সরবরাহে ঘাটতি, বাড়তি দামেও মিলছে না এলপিজি সিলিন্ডার
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৩৩ | আপডেট: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৫:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের কারণে ভোক্তারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সর্বশেষ ডিসেম্বর মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের খুচরা মূল্য এক হাজার ২৫৩ টাকা নির্ধারণ করলেও বাজারে এর কোনো প্রতিফলন নেই। অধিকাংশ জায়গায় প্রতি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৫০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকায়, কোথাও কোথাও এর চেয়েও বেশি দামে।
ঢাকার মোহাম্মদপুর, বনশ্রী, মিরপুর, কল্যাণপুর, কাজীপাড়া ও আশপাশের এলাকা ঘুরে জানা গেছে, পাইকারি সরবরাহ কমে যাওয়ায় খুচরা বিক্রেতারা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন। আবার অনেক দোকানে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। ভোক্তাদের এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরতে হচ্ছে।
রাজধানীর বছিলার বাসিন্দা ওবায়েদ হোসেন বলেন, সাধারণত সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে এলপি গ্যাস কিনতে হয়। বৃহস্পতিবার পুরো এলাকা ঘুরে শুধু একটি দোকানে পেট্রোম্যাক্সের সিলিন্ডার পাওয়া গেছে। দাম চাওয়া হয় এক হাজার ৯০০ টাকা। তিনি বলেন, বাজারে এমন অরাজকতা কেন, তার জবাব কেউ দিচ্ছে না। রামপুরা এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম শুক্রবার একই অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, দুয়েকশ টাকা বেশি নিলেও সিলিন্ডার পাওয়া যেত। গত দুদিন ধরে পুরো এলাকা ঘুরে এক হাজার ৮০০ টাকার কমে সিলিন্ডার পাওয়া যায়নি। পরে মালিবাগ থেকে এক হাজার ৭০০ টাকায় এক সিলিন্ডার গ্যাস কিনেছি।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, সমস্যা শুরু হয়েছে ডিস্ট্রিবিউশন বা পরিবেশক পর্যায় থেকে। পাইকারিতে সরবরাহ কম, তাছাড়া বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। রামপুরার মল্লিক ব্রাদার্সের রণজিত মল্লিক বলেন, কোম্পানিগুলো ঠিকমতো গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। চাহিদার কথা জানালে কয়েক দিন পর সিলিন্ডার আসছে। ১২ কেজি সিলিন্ডার কিনছি এক হাজার ৫২০ টাকার বেশি দিয়ে। পরিবহন খরচ মিলিয়ে এক হাজার ৭০০ টাকার কমে বিক্রি করা সম্ভব নয়।
এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, শীতকালে বিশ্ববাজারে এলপিজির চাহিদা ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে নিয়মিত পরিবহনে ব্যবহৃত কিছু জাহাজও সংকটে পড়েছে। এতে ডিসেম্বর মাসে দেশের আমদানি কমে প্রায় ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে।
এলপিজি ব্যবসায়ী ও এনার্জিপ্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন রশীদ জানান, মাসে গড়ে এক লাখ ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টন এলপিজি আমদানি হলেও ডিসেম্বরে তা নেমেছে প্রায় ৯০ হাজার টনে। এতে সরবরাহ কমে গেছে। তাঁর দাবি, তারা পরিবেশকদের কাছে বিইআরসি নির্ধারিত দামেই সরবরাহ করছেন। খুচরা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির দায় তাদের নয়।
সরবরাহ সংকটের কথা জানিয়ে এলপিজি সিলিন্ডার পরিবেশক সমিতির সভাপতি সেলিম খান বলেন, সরবরাহ কম হলেও ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি নেওয়ার কোনো যুক্তি নেই।
বাজার অস্থিরতা নিয়ে ভোক্তা অধিকারবিষয়ক সংগঠন ক্যাব বলছে, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ ক্ষমতার ঘাটতির কারণে এ ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, সরবরাহ সংকটের নামে এখন যা হচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। বিইআরসি শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারায় ভোক্তাদের আস্থা নষ্ট হচ্ছে।
বাজারের এ পরিস্থিতি বিইআরসির নজরে আসার পর সংস্থাটি লোয়াবকে চিঠি দিয়ে নির্ধারিত দাম নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, আমদানি খরচ বাড়লে কোম্পানিগুলো প্রমাণসহ কমিশনে তথ্য জমা দেবে, এরপর মূল্য সমন্বয় বিবেচনায় নেওয়া হবে। এর আগে বাড়তি দামে বিক্রির সুযোগ নেই।
এদিকে জানুয়ারি মাসের জন্য এলপিজির দাম আগামীকাল রোববার ঘোষণা করবে বলে বিইআরসি বৃহস্পতিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে।
পাইপলাইনেও গ্যাস কম
ঢাকার অনেক আবাসিক এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। রাজধানীর তেজতুরী বাজার এলাকার বাসিন্দা সোহেল রহমান জানান, শুক্রবার সকাল থেকেই তাঁর বাসায় গ্যাস নেই। মধুবাগ এলাকার গৃহিণী নাসিমা বেগম জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে লাইনে গ্যাস নেই। তিনি বলেন, গত কয়েক দিন থেকেই গ্যাসের সরবরাহ কম। বিতরণ কোম্পানি তিতাস জানিয়েছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় গ্যাসের সংকট রয়েছে। শিল্পে একটু নজর দেওয়ায় আবাসিক গ্রাহকদের ভোগান্তি বেশি হচ্ছে। পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ ২৫০ কোটি ঘনফুটের বেশি বাড়ানো যাচ্ছে না।
- বিষয় :
- এলপিজি
- গ্যাস সরবরাহ
- দাম বৃদ্ধি
