ট্রাইব্যুনালে রাজসাক্ষী আবজালুল
ছয়জনের লাশ পুড়িয়ে দেন ওসি সায়েদ ও বিশ্বজিৎ
মানুষকে রক্ষা করতে না পারায় আদালতের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৮ | আপডেট: ২০ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
গণঅভ্যুত্থানের সময় গত বছরের ৫ আগস্ট আশুলিয়ায় পুড়িয়ে ফেলা মানুষকে রক্ষা করতে না পারায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন রাজসাক্ষী পুলিশের সাবেক এসআই শেখ আবজালুল হক। গতকাল বুধবার ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বে দুই সদস্যের বেঞ্চে এই সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
এদিন আশুলিয়ায় ছয় মরদেহ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামসহ ১৬ আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন আবজালুল।
জবানবন্দিতে আবজালুল বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে আশুলিয়া থানার ওসি এ এফ এম সায়েদকে আন্দোলন দমনসহ বিরোধীদের গ্রেপ্তার করতে মাঝেমধ্যে মোবাইল ফোনে নির্দেশনা দিতেন এমপি সাইফুল ইসলাম। এসব নির্দেশনা অধস্তন কর্মকর্তাদের দিয়ে বাস্তবায়ন করতেন ওসি সায়েদ।
তিনি আরও বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হ্যান্ড মাইক দিয়ে থানার সব কর্মকর্তা ও অধস্তনকে নিচে ডাকেন ওসি সায়েদ। সবার উদ্দেশে তিনি জুলাই আন্দোলনে শক্তভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেন। এরপর অন্য ইউনিট থেকে আসা বেশির ভাগ কর্মকর্তা ও ফোর্স নিয়ে বাইপাইল কেন্দ্রীয় মসজিদের দিকে যান তিনি। এক পর্যায়ে দুপুর আড়াইটার দিকে শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে গেলে ফোর্স নিয়ে থানায় চলে আসেন ওসি সায়েদ।
এরপর ওসির সঙ্গে থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মাসুদুর রহমান, পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) নির্মল কুমার, পুলিশ পরিদর্শক (ডিবি) আরাফাত হোসেনসহ অনেক পুলিশ সদস্য থানার গেটে অবস্থান নেন। বিকেল ৪টার দিকে ছাত্র-জনতার একটি অংশ থানার দিকে মিছিল নিয়ে এলে ওসির নির্দেশে এএসআই বিশ্বজিৎ ও কয়েকজন পুলিশ সদস্য গুলি ছোড়েন। তাৎক্ষণিক কয়েকজন গুলিবিদ্ধ ও রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে যান। পরে ওসি সায়েদের নির্দেশে পুলিশ সদস্যরা এসব লাশ তিন চাকার ভ্যানে তুলে পুলিশের আরেকটি পিকআপভ্যানে ওঠান। এই ঘটনা দেখার পর দুদিন আমি ট্রমায় ছিলাম।
আবজালুল হক আরও বলেন, ওই সময় এসআই আব্দুল মালেক ও এএসআই বিশ্বজিৎকে নিয়ে পরামর্শ করছিলেন ওসি। এরপর থানায় গিয়ে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট খুলে সিভিল পোশাকে পিস্তলটি নিয়ে থানা থেকে বের হয়ে যাই। পরে ফল বিক্রেতা কামালের সঙ্গে তার ভাড়া বাসায় উঠি।
জবানবন্দিতে এসআই আবজালুল হক বলেন, পরদিন ভোরে ওই বাসা থেকে বেরিয়ে আমার বাসায় যাই। ১৫ আগস্ট থানায় গিয়ে আমার নামে ইস্যু করা পিস্তল ও গুলি জমা দিই। তখন জানতে পারি, পুলিশ যাদের হত্যা করে পিকআপে রেখেছিল, সেসব লাশ ওই দিনই ওসি সায়েদ ও বিশ্বজিৎ মিলে পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেন। পরে তারা বিকেল সাড়ে ৫টায় থানা ছেড়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে ক্যান্টনমেন্টে চলে যান।
সাবেক এই এসআই বলেন, তৎকালীন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি নুরুল ইসলাম, তৎকালীন ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান রিপন, সাভার (ক্রাইমস অ্যান্ড অপস) এডিশনাল এসপি (এসপি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) আব্দুল্লাহিল কাফি, সাভার সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহিদুলকে এ ঘটনা নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখিনি।
তিনি বলেন, আমাকে গত মে মাসে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে আমি শহীদ ভাইদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বিবেকের দায়বদ্ধতা থেকে কোনো প্ররোচনা ও প্রলোভন ছাড়া এই মামলায় রাজসাক্ষী হওয়ার জন্য আবেদন করি। যেন ট্রাইব্যুনালকে এ মামলার বিষয়ে সত্য তথ্য দিয়ে বিচারকাজে সহায়তা করে শহীদ ভাইদের ঋণ কিছুটা পরিশোধ করতে পারি। আমি শহীদ ভাইদের জন্য কিছু করতে না পারায় তাদের পরিবার ও ট্রাইব্যুনালের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
জবানবন্দি গ্রহণ শেষে আবজালুলকে আংশিক জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী মিজানুর রহমান। আজ বাকি জেরা শেষ করা হবে।
চানখাঁরপুলের মামলায় তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য শেষ
গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ আটজনের বিরুদ্ধে মূল তদন্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলামের তদন্ত শেষ হয়েছে। জেরার জন্য আগামী রোববার দিন ধার্য করা হয়েছে। বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বে দুই সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ গতকাল এ তারিখ ঠিক করেন।
এ মামলার ২৬ নম্বর সাক্ষী তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত এসপি মনিরুল ইসলাম। তিনি জবানবন্দিতে গত বছরের ৫ আগস্ট চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার পেছনে নিজের করা তদন্তের আদ্যোপান্ত উপস্থাপন করেন।
