ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নির্বাচনের মাঠে তাৎক্ষণিক সাজার ব্যবস্থা চায় পুলিশ

নির্বাচনের মাঠে তাৎক্ষণিক সাজার ব্যবস্থা চায় পুলিশ
×

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সম্মেলন কক্ষে মতবিনিমিয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৮:১৮ | আপডেট: ২১ অক্টোবর ২০২৫ | ১২:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কোনো সংশয় দেখছে না নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাও নির্বাচন আয়োজন ঘিরে উদ্বেগজনক কোনো তথ্য দেননি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জোর দিয়ে বলেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তপশিল ঘোষণার পর থেকে সারাদেশে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম শক্তভাবে কার্যকর রাখার কথা বলেছে পুলিশ। ভ্রাম্যমাণ আদালত আচরণবিধি ও আইন অমান্যকারীকে তাৎক্ষণিক সাজা দিলে বিশৃঙ্খলা ঘটানোর সাহস পাবে না বলে মনে করছেন তারা। এতে নির্বাচনের মাঠে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা সহজ হবে। অতীতে ভ্রাম্যমাণ আদালত থাকলেও তা ছিল অনেকটা ঢিলেঢালা। সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে ইসির সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতবিনিময় ও প্রাক-প্রস্তুতিমূলক সভায় এসব পরামর্শ উঠে আসে। 

এ ছাড়া ভোটের প্রচারে ড্রোন ব্যবহার করা যাবে না। আর সেনাবাহিনীর ভূমিকার বিষয়টি নির্ধারণ করা হবে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের আলোকে। র‍্যাব সদস্যরা ভ্রাম্যমাণ ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে।  

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে চার নির্বাচন কমিশনার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসান, পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলমমহ বিভিন্ন বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। 

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। এরপর ইসি তাদের প্রস্তুতি শুরু করে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ নিয়ে নানা মহল থেকে সংশয় প্রকাশ করা হচ্ছে। পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে ইসির সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। এমন প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষপর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে বর্তমান কমিশনের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম নির্বাচনে পুলিশের প্রস্তুতির বিষয় তুলে ধরেন। সভায় তিনি বলেন, নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের জন্য দেড় লাখ পুলিশকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ চলছে। ডিসেম্বরের মধ্যে পুলিশের প্রস্তুতি শেষ হবে। নির্বাচন ঘিরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ৭৫৪টি ভ্রাম্যমাণ আদালত সারাদেশে থাকবে। তারা কার্যকর ও শক্তভাবে দায়িত্ব পালন করলে তা সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কেউ আচরণবিধি ভাঙলে ভ্রাম্যমাণ আদালত দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিলে নির্বাচনী মাঠে বিশৃঙ্খলা তৈরিতে অন্যরা ভয় পাবে। এ ছাড়া ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটির কার্যক্রম জোরালোভাবে দৃশ্যমান করা গেলেও পুলিশের জন্য আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের কাজ কিছুটা সহজ হতে পারে।  

এ ব্যাপারে গতকাল সন্ধ্যায় যোগাযোগ করা হলে পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম সমকালকে বলেন, দেশবাসী এখন ভোটের দিকে মনোযোগী। ইসির বৈঠকে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ইলেকটোরাল ইনকোয়ারির ব্যাপারে মত তুলে ধরেছি। এগুলো শক্তভাবে দৃশ্যমান থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা পুলিশের জন্য অনেক সহজ হবে। 

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সিআইডির পক্ষ থেকে বলা হয়, ভোটের সময় ২৪ ঘণ্টা সাইবার প্যাট্রলিং আরও জোরদার করবে তারা। গুজব, ভুল ও অসত্য তথ্যের ব্যাপারে জনগণকে সতর্ক করবে সিআইডি। এ ছাড়া এআই দিয়ে কোনো ভুয়া তথ্য ছড়ালে সেটির ফ্যাক্ট চেকিংয়ের ব্যাপারে কাজ করবে। ক্রাইম ও ফরেনসিক দলও নিয়োজিত থাকবে। নির্বাচন ঘিরে সিআইডির সাইবার টিম নজর বাড়াবে সাইবার জগতে।  
বৈঠক সূত্র আরও বলছে, কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকালে সংবাদকর্মী ও পর্যবেক্ষকদের পরিচয়পত্রে কিউআর কোড বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কোনো পক্ষ নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করলে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়। 

বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ১৩ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল ভোটকেন্দ্র ও নির্বাচনী এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার পরিকল্পনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম সমন্বয়, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা নিশ্চিত, অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য প্রতিরোধ, বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের নিরাপত্তা, ডাকযোগে ভোটের (পোস্টাল ভোট) ব্যবস্থাপনা, সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা, পার্বত্য এলাকায় নির্বাচনী সরঞ্জাম পরিবহন, হেলিকপ্টার সহায়তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো।

