ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

২৯৫টি অত্যাবশ্যক ওষুধের দাম নির্ধারণ করবে সরকার

২৯৫টি অত্যাবশ্যক ওষুধের দাম নির্ধারণ করবে সরকার
×

ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৮:০৭ | আপডেট: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ | ২১:৪৪

নতুন করে ১৩৫টি ওষুধ যুক্ত করে মোট ২৯৫টি জেনেরিক ওষুধকে ‘অত্যাবশ্যকীয়’ ঘোষণা করেছে সরকার। এসব ওষুধ নির্ধারিত দামে বিক্রি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে তাঁর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়। 

বৈঠক শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান। ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ও উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার উপস্থিত ছিলেন।

ডা. মো. সায়েদুর রহমান বলেন, মানুষের চিকিৎসা ও ওষুধ প্রাপ্যতার জন্য বিক্রেতাদের সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে বিক্রি করতে হবে। তবে এর জন্য সময় দেওয়া হবে। একটি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে, যেখানে ২৯৫টি ওষুধ রয়েছে। উপদেষ্টা পরিষদের সভায় আরও দু একটি ওষুধ অন্তর্ভুক্তির অনুরোধ এসেছে। সেগুলো যুক্ত হলে তালিকায় ওষুধের সংখ্যা ২৯৫ বা ২৯৬ হতে পারে। এবারের তালিকায় নতুন করে ১৩৫ বা ১৩৬টি ওষুধ যুক্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, তালিকাভুক্ত সব ওষুধ সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে হবে। এটি এই সিদ্ধান্তের মূল বিষয়। দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, যেসব ওষুধ বর্তমানে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশিতে বিক্রি হচ্ছে, তাদের পর্যায়ক্রমে সেই দামে নেমে আসতে হবে। আর যেসব ওষুধ কম দামে রয়েছে, তারা চাইলে ওই নির্ধারিত দামের মধ্যে থাকতে পারবে অথবা সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত মূল্য সমন্বয় করতে পারবে। 

অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, প্রতিবছর ধাপে ধাপে দাম সমন্বয় করে চার বছরের মধ্যে সরকারের নির্ধারিত দামে আসতে হবে। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ এমন, যা সংজ্ঞাগতভাবে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের অধিকাংশ রোগের চিকিৎসার জন্য যথেষ্ট। ফলে এসব ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ সরাসরি দেশের ৮০ শতাংশ মানুষের চিকিৎসা ও ওষুধ প্রাপ্যতায় বড় প্রভাব ফেলবে। অত্যাবশ্যকীয় তালিকার বাইরে থাকা প্রায় এক হাজার ১০০ জেনেরিক ওষুধের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দাম না বেঁধে একটি দামের পরিসর নির্ধারণ করা হবে। এসব ওষুধ সরকারের নির্ধারিত মূল্যের ১৫ শতাংশ কম বা বেশি দামে বিক্রি করা যাবে। 

তিনি বলেন, যেসব ওষুধ সাতটির বেশি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন করে, সেগুলোর বাজারে প্রচলিত বিক্রয়মূল্যের গড় ধরে দাম নির্ধারণ করা হবে। যেমন– কোনো ওষুধ ১০ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হলে তার মূল্য নির্ধারণ করা হবে ১৫ টাকা এবং এর সঙ্গে ১৫ শতাংশ যোগ-বিয়োগের সুযোগ থাকবে। আর যেসব ওষুধের উৎপাদক সাতটির কম, সে ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় নিয়ে মূল্যসীমা নির্ধারণ করা হবে। সায়েদুর রহমান জানান, মূল্য নির্ধারণ-সংক্রান্ত নীতিমালারও অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। শিগগিরই নীতিমালাটি প্রকাশ করা হবে। এটি কার্যকর হলে কোনো ওষুধই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকবে না। নতুন উৎপাদনে আসা ওষুধের ক্ষেত্রেও এই নীতিমালা প্রযোজ্য হবে। 
নীতিমালায় দেশীয় এপিআই (ওষুধের কাঁচামাল) উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এর আওতায় আমদানিকারকদের এপিআই আমদানির আগে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ) বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র নিতে হবে। এই অনাপত্তিপত্র পেতে আমদানিকারককে দাপ্তরিক যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে, দেশে সংশ্লিষ্ট এপিআই উৎপাদিত হয় না বা পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই, অথবা দেশীয়ভাবে উৎপাদিত এপিআইয়ের মূল্য আন্তর্জাতিক রেফারেন্স মূল্যের (ইআরপি) চেয়ে ২০ শতাংশের বেশি। আবেদন পাওয়ার সাত কার্যদিবসের মধ্যে ডিজিডিএ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনাপত্তিপত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। নতুন ওষুধ, প্যাটেন্টযুক্ত ওষুধ এবং বায়োলজিক্যাল ওষুধের জন্য আলাদা ক্যাটেগরি ও আলাদা ফর্মুলা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে দ্রুত বিকাশমান বায়োলজিক্যাল ওষুধ খাতে গবেষণা ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে অতিরিক্ত সুবিধা রাখা হয়েছে।

এদিকে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম নির্ধারণে গত ২৪ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১৮ সদস্যের একটি টাস্কফোর্স গঠন করে। এতে প্রধান করা হয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলমকে। এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে দেরি হয়। ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে তালিকা চূড়ান্ত করেছে সরকার। 

জানা যায়, ২০১৬ সালে অ্যান্টিবায়োটিক, নিউমোনিয়া, সর্দি-জ্বর, উচ্চ রক্তচাপ, গ্যাস্ট্রিক আলসার, কৃমিনাশক, ব্যথানাশক, হাঁপানি, ভিটামিনসহ ২৮৬টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা করা হয়। তখন মাত্র ১১৭টি ওষুধের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল। যদিও প্রতিবছর তালিকা হালনাগাদের কথা থাকলেও গত ৯ বছরে কার্যকর তদারকি ছিল না। 

সায়েদুর রহমান বলেন, গত ১৪ মাসে একটি টাস্কফোর্সের মাধ্যমে উৎপাদক, বিপণনকারী, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, ওষুধ বিজ্ঞানী, আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে। সবার সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতেই এই নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

এর আগে ১৯৮২ সালের ওষুধ নীতিতেও ২৮৬টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিবছর তালিকা হালনাগাদের কথা থাকলেও ২০০৮ ও ২০১৬ সালে মাত্র দুইবার তা হালনাগাদ করা হয়। ফলে অত্যাবশ্যকীয় তালিকার সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে সাধারণ মানুষ। জীবন রক্ষাকারী ২৮৬টি ওষুধের মধ্যে মাত্র ১১৭টির দাম সরকার নির্ধারণ করতে পেরেছিল। বাকি ওষুধগুলোর দাম নির্ধারণ করেছে প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছামতো দর বাড়ানো হয়েছে, এতে রোগীর চিকিৎসা খরচ বেড়েছে।

আরও পড়ুন

×