ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জকসু নির্বাচন

শিবিরের বড় জয়ের পেছনে শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচি

গ্রুপিংয়ে পিছিয়ে পড়ল ছাত্রদল

শিবিরের বড় জয়ের পেছনে শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচি
×

শিবিরসমর্থিত প্যানেলের জিএস আব্দুল আলিম আরিফ, ভিপি রিয়াজুল ইসলাম (মাঝে) ও এজিএস মাসুদ রানা (বামে)। ছবি: সমকাল

 লতিফুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:২০ | আপডেট: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ | ১০:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনের পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদেও (জকসু) বড় জয় পেয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির। অন্যগুলোতে ছাত্রদলের ভরাডুবি হলেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনে চারটি পদে জয় পেয়েছে তারা। গণঅভ্যুত্থানের পরে গড়ে ওঠা জাতীয় ছাত্রশক্তি এখানেও ভালো করতে পারেনি। বাম সংগঠনগুলোও ভালো করেনি। শিক্ষার্থী ও বিশ্লেষকরা বলছেন, ছাত্রদলের প্রার্থী নির্ধারণে শুরু থেকেই গ্রুপিং থাকায় তারা পিছিয়ে পড়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে বছরজুড়ে ছাত্রশিবির কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এসব কারণেই রায় তাদের পক্ষে গেছে। 

জকসুতে ২১টি পদের মধ্যে ভিপি, জিএস, এজিএসসহ ১৬টি পদে জয় পেয়েছে শিবির সমর্থিত প্যানেল। ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল চারটি পদে ও একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী জয় পেয়েছেন। 

শুরু থেকে গ্রুপিং ছাত্রদলে
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৭ সালে ছাত্রলীগ (বর্তমানে নিষিদ্ধ) এবং ছাত্রদলের সঙ্গে সংঘর্ষের পর ক্যাম্পাস ছাড়ে ছাত্রশিবির। এরপর থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি তারা। সরকার পতনের পর ক্যাম্পাসে এ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের নিয়ে ২২ ধরনের কর্মসূচি পালন করেছে। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়া, কমনরুমসহ বিভিন্ন বিভাগে বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার স্থাপন, ছাত্রী হলে ওয়াশিং মেশিন বিতরণ, শিক্ষার্থীদের মনোসামাজিক স্বাস্থ্যসেবা, কোরবানির ঈদ উপলক্ষে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন, ভর্তি পরীক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের সহায়তা, নবীনবরণ, মেধাবী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনার আয়োজন করে। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় সংগঠনটি।

অপরদিকে ছাত্রদল অন্য অনেক ইউনিটের তুলনায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শক্তিশালী হলেও জুলাই আন্দোলনের পর থেকেই গ্রুপিং চলছে। কমিটি ঘোষণার পর বর্তমান কমিটির নেতারা ৪৫ দিন ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেননি। বর্ধিত কমিটিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ সাবেক পাঠাগার সম্পাদক আতিক সিয়ামসহ ত্যাগীদের মূল্যায়ন না করায় কয়েকবার বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন অন্যরা। 

জকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেলের বাইরে ‘অদম্য জবিয়ান’ ও ‘তরুণ শিক্ষার্থী ঐক্য’ নামে দুটি প্যানেল ঘোষণা করে সংগঠনের বিদ্রোহীরা। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলামসহ অনেকেই সে সময় ছাত্রদলের প্যানেল ও জোটের প্রার্থীদের সমালোচনা করে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দেন। কেন্দ্রের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহীদের সবাই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। তবে এজিএস পদে প্রার্থী হওয়া শাখা ছাত্রদলের সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক তামজিদ ইমাম অর্ণবকে বসাতে কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে ছাত্রদলসহ বিএনপির সিনিয়র নেতাদের। গত ২৯ নভেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক পদ পাওয়ার পর ছাত্রদলের প্যানেলকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান এই নেতা। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা সমকালকে বলেন, গ্রুপিংয়ের কারণে সংগঠনের নেতাকর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রার্থী করানো যায়নি। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জনপ্রিয়, জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়ক আবু বক্কর খানসহ কয়েকজনকে ভিপি, জিএসসহ বিভিন্ন পদে প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হলেও আহ্বায়ক কমিটির সুপার ফাইভখ্যাত নেতাদের বিরোধিতার কারণে শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ সংগঠনের অনেকের। শাখা ছাত্রদলের সাবেক নেতা ও কেন্দ্রীয় সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খন্দকার আশরাফ আল মামুন সমকালকে বলেন, ‘এখানে প্রথম পরাজয়টা হয়েছে প্যানেল গঠনে। ভিপি প্রার্থী জুলাইযোদ্ধা, ক্যাম্পাসে তিনি জনপ্রিয় হলেও জিএস প্রার্থীর একমাত্র দীর্ঘদিন জেলখাটা ছাড়া ক্যাম্পাসের কোনো কর্মসূচিতেই তাঁর কখনও অবস্থান ও অর্জন নেই। আবার প্রার্থী ঘোষণার পরও তাঁর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আচরণ ও সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট প্রার্থীসুলভ ছিল না। এতেই শিবিরের মতো শক্ত প্রতিদন্দ্বীর কাছে পরাজয় হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘সম্পাদকীয় পদে জিতে আসা রিয়াসাল রাকিব ও অন্যরা ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকায় তারা ছাত্রশিবিরের প্রার্থীদের চেয়ে দ্বিগুণ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন।’

রাজনীতি বিশ্লেষক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেজবাহ-উল-আজম সওদাগর বলেন, ‘জুলাই বিপ্লব ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। বাম সংগঠনগুলোর রাজনীতির ব্যাখ্যা সেকেলে এবং বয়ান ছাত্রলীগের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়– যা ছাত্ররা পছন্দ করে না। ছাত্রশক্তির সাংগঠনিক সক্ষমতা নেই। আর ছাত্রদলের মধ্যে ছাত্রলীগের আচার-আচরণ ও বয়ান যখন ছাত্ররা দেখে, তখন তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়– এই বাস্তবতাই এ ফলাফল এনে দিচ্ছে।’

আরও পড়ুন

×