আবুল সরকারের মুক্তি দাবি
ঠাকুরগাঁওয়ে ৩ বাউলকে মারধর, খুলনায় হামলা
আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে গতকাল বুধবার দুপুরে ঠাকুরগাঁওয়ে প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দিতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন একাধিক বাউলশিল্পী সমকাল
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫৮ | আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
মানিকগঞ্জে বাউলশিল্পীদের ওপর হামলার বিচার এবং আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে ঠাকুরগাঁওয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ ডাকা হয়েছিল। সেই সমাবেশের আগে হামলার শিকার হয়েছেন বাউলশিল্পীরা। মারধরে তিনজন আহত হয়েছেন। গতকাল বুধবার দুপুরে ঠাকুরগাঁও শহরের কোর্ট চত্বরে এ ঘটনা ঘটে। হামলার কারণে পরে আর সমাবেশ করতে পারেননি বাউলরা। এদিকে আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে খুলনায় গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের মানববন্ধনে হামলায় ১৫ জন আহত হয়েছেন। পুলিশের আপত্তিতে সিলেটে বাউল ঐক্য পরিষদের মানববন্ধন ও গানে গানে প্রতিবাদ কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। এ ছাড়া ফরিদপুরে আয়োজিত ‘স্বজন সমাবেশ’ মাঝপথে বন্ধ করে দিয়েছে একদল লোক।
ঠাকুরগাঁওয়ে আহতরা হলেন– শামসুদ্দিন চিশতী, মজিদ সরকার ও মোখলেছ। তাদের ঠাকুরগাঁওয়ের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে সদর থানার ওসি সারোয়ার আলম খান জানান, দুপুরে ঠাকুরগাঁও শহরের চৌরাস্তা মোড়ে বাউলশিল্পীদের প্রতিবাদ সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল। ‘সম্প্রীতির ঐক্য, ঠাকুরগাঁও’ ব্যানারে এ আয়োজন ঘিরে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তবে সমাবেশের আগে কোর্ট চত্বর এলাকায় তিন বাউলশিল্পীকে মারধর করে উৎসুক জনতা।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক রেজওয়ানুল হক রিজু বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের বাউলশিল্পীরা কোর্ট চত্বরে কর্মসূচি পালনের জন্য একত্র হচ্ছিলেন। সে সময় একদল উচ্ছৃঙ্খল মানুষ কোর্ট চত্বরে মিছিল নিয়ে এসে বাউলশিল্পীদের ওপর হামলা চালায় ও মারধর করে। তাদের ধরে লাঠি দিয়ে আঘাত করে, কিল, ঘুসি ও লাথি দেয়।
তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক মানুষের মতপ্রকাশ করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু ঠাকুরগাঁওয়ে বাউলশিল্পীদের ওপর যে হামলা ও মারধরের ঘটনা ঘটেছে, এটি দুঃখজনক। এ ঘটনায় থানায় মামলা করা হবে।
ওসি সারোয়ার জানান, অভিযোগ থাকলে বাউলশিল্পীদের লিখিতভাবে থানায় জমা দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মানিকগঞ্জের বাউলশিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে পাঠানো হয়। এ নিয়ে রোববার তাঁর মুক্তি ও শাস্তির ভিন্ন দাবিতে মানিকগঞ্জে কর্মসূচি ডাকে দুটি পক্ষ। পরে ‘তৌহিদী জনতা ও আলেম-ওলামা’ ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল থেকে আবুল সরকারের অনুসারী বাউলদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় পরদিন সদর থানায় মামলা করেন হামলায় আহত বাউলশিল্পী আবদুল আলিম। তবে তিন দিনেও কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।
মির্জা ফখরুলের নিন্দা
