তপশিল হলেও আইইবি-আইডিইবি নির্বাচনে ‘না’
পেশাজীবী সংগঠনে নির্বাচন নিয়ে অনীহা
সাব্বির নেওয়াজ
প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫৯ | আপডেট: ২৬ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
জোর দাবি থাকলেও পেশাজীবীদের সংগঠনগুলোতে নির্বাচন আয়োজনে অনাগ্রহ দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন দলের সমর্থকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, ক্ষোভ-বিক্ষোভ, হামলা, ভাঙচুরের ঘটনায় নির্বাচন আটকে আছে। তপশিল ঘোষণা করেও পরে তা পিছিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও কোথাও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পেশাজীবীদের নির্বাচন করার কথা বলা হচ্ছে।
দেশের প্রকৌশলীদের সংগঠন ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করেও তা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, জাতীয় নির্বাচনের পর আইইবির নির্বাচন হবে। ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের সংগঠন ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) একই রকম সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দুটি সংগঠনই চলছে অনির্বাচিত কমিটি দিয়ে।
গত বছর গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি হয়েছে দুই সংগঠনে। আগের সরকারের আমলে গঠিত দুই সংগঠনের নেতারা গণঅভ্যুত্থানের পর কার্যালয়ে যাননি। গত বছর ২৪ অক্টোবর আইইবির নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে রিয়াজুল ইসলামকে সভাপতি ও সাব্বির মোস্তফা খানকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। ওই দিন রাজধানীর রমনায় আইইবি মিলনায়তনে বিশেষ সভায় অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (অ্যাব) মহাসচিব আলমগীর হাছিন আহমেদ জানান, আগের কমিটির সদস্যরা পদত্যাগ করেছেন। তিনি নতুন কমিটির জন্য ১০ জনের নাম প্রস্তাব করেন। পরে সভায় আইইবি সদস্যদের সমর্থন নিয়ে কমিটি চূড়ান্ত করা হয়। এদিন আইইবির ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের জন্যও নতুন কমিটি গঠন করা হয়।
আইইবির সভাপতি রিয়াজুল ইসলাম রিজু অ্যাবের সভাপতি। তিনি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান। সাধারণ সম্পাদক সাব্বির মোস্তফা বুয়েটের অধ্যাপক। সংগঠনের একাধিক নেতা সমকালকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আইইবির দায়িত্বে থাকা নেতারা নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন। সংগঠনকে ধ্বংস করেছেন। তাদের বিচার করতে হবে। আইইবিকে বৈষম্যহীন করে গড়ে তুলতে হবে। সদস্যদের স্বার্থকে সবার ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। সে লক্ষ্যে তারা কাজ করছেন।
সারাদেশে ৫৬ হাজারের বেশি রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রকৌশলী আইইবির সদস্য। তাদের মধ্যে ২৮ হাজারের বেশি এবার ভোটার হয়েছেন। প্রকৌশলী সেলিম ভূঁইয়াকে প্রধান করে নির্বাচন কমিশনও গঠিত হয়। এ কমিশন আগামী ১৮ ডিসেম্বর ভোট গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করে তপশিল ঘোষণা করেছিল। এর পর সারাদেশের ২৬০ প্রকৌশলী নির্বাহী কমিটির কাছে নির্বাচন পেছানোর আবেদন করেন। তাদের যুক্তি– জাতীয় নির্বাচনের আগে আইইবির নির্বাচন সম্ভব নয়।
এ ব্যাপারে আইইবির সাধারণ সম্পাদক সাব্বির মোস্তফা সমকালকে বলেন, ‘নির্বাচনের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলাম। তবে কিছু প্রকৌশলী নির্বাচন পেছানোর আবেদন করেন। আমরা তা কাউন্সিলে উপস্থাপন করি। ১৬ অক্টোবর কাউন্সিল সিদ্ধান্ত দেয়, জাতীয় নির্বাচনের পর আইইবির নির্বাচন হবে। এ সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়েছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা হলে তারপর সিদ্ধান্ত নেব, কবে আমাদের নির্বাচন হবে।’
