেন। এরপর ট্রাইব্যুনালে গত বছরের ১৬ জুলাই আবু সাঈদকে গুলি করার ভিডিওটি প্রদর্শন করা হয়।
মিজানুল ইসলামের বক্তব্য শেষ হলে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটির’ অভিযোগ বিষয়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। এ সময় তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩ এর ৪(১) এবং ৪(৩) পড়ে শোনান। একই সঙ্গে ‘রোম স্ট্যাটিউট’-এর অনুচ্ছেদ ২৮ তুলে ধরেন। এই আইনে শেখ হাসিনার কমান্ড রেসপনসিবিলিটি কীভাবে প্রমাণিত হয়েছে, তিনি তা উপস্থাপন করেন।
তিনি বলেন, ‘ওয়াইডস্প্রেড অ্যাটাক’ কিংবা ‘সিস্টেমেটিক অ্যাটাক’ যে কোনো একটি প্রমাণিত হলেই মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণিত হয়। এ ছাড়া শেখ ফজলে নুর তাপস, হাসানুল হক ইনু এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি মাকসুদ কামালের সঙ্গে কথোকথন থেকে প্রমাণ হয়েছে সারাদেশে সব হামলার বিষয়ে শেখ হাসিনা সম্পূর্ণভাবে জ্ঞাত ছিলেন। তিনি সরাসরি হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
তাজুল ইসলাম বলেন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল পরিকল্পনাকারী হিসেবে ছিলেন সর্বোচ্চ কমান্ড তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে। তাঁর বাসায় প্রতি রাতে ‘কোর কমিটির’ বৈঠক হতো। মানুষ মারার ব্যাপারে তিনি আইজিপিকেও নির্দেশ দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। এরপর প্রধান কৌঁসুলি জেনেভা কনভেনশনের ৪৯ ও ৫০ ধারা এবং রোম স্ট্যাটিউটের ২৫(৩) অনুচ্ছেদ তুলে ধরেন। জেনেভা কনভেশনের ৮৭ ধারায় আদেশকারীর দায়িত্বের কথা বলা হয় এবং তা তিনি পড়ে শোনান।
তাজুল ইসলাম ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটির’ ওপর আন্তর্জাতিক আদালতের কয়েকটি রায় ও সিদ্ধান্ত পড়ে শোনান। এ সময় ট্রাইব্যুনালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি জেনারেল তোমোয়ুকি ইয়ামাশিতার যুদ্ধাপরাধের মামলাসহ তিনটি মামলার অংশ পড়ে শোনান।
তিনি বলেন, ‘ওইসব মামলায় যেভাবে ওয়াইডস্প্রেড এবং সিস্টেমেটিক অ্যাটাক প্রমাণ হয়েছে, তার থেকে অনেক বেশি স্বচ্ছভাবে এখানে প্রমাণিত হয়েছে। নিরস্ত্র জনগণের ওপর ওয়াইডস্প্রেড এবং সিস্টেমেটিক অ্যাটাক হয়েছে। এন্টায়ার পপুলেশন অব জিওগ্রাফিক্যাল এনটিটির ওপর লার্জ স্ক্যাল অ্যাটাক হয়েছে।’
তিনি বলেন, দেশব্যাপী হামলা, আঘাত, আক্রমণ, মৃত্যু, আহত হয়েছে। ১৪০০ জন নিহত এবং ২৫ হাজার আহত হয়েছেন। একজনের জন্য একবার মৃত্যুদণ্ড হলে শেখ হাসিনার ১৪০০ বার ফাঁসি হওয়া উচিত। কিন্তু আইনে এটা সম্ভব নয়। এজন্য মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আমরা তাঁর চরম দণ্ড দেওয়ার জন্য আবেদন করছি। যদি তাঁকে এ দণ্ড দেওয়া হয়, তাহলে ন্যায়বিচার পাবে দেশের জনগণ।
যুক্তিতর্কে তাজুল ইসলাম আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রের পুরো ফোর্সকে শেখ হাসিনা ব্যবহার করেছেন। বিজিবি, পুলিশ, আনসার, গোয়েন্দা সংস্থাকে; শুধু সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করতে পারেননি। তাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী বলা হয়। রাস্তায় দেখলে মানুষ তাদের বুকে জড়িয়ে ধরেন। ৩ আগস্ট দেশ প্রেমিক সেনাবাহিনী নির্বিচার হত্যাকাণ্ডে জনগণের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জনগণ তাদের ফুল দিয়েছে, চুমু খেয়েছে।’
তিনি বলেন, শুধু কোটা আন্দোলন দমন উদ্দেশ্য ছিল না। এ নৃশংসতার উদ্দেশ্য ছিল, শেখ হাসিনাকে ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা। নিরস্ত্র জনগণকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। সুতরাং এটা সুস্পষ্টভাবেই মানবতাবিরোধী অপরাধ। শেখ হাসিনার এসব কাজে চরম জিঘাংসা ফুটে উঠেছে।
সাংবাদিকদের যা বললেন চিফ প্রসিকিউটর
প্রেস ব্রিফিংয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ থেকে অপরাধ সংঘটনের পর পালিয়ে গেলেও ভারত থেকে সামাজিক মাধ্যমে ক্রমাগত আন্দোলনকারীদের হত্যার হুমকি দিয়েছেন শেখ হাসিনা। যারা বিচার চেয়ে মামলা করেছেন, তাদেরও নির্মূলের কথা বলেছেন। তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে যে এত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ করার পরও তাঁর মধ্যে ন্যূনতম অনুশোচনা নেই।
আসাদুজ্জামান খান কামাল সম্পর্কে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘গ্যাং অব ফোরের সদস্য ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বাসায় প্রতিরাতে মিটিং করে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হতো। ড্রোন ওড়ানোসহ হেলিকপ্টার থেকে মারণাস্ত্র ছোড়ার সিদ্ধান্ত হতো। তিনি নিজে গ্রাউন্ডে গিয়ে দেখেছেন সঠিকভাবে হত্যা করা হচ্ছে কিনা। তাঁকে ভিডিও দেখানো হয়েছে। তিনি কমান্ড স্ট্রাকচারে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন। এ কারণে তাঁর ব্যাপারেও চরম দণ্ড চেয়েছি ট্রাইব্যুনালে।’
চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজসাক্ষী হয়ে সাবেক আইজিপি আইন অনুযায়ী আদালতকে তথ্য দিয়ে বা সত্য উদঘাটনে সাহায্য করেছেন। তাঁর ব্যাপারে আদালত সিদ্ধান্ত নেবেন। এ ছাড়া যারা শহীদ ও আহত হয়েছেন, তারা হয়তো পরিবারের আলোর প্রদীপ ছিলেন। ভবিষ্যতে পরিবারের দায়িত্ব নিতেন তারা। সুতরাং এসব পরিবারের ক্ষতিপূরণের জন্য আসামিদের সম্পদ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত বলে আদালতের কাছে আদেশ চেয়েছেন।
তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাই-আগস্টে সংঘটিত হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত ও সঠিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা আমাদের অঙ্গীকার ছিল। আশা করি, আমরা সেই অঙ্গীকার রক্ষা করতে পেরেছি। আমরা আদালতে স্পষ্টভাবে অপরাধ প্রমাণ করেছি।
১২ অক্টোবর থেকে টানা পাঁচ দিন প্রসিকিউশন পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়েছে। গত ১০ জুলাই শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আমলে নিয়ে চার্জ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল-১। এরপর প্রসিকিউশনের ৫৪ জন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন।
- বিষয় :
- চিফ প্রসিকিউটর
- তাজুল ইসলাম