বাউলদের ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেই সঙ্গে তিনি রাজধানীর কাকরাইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। মির্জা ফখরুল বলেন, বাউলদের ওপর হামলা ন্যক্কারজনক ঘটনা। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। তাদের ওপর হামলা উগ্র ও ধর্মান্ধদের হামলা বলে আমি মনে করি। এসব হিংসা, প্রতিহিংসার পথ বেছে নেওয়া কারও জন্য শোভনীয় নয়। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করি।
গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের ওপর হামলা
আবুল সরকারের মুক্তি, বাউল ও সাধু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার প্রতিবাদে গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট আয়োজিত মানববন্ধনে হামলা ও মারধরের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার বিকেল ৫টার দিকে নগরীর শিববাড়ী মোড়ে এ ঘটনা ঘটে। মারধরে বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রী, ছাত্র গণমঞ্চ, ছাত্র ইউনিয়নের প্রায় ১৫ জন আহত হয়েছেন। তাদের ব্যানারও পুড়িয়ে দেওয়া হয়। হামলার ঘটনায় আপ বাংলাদেশ ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের দুষছেন ভুক্তভোগীরা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকেল সাড়ে ৩টায় পূর্ব ঘোষিত মানববন্ধন কর্মসূচি ছিল গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের। এর আগে শিববাড়ী মোড়ে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন আপ বাংলাদেশের নেতাকর্মীরা। পরে তাদের সঙ্গে এনসিপি ও কমার্স কলেজ ছাত্রশিবিরের কয়েকজন নেতাকর্মীরা যোগ দেন। বিকেল ৫টার দিকে ছাত্র জোটের নেতাকর্মীরা ব্যানার নিয়ে সড়কে নামলে তাদের কিল-ঘুসি মারতে শুরু করেন অন্যরা। কয়েকজনকে লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। হামলার ঘটনায় ভিডিও ফুটেজও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ফুটেজে দেখা যায়, আপ বাংলাদেশের খুলনা মহানগর যুগ্ম আহ্বায়ক ফয়জুল্লাহ শাকিল হামলার জন্য তাঁর কর্মীদের উদ্বুব্ধ করছেন। হামলার পর তিনি ব্যানার পুড়িয়ে দেওয়ারও নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের প্রচার সম্পাদক নুরুল করিম, কমার্স কলেজ ছাত্রশিবিরের সভাপতি তারেক রহমান, কর্মী হুজাইফাসহ কয়েকজনকে মারধরে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়। এর মধ্যে ফয়জুল্লাহ শাকিল ও নুরুল করিম মারধরের ভিডিও নিজেদের ফেসবুক পেজেও পোস্ট করেন।
ছাত্র ইউনিয়নের জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সজীব খান অভিযোগ করে বলেন, ‘মানববন্ধনের জন্য বেলা ৩টার মধ্যে শিববাড়ী মোড়ে জড়ো হলে প্রশাসনের লোকজন মানববন্ধন করতে নিরুৎসাহিত করে। আমরা অন্যায় কিছু করছি না, এ জন্য মানববন্ধনের সিদ্ধান্তে অটল থাকি। বিকেল ৫টার দিকে ব্যানার নিয়ে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আপ বাংলাদেশ ও শিবিরের ছেলেরা আমাদের ওপর হামলা করে। তারা খুঁজে খুঁজে মারধর করে। আমাদের ১৫ জন আহত হয়েছেন, তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।’
আপ বাংলাদেশের খুলনা মহানগরের যুগ্ম আহ্বায়ক ফয়জুল্লাহ শাকিল বলেন, ‘ওরা প্রথমে আমাদের এক কর্মীকে মারধর করেছে। পরে সবাইকে এক জোট হয়ে ওদের মারধর করে। এখন থেকে রাম ও বামদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
কমার্স কলেজ ছাত্রশিবিরের সভাপতি তারেক রহমান বলেন, ‘ব্যক্তিগত প্রয়োজনে শিববাড়ী মোড়ে গিয়ে দেখি, আমার পরিচিত এক ছোট ভাইকে মারধর করছে। তখন আমি অন্যদের সঙ্গে প্রতিবাদ করি।’
খুলনা মহানগর ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক রাকিব হাসান বলেন, ‘শিববাড়ী মোড়ে শিবিরের কোনো কর্মসূচি ছিল না। মানববন্ধনে হামলাও শিবির সমর্থন করে না। মারধরে শিবিরের কেউ জড়িত থাকলে এই দায় তার।’