সংবাদ সম্মেলনে ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেন, সভায় সুষ্ঠু নির্বাচনের নানা চ্যালেঞ্জের বিষয় উঠে এলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভোটের উপযোগী রয়েছে। এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরেও কোনো উদ্বেগ দেখিনি। বর্তমান কিংবা ভোটের সময়কার পরিস্থিতি নিয়েও কোনো শঙ্কা প্রকাশ করা হয়নি। বরং এটা দেখেছি, কমিশনের মতো তারাও একটা ভালো নির্বাচনের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। 
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পাঁচ দিনের বদলে আট দিন মাঠে রাখার প্রস্তাব এসেছে। নির্বাচনের আগে তিন দিন, নির্বাচনের দিন এবং পরবর্তী চার দিন। বিষয়টি তারা যাচাই করবেন। এআই প্রযুক্তির ব্যবহারের বিষয়ে ইসি সচিব বলেন, গেল দুর্গাপূজায় এনটিএমসি প্রযুক্তি ব্যবহার করে সফলভাবে ৩৫ হাজারের বেশি মণ্ডপ তদারকি করা হয়েছে, সেই অভিজ্ঞতা নির্বাচনে প্রয়োগ করা যেতে পারে। নির্বাচনী প্রচারণায় ড্রোন ব্যবহার করা যাবে না। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার প্রয়োজনে ড্রোন ব্যবহার করবে।

আখতার আহমেদ বলেন, সভায় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ভোটের মাঠে ৯০ হাজার থেকে এক লাখ সদস্য মোতায়েনের কথা জানানো হয়। পুলিশ সদস্য থাকবে দেড় লাখ। আনসারের সদস্য সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় লাখ। পুলিশের বডিওর্ন ক্যামেরা ও ড্রোনের ব্যবস্থা থাকবে। 

সভায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে তৎপর হওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়। লুট হওয়া অস্ত্রের বিষয়ে বাহিনীগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়, ৮৫ শতাংশ অস্ত্র তারা উদ্ধার করেছেন। আরও কিছু অস্ত্র এবং কিছু গোলাবারুদ উদ্ধারের প্রক্রিয়া চালু আছে। 

সভায় পার্বত্যাঞ্চলে ভোটের সামগ্রী আনা-নেওয়ার কাজে হেলিকপ্টার ব্যবহারের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়। এ সময় যেসব স্থানে ভোটের সামগ্রী আনা-নেওয়া করা হবে, সেসব জায়গার নিরাপদ পরিবহন ও হেলিপ্যাড প্রস্তুত রাখতে সেনা ও বিমানবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়। 

ইসি সচিব জানান, বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় এখন সশস্ত্র বাহিনী মাঠে রয়েছে। সে ক্ষেত্রে তাদের কাজে সমন্বয়ের বিষয়টিও সভায় আলোচনা হয়েছে। সব সংস্থায় কিছু নিজস্ব ইন্টেলিজেন্স রয়েছে, তারা সমন্বয় করে কাজ করলে এটি আরও সুসংগত হবে।

সেনাবাহিনী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে মাঠে আছে, আগামী নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী এ ধরনের ক্ষমতা নিয়ে থাকবে কিনা? এমন প্রশ্নে সচিব বলেন, এটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সশস্ত্র বাহিনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে মোতায়েন হবে, নাকি ইন এইড টু সিভিল পাওয়ারের (আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগী) অধীন হবে, সেটা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন হয়ে এলে নির্ধারণ হবে। এ ক্ষেত্রে আরপিওর সঙ্গে যেন সাংঘর্ষিক না হয়, সেটা দেখা হবে। 
নির্বাচনকেন্দ্রিক নিরাপত্তা রক্ষায় বাজেট কবে চূড়ান্ত হবে– জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেউ বাজেটের কথা তোলেননি। তবে বাজেট তো সবসময় থাকে। গ্রহণযোগ্য একটা বাজেট অর্থ বিভাগে পাঠিয়ে ব্যবস্থা করতে সময় লাগবে।

সভায় সেনাবাহিনী প্রধানের প্রতিনিধি লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিজানুর রহমান শামীম, নৌবাহিনী প্রধানের প্রতিনিধি রিয়ার অ্যাডমিরাল মীর এরশাদ আলী, বিমানবাহিনী প্রধানের প্রতিনিধি এয়ার ভাইস মার্শাল রুশাদ দিন আসাদ, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবু মোহাম্মদ সরোয়ার ফরিদ, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার (ডিজিএফআই) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম অংশ নেন। 

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, আনসার ও ভিডিপি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ, বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. জিয়াউল হক, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল কাইয়ুম মোল্লা, র‍্যাব হেডকোয়ার্টার্সের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক জি এম আজিজুর রহমান এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. ছিবগাত উল্লাহও সভায় উপস্থিত ছিলেন। 

 

আরও পড়ুন

×