ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিজয়ের মাস

ঢাকায় উদ্বেগ আর অপেক্ষা

১০ ডিসেম্বর ১৯৭১: একাত্তরের ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধ চলে আসে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে। ওই সময় দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম ও বইয়ে প্রকাশিত তথ্য নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজন।

ঢাকায় উদ্বেগ আর অপেক্ষা
×

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:০০ | আপডেট: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তি ও মিত্রবাহিনী ঢাকার দিকে এগোচ্ছে সে খবর অনেকেই এর মধ্যে জেনে গেছেন। রেডিওর খবর কিংবা এক মুখ থেকে আরেকজনের কানে কথা ছড়িয়ে গেছে। খারাপ কিছুর আশঙ্কায় কেউ গ্রামের পথ ধরেছেন। কেউ আবার বিমান হামলার সতর্কতার মধ্যেও চায়ের কাপে নির্ভার চুমুক দিয়েছেন।

যুদ্ধদিনের ঢাকার এমন বর্ণনা পাওয়া যায় নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক জে পি স্টারবারের লেখা, জাহানারা ইমামের বই ‘একাত্তরের দিনগুলি’ এবং সেই সময়ে প্রকাশিত কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে। 

টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় ৭০ আমেরিকানসহ বিদেশি নাগরিক ছিলেন প্রায় ৫০০ জন। নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় তাদের ঢাকা থেকে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে ঢাকার নিরপেক্ষ এলাকা ঘোষণা করা হয় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল ও জাতিসংঘের ত্রাণ কার্যক্রমের সদরদপ্তরকে। এসব স্থানে বিদেশিদের জড়ো করে পরে অন্য এলাকায় নেওয়ার কথা ছিল।

ওই ৫০০ বিদেশির মধ্যে ছিলেন নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক জে পি স্টারবার। ১০ ডিসেম্বর কয়েকটি এলাকা ঘোরার সময় তিনি দেখেন, বিমান হামলার আশঙ্কায় শহরের বিভিন্ন স্থানে তৈরি করা হচ্ছে গভীর স্লিট ট্রেঞ্চ বা আশ্রয় খাল। রাস্তায় গাদাগাদি করে চলছে প্রাইভেটকার, তিন চাকার যান, ট্রাক আর জিপ। সেগুলোর হর্নের আওয়াজে যুদ্ধের মধ্যেও ঢাকা ছিল কোলাহলের নগরী।
হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে বেশ খানিকটা দূরে পুরান ঢাকায় মানুষের মাঝে দুই রকমের আবহ দেখা যায়। স্টারবার লিখেছেন, একটি খবর শুনে অন্য এলাকার মানুষ পুরান ঢাকায় জড়ো হয়েছিলেন। তারা শুনেছিলেন, যেসব এলাকা মুক্ত হয়েছে, সেগুলোতে যাওয়ার জন্য গেরিলা যোদ্ধারা পুরান ঢাকা হয়ে বের হওয়ার নিরাপদ পথ করে দেবেন। আরেকটি পক্ষ ছিল বিহারি মুসলমান ও পাঞ্জাবি। তাদের শঙ্কা ছিল সম্ভাব্য ‘মব সহিংসতা’ নিয়ে। 

অপেক্ষা, উদ্বেগ, রসিকতা
প্রয়োজনীয় কাজে ১০ ডিসেম্বর ঢাকার রাস্তায় বেরিয়েছিলেন জাহানারা ইমাম। স্মৃতিকথামূলক বই ‘একাত্তরের দিনগুলি’তে তিনি লিখেছেন, ‘বহু লোককে দেখলাম রিকশায় ও বেবিতে বোঁচকা-বুঁচকি ও স্যুটকেস নিয়ে চলেছে। অনেকে ঘাড়ে-মাথায় ও হাতে পুঁটলি নিয়ে হেঁটেও যাচ্ছে।’

