বিজয়ের মাস
নিক্সন-কিসিঞ্জারের উৎকণ্ঠা, ঢাকা দখলের লড়াইয়ে মুক্তিযোদ্ধারা
হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে রিচার্ড নিক্সন (বাঁয়ে) ও হেনরি কিসিঞ্জার। ছবি: নিক্সন ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:২৭ | আপডেট: ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৮:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
১২ ডিসেম্বর ১৯৭১। দিনটি ছিল রোববার। ঘটনাস্থল– যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিস। খানিকটা উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষায় প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও তাঁর জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক সহকারী হেনরি কিসিঞ্জার। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভারতকে ‘নিশ্চল যুদ্ধবিরতি’তে রাজি করানোর জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে যে বার্তা পাঠানো হয়েছে সেটির জবাব তখনও আসেনি।
দ্বিতীয় দফায় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবশালী নেতা লিওনিদ ব্রেজনেভের কাছে বার্তাটি পাঠানো হয়েছিল ১০ ডিসেম্বর শুক্রবার। দুই দিন পেরিয়ে গেছে। আগে থেকেই ১২ ডিসেম্বর নিক্সনের পর্তুগাল সফরের (ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের জন্য) সূচি ঠিক করা ছিল। তাই রওনা হওয়ার আগেই সোভিয়েতের জবাবের আশায় ছিলেন তিনি।
সেদিনের হোয়াইট হাউসের পরিস্থিতি নিজের লেখা বই ‘হোয়াইট হাউস ইয়ারস’-এ তুলে ধরেছেন হেনরি কিসিঞ্জার। লিখেছেন, ‘সকালে নিক্সন, হেইগ (আলেকজান্ডার হেইগ) ও আমি ওভাল অফিসে বসেছিলাম। আমাদের তাড়া ছিল। আবার অনুমান ও উত্তেজনা কাজ করছিল। সকাল ১০টা ৫ মিনিটে ফোন আসে। জানানো হয়, সোভিয়েতের জবাব প্রক্রিয়াধীন। আরও উল্লেখ করা হয়, পশ্চিম পাকিস্তানে আক্রমণের জন্য ভারতের কোনো পরিকল্পনা নেই। কিন্তু আমাদের মূল যে প্রশ্ন ছিল সেটি নিয়ে কিছু বলা হয়নি।’
হেনরি কিসিঞ্জার লিখেছেন, এমন ফোনকলের উদ্দেশ্য ছিল সম্ভবত কালক্ষেপণ। তাই মস্কোকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হেইগ ও আমি মিলে একটি বার্তা তৈরি করি। পরে সেটি হটলাইনে পাঠানো হয়। নিক্সন প্রশাসনের সময় এটি ছিল প্রথম হটলাইন ব্যবহারের ঘটনা। আর মার্কিন কৌশল কার্যকর করতে এবং মস্কোর কাছে পাঠানো বার্তার গুরুত্ব জোরদারের জন্য সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করে হোয়াইট হাউস। তাই নৌবহরকে মালাক্কা প্রণালি পেরিয়ে বঙ্গোপসাগরে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন নিক্সন।
_1765522631.png)
মার্কিন নৌবাহিনীর পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ এবং এর সঙ্গে থাকা কয়েকটি সাবমেরিন ও ডেস্ট্রয়ার ১০ ডিসেম্বর ভিয়েতনাম উপকূল থেকে রওনা হয়েছিল (নিউইয়র্ক টাইমস, ১৩ ডিসেম্বরের)। প্রাথমিকভাবে এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছিল, এটি ঢাকা থেকে মার্কিন নাগরিকদের উদ্ধার করবে। তখন এটিকে কেবল সিঙ্গাপুরের কাছাকাছি মালাক্কা প্রণালি পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১২ ডিসেম্বর প্রণালি পেরিয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে যাওয়ার অনুমতি পায়।
রিচার্ড নিক্সন মার্কিন নৌবহরকে কেবল বঙ্গোপসাগরের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি। সেই সঙ্গে চীনকে জানান, সোভিয়েত ইউনিয়ন যদি চীন অতিক্রম করে তাহলে যুক্তরাষ্ট্রও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে সমুচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে (মূলধারা: ৭১, মঈদুল হাসান)। এখানে উল্লেখ্য, মার্কিন নৌবহরের যাত্রার খবর শুনে সোভিয়েতের নৌবহরও ভারত মহাসাগরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল।
ঢাকা দখলের অভিযান
কয়েক দিন ধরেই ঢাকার দিকে যাচ্ছিলেন মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর সেনারা। আনন্দবাজার জানায়, ‘অপারেশন ঢাকা’ নামে ১২ ডিসেম্বর ঢাকা দখলের লড়াই শুরু হয়। একদিকে ভৈরববাজার থেকে সেনারা নরসিংদীতে পৌঁছায়। আরেক দল ময়মনসিংহ থেকে সামনে এগোয়। পাকিস্তানি সেনারা পাল্টা আক্রমণ চালালেও অগ্রযাত্রা থামাতে ব্যর্থ হয়। একজন অফিসারসহ ২৩ পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। আটক করা হয় ১২ জনকে।
_1765523134.png)
সেদিনের রণাঙ্গনের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরী বীরবিক্রমের বই ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক’-এ। তিনি লিখেছেন, ‘ভোরে ভারতীয় বিমানবাহিনী ভৈরবে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানের ওপর আক্রমণ চালায়। বেশ কিছু হেলিকপ্টার ওই দিনই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তৎকালীন নিয়াজ স্টেডিয়ামে অবতরণ করে এবং ভারতীয় ১০ বিহার রেজিমেন্টের সৈন্যদের নরসিংদী নিয়ে যেতে থাকে।’
মুক্তিযুদ্ধে ১ম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন মইনুল হোসেন চৌধুরী। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, সেদিন নৌকায় করে মেঘনা নদী পার হয়ে পুরো রেজিমেন্ট নিয়ে ভৈরববাজার এড়িয়ে নরসিংদী যাওয়ার চেষ্টা করেন। নদী পার হওয়ার সময় পাকিস্তানি বাহিনী দূরপাল্লার কামান থেকে গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। এর মধ্যেই নদী পার হয়ে রেললাইন ধরে নরসিংদী রেলস্টেশনের আশপাশে পৌঁছান। হেলিকপ্টারে করে সেখানে আগেই পৌঁছেছিল ভারতীয় বাহিনী।
নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সেদিন ঢাকার চারপাশে এবং অন্যান্য ঘাঁটিতে সৈন্য পুনর্গঠনের চেষ্টা করে। যদিও তখন তাদের অনেক ইউনিট বিচ্ছিন্ন ও সদস্যরা আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়েছে। তবুও কিছু ইউনিট কুমিল্লা, দিনাজপুর, রংপুরসহ কয়েকটি শহরের কাছে প্রতিরোধ চালিয়ে যায়। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে অবস্থানরতরা তখনও স্থল আক্রমণের মুখোমুখি হয়নি।
