শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম
১৯ বছরের নীরবতা ভেঙে প্রাণের স্পন্দন
২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৯ বাংলাদেশ বনাম আফগানিস্তান দলের ম্যাচ ফাইল ছবি
লিমন বাসার, উত্তরাঞ্চল
প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৯:০৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
২০২৫ সাল বগুড়ার জন্য ছিল একই সঙ্গে সংকট, প্রত্যাশা আর সম্ভাবনার বছর। খুন-সহিংসতা, নাগরিক ভোগান্তি আর রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ভিড়ে এ বছর ফিরে আসে চেনা সেই শব্দ ব্যাট-বলের ঠোকাঠুকি, গ্যালারির করতালি। দীর্ঘ দুই দশক পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে স্থান করে নেওয়ায় শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম যেন প্রাণ ফিরে পায়। এই প্রত্যাবর্তন শুধুই একটি ম্যাচ নয়, এটি ছিল বগুড়াবাসীর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান।
২০০৬ সালে যে উন্মাদনার ইতি ঘটেছিল, ২০২৫-এ বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ বনাম আফগানিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ম্যাচের মধ্য দিয়ে তা নতুন প্রাণ ফিরে পায়। দীর্ঘ বিরতির পর আন্তর্জাতিক কোনো দলের পদচারণায় মুখরিত হয় বগুড়ার মাটি। প্রথম ম্যাচেই জয় পায় বাংলাদেশ। কাজেই এটি কেবল একটি ম্যাচ ছিল না; বরং ছিল উত্তরবঙ্গের ক্রিকেটপ্রেমীদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার জবাব।
সোনালি অতীত ও দীর্ঘ উপেক্ষার ইতিহাস শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম নির্মিত হয় ১৯৬২ সালে। আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু ১৯৭০ সালে। বীর মুক্তিযোদ্ধা মাছুদুল আলম খান চান্দুর নামে এর নামকরণ হয়। ২০০৩ সালে ক্রীড়া কমপ্লেক্সের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং ২০০৪ সালে আধুনিক স্টেডিয়ামের উদ্বোধন হয়। স্টেডিয়ামটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মানচিত্রে জায়গা করে নেয় ২০০৬ সালে। সে বছর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের আয়োজনে প্রথমবারের মতো এই মাঠে আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর দ্বিপক্ষীয় সিরিজ ও আন্তর্জাতিক আসরের অংশ হিসেবে ওয়ানডে, টেস্ট, নারী ক্রিকেটসহ একাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়।
ওই বছর বাংলাদেশ জাতীয় দল শ্রীলঙ্কা, জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচ খেলে এই মাঠে। টেলিভিশন সম্প্রচার, দর্শকের উপচেপড়া ভিড় এবং আন্তর্জাতিক দলের উপস্থিতিতে তখন বগুড়ায় তৈরি হয়েছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। ১৮ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামটি উপচেপড়া দর্শকে ভরে উঠেছিল। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয় দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের স্মরণীয় মুহূর্তও এসেছে এই মাঠ থেকেই।
ঐতিহাসিক জয়ের সাক্ষী এই মাঠটি এরপরই যেন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আর প্রশাসনিক উদাসীনতার অজুহাতে দীর্ঘ ১৮ বছর এখানে কোনো বড় আসর বসতে দেওয়া হয়নি। বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকা থেকে শুরু করে অকেজো আউটফিল্ড, পিচ, জিমনেশিয়াম–সব মিলিয়ে মাঠটি হয়ে পড়েছিল জরাজীর্ণ।
স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠকরা জানান, জাতীয় দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিমের শৈশব ও অনুশীলনের স্মৃতির সঙ্গে এই মাঠের নাম জড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দলের হয়ে খেলা তানজিম তামিম, তৌহিদ হৃদয় ও শফিউল ইসলাম সুহাসের পথচলার সঙ্গেও বগুড়ার ক্রিকেট সংস্কৃতির সম্পর্ক রয়েছে। নারী ক্রিকেটেও বগুড়ার অবদান উল্লেখযোগ্য। রিতু মনি, খাদিজাতুল কোবরা ও শারমিন সুলতানার মতো ক্রিকেটাররা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফেরার খবরে বগুড়ার ক্রিকেট ঐতিহ্য নতুন করে আলোচনায় আসে।
ক্রীড়া সংগঠক শহিদুল ইসলাম বলেন, বিসিবির বার্ষিক সূচি ও ম্যাচ বণ্টনের নথিতে বগুড়ার অনুপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
২০২৫-এর প্রত্যাবর্তন প্রমাণ করেছে, বগুড়া আন্তর্জাতিক আয়োজনের জন্য কতটা প্রস্তুত। আন্তর্জাতিক ম্যাচের কারণে শহরের হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। পর্যটন ও খাবার সরবরাহ খাতে ব্যাপক প্রাণের সঞ্চার হয়েছিল। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে স্থানীয় তরুণ ও ক্রীড়া সংগঠকদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে।
ক্রীড়া সাংবাদিক এইচ আলিম বলেন, ২০২৫ সাল বগুড়াবাসীকে স্বপ্ন দেখিয়েছে। সেই স্বপ্ন আগলে রাখার দায়িত্ব এখন কর্তৃপক্ষের। অবকাঠামো উন্নয়ন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা বজায় থাকলে এ স্টেডিয়াম আবারও হতে পারে ক্রিকেটের অন্যতম দুর্গ।
- বিষয় :
- স্টেডিয়াম