নগরীর সোনাডাঙ্গা থানার ওসি কবির হোসেন বলেন, বামপন্থি ছাত্রদের মানববন্ধনে ছাত্র-জনতার ব্যানারে হামলা হয়েছে। কয়েকজনকে মারধর করা হয়। তবে কেউ গুরুতর আহত হয়নি। পরে আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছি।
সিলেটে বাউলদের কর্মসূচি স্থগিত
বাউলশিল্পী আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে সিলেটে বাউল ঐক্য পরিষদের মানববন্ধন ও গানে গানে প্রতিবাদ কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। কারণ প্রায় একই সময়ে ও একই স্থানে বাউল আবুল সরকারের শাস্তির দাবিতে প্রতিবাদ সভা ডাকে ‘তৌহিদী জনতা’। তাই বিশৃঙ্খলা এড়াতে বাউলশিল্পীদের কর্মসূচি পালনে আপত্তি জানিয়েছে সিলেট মহানগর পুলিশ। গতকাল দুপুরে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এই প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছিল।
সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুস বলেন, বাউলশিল্পীরা কর্মসূচি পালনের ব্যাপারে আমাদের কাছ থেকে কোনো অনুমতি নেননি। তবে এই স্থানে তৌহিদী জনতার পক্ষ থেকে একটি কর্মসূচি পালনের জন্য আমাদের কাছে আগেই আবেদন করা হয়েছিল। তাদের অনুমতি দেওয়াও হয়েছে। পরে শুনেছি, একই স্থানে বাউলরা একটি প্রোগ্রাম করবেন। বিশৃঙ্খলা এড়াতে তাদের প্রোগ্রাম না করতে বলা হয়েছে। পরে যথাযথভাবে অনুমতি নিয়ে কর্মসূচি ঘোষণা করতেও বলা হয়েছে।
বাউল ঐক্য পরিষদ সিলেটের সাধারণ সম্পাদক বাউলশিল্পী সূর্যলাল দাশ বলেন, ‘পুলিশ কমিশনার আমাদের ফোন করে জানিয়েছেন, শহীদ মিনার এলাকায় তৌহিদী জনতা কর্মসূচি ডেকেছে। তাই আমাদের কর্মসূচি অন্যদিন পালন করতে অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। এ কারণে আমরা আমাদের কর্মসূচি স্থগিত করেছি।’
শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে তৌহিদী জনতার বিক্ষোভ কর্মসূচির উদ্যোক্তাদের একজন ‘হযরত শাহজালাল (রহ.) তাওহিদি কাফেলা’র সদস্য সচিব শাহ মমশাদ আহমদ বলেন, ‘কথিত বাউলপন্থিরা সমাজকে অসুস্থ করে তুলছে।’
ফরিদপুরে মাঝপথে বন্ধ অনুষ্ঠান
বাউল-ফকিরদের ওপর হামলা ও মাজার ভাঙার প্রতিবাদে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবিতে ফরিদপুরে আয়োজিত স্বজন সমাবেশ মাঝপথে বন্ধ করে দিয়েছে একদল লোক। গতকাল বিকেলে ফরিদপুর প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কে এ ঘটনা ঘটে।
‘মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’– প্রতিপাদ্যে এ অনুষ্ঠান আয়োজন করে ‘বাংলার প্রান্তিক বাউল শিল্পীগোষ্ঠী’। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে অনুষ্ঠান শুরু হয়। একে একে বক্তব্য দেন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর জেলা শাখার সভাপতি আব্দুল মোতালেব, খেলাঘর জেলা শাখার সভাপতি আলতাফ মাহমুদ, বাউলশিল্পী বাবুল খান, নিজামউদ্দিন সাঁই, শফিকুল ইসলাম প্রমুখ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটের দিকে কয়েক ব্যক্তি ঘটনাস্থলে আসেন। ওই সময় গান পরিবেশন করছিলেন বাউলশিল্পী আওয়াল বাউল। আগত ব্যক্তিরা অনুষ্ঠান বন্ধ করতে বলেন। এ নিয়ে আয়োজকদের সঙ্গে তাদের বাগ্বিতণ্ডা হয়।
বাংলার প্রান্তিক বাউল শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক অরুণ শীল বলেন, ‘আগত ব্যক্তিরা বলেন আবুল সরকারকে নিয়ে কোনো কর্মসূচি পালন করা যাবে না। এক পর্যায়ে তারা মাইক কেড়ে নেন। এর পর আমরা বাধ্য হয়ে মাঝপথে আমাদের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিই।’
(খুলনা ও সিলেট ব্যুরো, ফরিদপুর অফিস এবং ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য)
- বিষয় :
- আবুল সরকার
- বাউলশিল্পী
- হামলা
