আলোচনা সভায় বক্তারা
চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরও আদিবাসীরা অধিকারহারা
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫ | ২২:০৪
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক অধিকারসহ মৌলিক মানবাধিকারকে অস্বীকার করার খেলা শুরু করেছিল পাকিস্তানের শাসকরা। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়েও তা চালিয়ে নেওয়া হয়েছে। এমনকি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরও যে নতুন বন্দোবস্তের কথা বলা হয়েছে, সেখানেও তা অনুপস্থিত।
আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচারহীনতা সংস্কৃতি’ শীর্ষক এ আলোচনার আয়োজন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন।
বেসরকারি সংস্থা এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার বিষয়গুলো সবসময় উহ্য থেকে গেছে। ওই অঞ্চলের গণমানুষের অধিকার সুরক্ষার জন্য যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি করা হয়েছিল, সেটিরও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকারকে বিগত ৫০ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ওপর সংগঠিত হত্যা, ভূমি দখল, সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনাগুলো তদন্তের জন্য একটি আন্তর্জাতিক কমিশন গঠনের আহ্বানও জানান তিনি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের সদস্য দীপায়ন খীসার সঞ্চালনায় এবং যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম চৌধুরী, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান ও নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরিন হক, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান প্রমুখ।
খায়রুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, জনসংহতি সমিতির প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ১৯৭৬-৯৭ পর্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলে দুই দশকে কমপক্ষে এক লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। গত ২৭ বছরে পাহাড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হয়নি। তিনি বলেন, এ ধরনের কাঠামোগত বিচারহীনতা দূর করতে হলে শুধু নীতি নয়; বরং আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন।
সোহরাব হাসান বলেন, রাষ্ট্রের সব মানুষের মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এ দায়িত্ব যদি রাষ্ট্র সঠিকভাবে পালন করত, তাহলে আজ আলাদা করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষদের নিয়ে আলোচনা করতে হতো না। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আনয়নের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি করা হয়েছিল। রাষ্ট্রের সদিচ্ছার অভাবে এ চুক্তির পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
শিরীন হক বলেন, দেশের কোনো জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটি চাপিয়ে দেওয়ার মানে ওই জনগোষ্ঠীর মানুষের অধিকার, মানবিক মর্যাদাকে অপমান করা হয়। তিনি বলেন, সীমান্ত রক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী বাহিনী রাখা দরকার। কিন্তু সে বাহিনী যেন পাহাড়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কোনো ব্যাঘাত তৈরি না করে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী যে আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা আর এখন দেখতে পাচ্ছি না। তবে বাহাত্তরের সংবিধানের ‘দেশের জনগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন’– ধারা পরিবর্তন করে প্রস্তাবিত জুলাই সনদে ‘বাংলাদেশ একটি বহু জাতিগোষ্ঠীর, বহু সংস্কৃতির দেশ, যেখানে সব জনগোষ্ঠী তাদের অধিকার চর্চা করতে পারবে’– এমন ধারা যুক্ত করা আশাব্যঞ্জক।
পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের অধিকার সংরক্ষণ এবং শান্তি ফেরাতে একমাত্র বাংলাদেশ সেনাবাহিনীই পারে বলে মনে করেন ইফতেখারুজ্জামান। সেনাবাহিনীর প্রতি প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘বিগত ৪০ বছরে আপনারা ১০টি দেশে শান্তিরক্ষা মিশনে সফলতার সঙ্গে কাজ করেছেন। সারা বিশ্বে যদি শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে পারেন, তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা করছেন না কেন? সেনাবাহিনীর যদি সদিচ্ছা থাকে, তাহলে সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না, সেনাবাহিনীই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে সহযোগিতা দিয়ে সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
- বিষয় :
- আদিবাসী
- আলোচনা সভা