একদিকে মানুষ যখন ঢাকা ছাড়ছিল, তখন ধীরে ধীরে রাজধানীর দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর সদস্যরা। আনন্দবাজার পত্রিকা তাদের প্রতিবেদনে লেখে, এদিন স্টিমার ও উড়োজাহাজে করে বহু সৈন্য মেঘনা নদী পার হয়ে ভৈরব বাজারে ঘাঁটি গড়ে। সামনে আর কোনো নদী না থাকায় তারা সোজা ঢাকার দিকে এগোবে।

স্থলভাগে যখন এমন অবস্থা, তখন ঢাকা ও আশপাশে পাকিস্তানিদের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে আকাশপথে হামলা চালায় ভারতীয় বিমানবাহিনী। এর মধ্যে ছিল বেতার কেন্দ্রও। এতে প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে যায় বেতার ভবন। তবে ইত্তেফাকে প্রকাশ হওয়া এপিপির খবরে বলা হয়, ভারতীয়রা বিমান হামলা চালায় ঢাকার বেসামরিক এলাকা লক্ষ্য করে। এর মধ্যে ছিল বিমানবন্দর সংযোগকারী ব্যস্ত সড়ক ও আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ঘোষিত নিরপেক্ষ এলাকা। তবে ভাগ্যক্রমে বোমাগুলো বসতিহীন স্থানে বিস্ফোরণ হয়।

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে থাকা বিবিসি ও অস্ট্রেলিয়া রেডিওর সংবাদদাতাদের বরাত দিয়ে ভারতের বার্তা সংস্থা ইউএনই সেই সময় জানায়, তিনশর বেশি অতিথির সবাই পরবর্তী ঘটনার জন্য উৎকণ্ঠিত ছিলেন। কিন্তু এর পরও জীবনযাত্রা ছিল স্বাভাবিক। অনেকে দাবা ও পিংপং খেলেন। মাঝেমধ্যে ছাদে গিয়ে যুদ্ধবিমান দেখেন। ভারতীয় ও মুক্তি বাহিনীর আসার খবরে তাদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। ভয় ছিল পাকিস্তানি বাহিনীদের নিয়ে। তারা যদি লড়াইয়ে নেমে ফয়সালা করতে চায়, তাহলে প্রচুর প্রাণহানি ঘটতে পারে।

ঢাকায় এমন পরিস্থিতির মধ্যেও ছিল রসিকতা। এমন একটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক জে পি স্টারবার লেখেন, আগের দিন ৭০০ শব্দের একটি চিঠি এসেছিল। সেটি ছিল কেরোসিন সংকট নিয়ে। অথচ, চিঠির শুরুটা হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রসঙ্গ ধরে। শুরুর বাক্যেই লেখা হয়েছিল, ‘সম্প্রতি ফ্যাশন নিয়ে অনেক বিতর্ক হচ্ছে …।’

সতর্কবার্তা ও ট্র্যাজেডি
এক দিন আগে জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাস হয়। সেটিতে ভারত-পাকিস্তান উভয়কে সৈন্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়। ইত্তেফাকের ১১ ডিসেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তান ১০ ডিসেম্বর সে প্রস্তাব মেনে নেয়। তবে ভারত তখনও তা প্রত্যাখ্যান করে। 

এদিন চীনের পিপলস ডেইলিতে প্রকাশিত নিবন্ধে ভারতকে সংযত ও প্রস্তাব মেনে নিতে বলা হয়। লেখা হয়, ‘তোমাদের এর জন্য চরম দুঃখজনক অবস্থায় নিপতিত হতে হবে।’ সেদিনই সামরিক কর্মকর্তাদের কাছে একটি বার্তা পাঠান ইন্দিরা গান্ধী। নির্দেশ দেন, ‘লড়াই চালিয়ে যাওয়ার’।

আগের দিন ঢাকার কারওয়ান বাজারে এতিমখানায় ভারতীয় বোমা হামলায় অর্ধশতাধিক নিহতের খবর প্রকাশ হয়েছিল। ১০ ডিসেম্বর সেটি অস্বীকার করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।

আরও পড়ুন

×