এভাবে নির্বাচন পেছানোর যুক্তি কী– জানতে চাইলে আইইবির সহসভাপতি এটিএম তানভীরুল হাসান সমকালকে বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনে সারাদেশে কেন্দ্র ও উপকেন্দ্র মিলিয়ে প্রায় ৪৫টি স্থানে ভোট হয়। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশের। আমাদের কাউন্সিলররা মনে করেছেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে পুলিশের ব্যস্ততা থাকবে। এই নির্বাচন হয়ে গেলে আইইবির নির্বাচন হতে পারে। সংগঠনের গঠনতন্ত্রে এক বছর পর্যন্ত নির্বাচন পেছানোর আইনগত সুযোগ রয়েছে। তাই কোনো নিয়মের ব্যত্যয় এ ক্ষেত্রে ঘটছে না।’
আইডিইবির নির্বাচন হয়েছিল ২০২৩ সালে
সারাদেশে প্রায় ২০ লাখ ডিপ্লোমা প্রকৌশলী আছেন। তাদের সংগঠন আইডিইবির সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০২৩ সালে। এতে একেএমএ হামিদ সভাপতি ও মো. শামসুর রহমান সাধারণ সম্পাদক হন। এ কমিটির মেয়াদ ছিল গত জুন পর্যন্ত। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কমিটির নেতারা রাজধানীর কাকরাইলে আইডিইবি ভবনের কার্যালয়ে যাননি।
ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে ৪৭ সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি আইডিইবি পরিচালনা করছে। কমিটির আহ্বায়ক মো. কবীর হোসেন এবং সদস্য সচিব কাজী সাখাওয়াত হোসেন। এ কমিটি গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেয়।
কীভাবে দায়িত্ব নিলেন এবং পরবর্তী নির্বাচন কবে– এ প্রশ্নের জবাবে আইডিইবির অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির আহ্বায়ক মো. কবীর হোসেন সমকালকে বলেন, আগের কমিটির নেতারা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পালিয়ে যান। আইডিইবি ভবন পুরো অরক্ষিত হয়ে পড়ে। সেখানে হামলা এবং দুটি গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ অবস্থায় রাজধানী ও আশপাশের জেলায় থাকা প্রকৌশলীরা ভবন রক্ষায় এগিয়ে আসেন। তাদের বৈঠকে আইডিইবি পরিচালনার জন্য নেতৃত্ব খুঁজতে ১৭ সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। সার্চ কমিটি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি নির্বাচন করে।
নির্বাচন প্রশ্নে কবীর হোসেন বলেন, ‘৯ সেপ্টেম্বর আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই বছরের (২০২৪) ডিসেম্বর পর্যন্ত আমাদের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর আবার এ বছর জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।’
তিনি বলেন, ‘আমরা নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। নির্বাচন কমিশন গঠন, নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা, ছবিযুক্ত ভোটার তালিকার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এরপর নির্বাচন কমিশন ২৩ ডিসেম্বর ভোট গ্রহণের তারিখ ঘোষণা করে। তবে গত ২৫ অক্টোবর কাউন্সিল হয়েছে। এতে নির্বাচন এক বছর পিছিয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
সূত্র জানায়, কাউন্সিলররা যুক্তি দেন, সব জেলা কমিটি চূড়ান্ত হয়নি। তাই এখনই কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রকৌশলীরা সরকারি দায়িত্বে ব্যস্ত থাকবেন। এসব কারণে এ বছরের ডিসেম্বরে আইডিইবির নির্বাচন করা সম্ভব নয়।
অন্তর্বর্তীকালীন কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতা সমকালকে বলেন, তারা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে চান। এ জন্য সময় লাগছে। আগের কমিটি নির্বাচিত হলেও গ্রহণয়োগ্য নির্বাচন হয়নি। শুধু আগের সরকারের তাঁবেদার লোকদেরই নির্বাচন করতে দেওয়া হয়েছে। বিরোধী মতের কাউকে তখন মনোনয়ন ফরমই কিনতে দেওয়া হয়নি। আইডিইবিতে নানা অনিয়মের শ্বেতপত্র শিগগির আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।
বর্তমান কমিটির নেতাদের অভিযোগ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আগের কমিটির সভাপতি একেএমএ হামিদ ও সাধারণ সম্পাদক মো. শামসুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।
