ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

সরকার কঠোর, শিক্ষকরা অনড়

বিদ্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে প্রাথমিক শিক্ষকদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’

সরকার কঠোর, শিক্ষকরা অনড়
×

সারাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা দাবি আদায়ে শাটডাউন কর্মসূচি পালন করছেন। ফলে ১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত রয়েছে। এর প্রতিবাদে গতকাল বুধবার বরিশালে সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫৯ | আপডেট: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

চলমান শিক্ষক আন্দোলন নিয়ে সরকার অনেকটা হঠাৎ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সরকারের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রণালয় চাকরিবিধি স্মরণ করিয়ে দিয়ে সরকারি শিক্ষকদের তা লঙ্ঘন না করতে গতকাল বুধবার চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছে। চাকরিবিধি লঙ্ঘন করা শিক্ষক নেতাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। 

অবশ্য এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষকরা বুধবার থেকে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি পালন শুরু করেছেন। আজ বৃহস্পতিবারও এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। বিদ্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালন শুরু করতে যাচ্ছেন তারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় গতকাল জরুরি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে শিক্ষকদের অবিলম্বে পরীক্ষায় ফেরার চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে কর্মবিরতি বা শাটডাউন অব্যাহত থাকলে সরকারি চাকরি আইন, আচরণবিধি ও ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়– ১১তম গ্রেড প্রদান; ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেডের জটিলতা নিরসন এবং প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির দাবি উঠেছে। এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় চিঠি ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পে-কমিশনের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বেতন স্কেল উন্নীতকরণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের দাবি সত্ত্বেও শিক্ষক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, বাস্তবে দাবি পূরণে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

এদিকে চার দফা দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অনেকটা ‘সরকারের চাপে’ই আন্দোলন সাময়িক স্থগিত করে বার্ষিক পরীক্ষায় ফিরেছেন। যদিও তারা বলছেন, ‘শিক্ষার্থীদের স্বার্থে’ তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (বাসমাশিস) গত মঙ্গলবার গভীর রাতে পরীক্ষায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেয়। গতকাল রাজধানীর গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট বয়েজ হাই স্কুলসহ বিভিন্ন বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, স্থগিত হওয়া পরীক্ষাগুলো ফের শুরু হয়েছে।

বাসমাশিসের নেতা মোহাম্মদ ওমর ফারুক সমকালকে বলেন, পরীক্ষার অনিশ্চয়তায় শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের মানসিক চাপ আমরা বুঝতে পেরেছি। পরবর্তী কর্মসূচি আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত জানানো হবে।

১ ডিসেম্বর থেকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা চার দফা দাবিতে লাগাতার কর্মবিরতি শুরু করেছিলেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে– সহকারী শিক্ষক পদকে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারভুক্ত করা; শূন্যপদে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন দ্রুত কার্যকর করা; টাইম স্কেল সিলেকশন গ্রেড বকেয়া আদায় এবং আগের মতো সহকারী শিক্ষকদের অগ্রিম বেতন সুবিধা বহাল রাখা। 

প্রাথমিকে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি
তিন দফা দাবি আদায়ে সহকারী শিক্ষকরা গতকাল থেকে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেছেন। অসংখ্য বিদ্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, ফলে বার্ষিক পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে।

শিক্ষকরা নিজ নিজ উপজেলা বা থানা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার (এটিইও) কার্যালয়ের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশও করেছেন। তবে ঢাকাসহ কিছু বিভাগীয় শহরে সীমিত আকারে পরীক্ষা নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক খায়রুন নাহার লিপি সমকালকে বলেন, ‘শিক্ষকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে শাটডাউন পালন করছেন। দাবি পূরণ না হলে কর্মসূচি চলবে।’

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) সূত্রে জানা যায়, দেশে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত তিন লাখ ৮৪ হাজারের বেশি শিক্ষকের বেশির ভাগই সহকারী শিক্ষক। প্রধান শিক্ষকরা দশম গ্রেডে উন্নীত হলেও সহকারী শিক্ষকরা এখনও ১৩তম গ্রেডে রয়েছেন, যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ বিরাজ করছে। 

দাবি আদায় আন্দোলনের সমন্বয়ক ও আহ্বায়কদের কয়েকজনকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার শোকজ নোটিশ দেওয়ায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে। তবে অভিভাবকরা বলছেন, হঠাৎ পরীক্ষা বন্ধ হওয়ায় শিশুরা মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের একজন আহ্বায়ক আনোয়ার উল্যাহ বলেন, ‘আমরা ২২ দিন অপেক্ষা করেছি। কোনো বাস্তব অগ্রগতি না দেখেই বাধ্য হয়ে শাটডাউনে যেতে হয়েছে।’ 

সারাদেশের প্রাথমিকে হযবরল অবস্থা 
ময়মনসিংহের অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বুবার ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষকরা। বার্ষিক পরীক্ষা দিতে এসে শ্রেণিকক্ষে তালা দেখে চরম দুর্ভোগে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। নান্দাইলের বিদ্যালয়গুলোতে হযবরল অবস্থার সৃষ্টি হয়। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে পরীক্ষা হতে দেখা গেলেও অধিকাংশ বিদ্যালয়ে হয়নি। 

লাগাতার কর্মবিরতি, বার্ষিক পরীক্ষা বর্জনের পর বরগুনার আমতলী উপজেলার ১৫২টি বিদ্যালয়ে কমপ্লিট শাটডাউন পালিত হয়েছে। বুধবার কোনো বিদ্যালয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে বিকেলে প্রধান শিক্ষক, নৈশপ্রহরী ও অভিভাবকদের সহযোগিতায় সব স্কুলে পরীক্ষা হয়েছে।

পাবনার চাটমোহরে শিক্ষকরা মানববন্ধন করেছেন। কর্মসূচি শেষে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দেন তারা। 

নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার এক হাজার ৯৮৫টি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কর্মবিরতি পালন শুরু করেছেন। এক হাজার ২৫৩টিতে শাটডাউন কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এর ফলে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বার্ষিক পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। তবে কিছু কিছু বিদ্যালয়ে অভিভাকদের দিয়ে পরীক্ষা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।  

ঝালকাঠির রাজাপুরের বিভিন্ন স্কুলে গতকাল কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি হয়েছে। তবে রাজাপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আখতার হোসেনের নেতৃত্বে পরীক্ষা হয়েছে।  

বরিশালের স্কুলগুলোতে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠানে তালা ঝুলিয়ে দেন। তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের চাপের মুখে অনেকে পরীক্ষা নিতে বাধ্য হয়েছেন। বানারীপাড়ার ১২৬ স্কুলের সহকারী শিক্ষকরা কর্মবিরতি পালন করেছেন। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।  

পিরোজপুরের কাউখালীতে একটি স্কুলে পরীক্ষা দিতে আসা শিক্ষার্থীদের স্কুল থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।  
 

 

আরও পড়ুন

×