যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি নতুন সংকটে
প্রতীকী ছবি
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:০৪ | আপডেট: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১১:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে মার্কিন সহায়তা সংস্থা ইউএসএইডের পর এবার গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়নও বন্ধ হতে যাচ্ছে। এতে নতুন করে চাকরি হারাতে যাচ্ছেন ৪৭৯ কর্মকর্তা-কর্মচারী। এরই মধ্যে ওষুধের মজুত শেষ হওয়ার পথে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যক্ষ্মা নির্মূলে বড় ধাক্কা লাগতে পারে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন। সব মিলিয়ে নতুন সংকটে পড়েছে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (এনটিপি)।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় তিন লাখ ৭৯ হাজার মানুষ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন। এর মধ্যে মারা যান ৪৪ হাজার। ২০৩০ সাল নাগাদ বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ৭০ হাজার ও মৃত্যুর সংখ্যা ছয় হাজারে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছে বাংলাদেশ। তবে দেশে এখনও ১৭ শতাংশ যক্ষ্মা রোগী শনাক্তের বাইরে রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর– এ সময়ের মধ্যে দেশে যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়েছে দুই লাখ ৭৮ হাজার ৬০৭ জন। এর মধ্যে ওষুধুপ্রতিরোধী (ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট) রোগীর সংখ্যা এক হাজার ২৫৮, যা বিশেষজ্ঞদের মতে উদ্বেগের কারণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) গত ১২ নভেম্বর এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যক্ষ্মা প্রতিরোধ ও নিরাময়যোগ্য রোগ, যা এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে সৃষ্ট। এটি সাধারণত ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায়, যা আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি বা থুথুর মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বে যক্ষ্মায় গত বছর আনুমানিক ১২ লাখ ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে এক কোটি ৭০ লাখ মানুষ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫৮ লাখ পুরুষ, ৩৭ লাখ নারী ও ১২ লাখ শিশু।
যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি থেকে গত ২৫ নভেম্বর মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জানানো হয়েছে, আগামী ৩১ ডিসেম্বর গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়ন শেষ হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী অনেকের চাকরির মেয়াদও শেষ হবে। নতুন অর্থের জোগান না হলে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো সম্ভব নয়। যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে নিয়োজিত একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, নতুন বছরের শুরু থেকেই সারাদেশে ৬৫০ কেন্দ্রে যক্ষ্মা শনাক্তকরণ বন্ধ হয়ে যাবে। এর আগে ইউএসএইড অর্থায়ন বন্ধ করলে দুই হাজার ২০০ কর্মী চাকরি হারান। এতে মাঠ পর্যায়ে অনেক জায়গায় রোগী শনাক্তকরণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, যক্ষ্মার ওষুধ ও কিটের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। সাধারণত কর্মসূচি সচল রাখতে ছয় মাস আগে ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়, তবে এবার এই কাজে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। ফলে যক্ষ্মার জীবাণু দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওষুধের ঘাটতি ও কার্যক্রমে মন্থরতার কারণে ওষুধপ্রতিরোধী যক্ষ্মা বাড়ছে। প্রতিবছর পাঁচ হাজার মানুষ নতুন করে ওষুধপ্রতিরোধী যক্ষ্মায় আক্রান্ত হচ্ছেন, যার অর্ধেক শনাক্ত হচ্ছে না।
সরকারি অর্থায়নও বন্ধ
স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (সেক্টর কর্মসূচি নামে পরিচিত) অধীন অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) আওতায় প্রায় তিন দশক জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে এই কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যায়। নতুন করে ডিপিপি জমা দিলেও অনুমোদন হয়নি। ফলে দেড় বছর ধরে এই রোগ প্রতিরোধে সরকারের তেমন কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। যদিও জরুরি কিট ও ওষুধের জন্য কিছু বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, দ্রুত অর্থায়ন ও প্রশাসনিক অনুমোদন না হলে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে বড় বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
দুর্বল সমন্বয়
বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সংগঠন সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশের সভাপতি কাজী সাইফউদ্দীন বেন্নূর বলেন, জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি শুরু থেকে আমলানির্ভর। এই কর্মসূচি চিকিৎসক ও অন্য সেবাদানকারীর মধ্যে সমন্বয় তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। সমস্যা সমাধানের জন্য গবেষণা বা বিশেষ উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। ফলে বাংলাদেশে যক্ষ্মা নির্ণয়ের হার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সংকট এড়াতে এখনই প্রশাসনিক অনুমোদন ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা শুরু করা জরুরি। নইলে আগামী বছরই যক্ষ্মা চিকিৎসা ও শনাক্তকরণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরচালক ডা. মোহাম্মদ আলী হাবীব গ্লোবাল তহবিল বন্ধের বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি।
কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) পরিচালক মো. হুজুর আলী জানিয়েছেন, যক্ষ্মা প্রতিরোধে সরকারি তহবিল ব্যবহার করে ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ওষুধ সরবরাহে কোনো ঘাটতি হবে না। স্বাস্থ্য সচিব সাইদুর রহমান বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) দাখিল করা হয়েছে। দ্রুত অনুমোদন হবে, ওষুধ কেনার কাজও চলছে।
