ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বন্দিদের ৪৬% তিন ধরনের অপরাধে

বন্দিদের ৪৬% তিন ধরনের অপরাধে
×

 সাহাদাত হোসেন পরশ

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৯:১২ | আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ২০:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের ৭৫টি কারাগারে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্দি রয়েছেন ৮৪ হাজার ৪০০ জন। তাদের মধ্যে হাজতি ৬৩ হাজার ৪৭৮ ও কয়েদি ২১ হাজার দুজন।  কারাগারে বন্দির ধারণক্ষমতা রয়েছে ৪৬ হাজার। ফলে বর্তমানে ৩৮ হাজার ৪০০ জন বন্দি কারাগারে বেশি রয়েছেন। 

কারাগার থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বন্দিদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট তিনটি অপরাধের আসামি ৪৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কারাগারে রয়েছেন ২০ হাজার ৯৪২ জন। এটি মোট বন্দির এক-চতুর্থাংশ। নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ৯ হাজার ১০০ এবং বিশেষ ক্ষমতা আইনে আট হাজার ৬০০ জন। এ হিসাবে এই তিন অপরাধে বন্দি ৩৮ হাজার ৬৪২ জন। 

কারাগারে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক সংকট চলছে। একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, এই কারণে বন্দিদের সময়মতো সুচিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। বর্তমানে স্থায়ী চিকিৎসক মাত্র দুজন। 
তাদের একজন মানিকগঞ্জ জেলা কারাগার ও অন্যজন রাজশাহীর ট্রেনিং সেন্টারে রয়েছেন। স্থায়ী চিকিৎসক না থাকায় জেলার সিভিল সার্জনের দপ্তর থেকে কারা হাসপাতালে অস্থায়ী ভিত্তিতে চিকিৎসক পাঠানো হয়। ৭৫ কারা হাসপাতালে এ সংখ্যা ১০৩ জন। 

কারা কর্মকর্তারা বলছেন, অস্থায়ী চিকিৎসকরা সকালে এসে দুপুরের পর অথবা বিকেলে চলে যান। তাই রাতে কোনো বন্দি অসুস্থ হলে তাদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। কারাবন্দিদের অনেকে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত থাকেন। বিভিন্ন রোগে কারাগারে ২০২১ সালে ২০৫ জন, ২০২২ সালে ১৩২ জন, ২০২৩ সালে ২২৭ জন এবং ২০২৪ সালে ১৭৯ জন মারা গেছেন। 
সম্প্রতি আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে কারা হেফাজতে মারা গেছেন ১০৭ জন এবং ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৫। কারা অধিদপ্তরের হিসাবে বছরে গড়ে ২০০ বন্দির মৃত্যুর হয়। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশের কারাগারে এক হাজার ৪১০ বন্দি মারা গেছেন। 

কারাগারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বন্দিদের মধ্যে অপহরণ মামলার আসামি পাঁচ হাজার ১২৬ জন, বিস্ফোরক মামলায় ছয় হাজার ৪৩৮, নাশকতায় দুই হাজার ৩৪, চুরির মামলায় পাঁচ হাজার ৮০০; ১৪৪ ধারা ভঙ্গ, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ট্রাফিক আইনে তিন হাজার ৪৫০ জন। এ ছাড়া অন্য অপরাধের ধারায় বন্দি আছেন ১০ হাজার ৮০০ জন। 
দেশের সব কারাগারে মানসিক রোগী আছেন ৬০০ জন। তবে কোনো মানসিক চিকিৎসক নেই। নিয়মানুযায়ী প্রতিটি কারাগারে একজন মানসিক চিকিৎসক থাকার কথা। নারী বন্দিদের জন্য নেই কোনো গাইনি চিকিৎসক। 

কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন সমকালকে বলেন, কারাগারের চিকিৎসক সংকট দূর করতে একের পর এক বৈঠক করে যাচ্ছি। তবে এখনও সুরাহা হয়নি। কারাগারের জন্য মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ খুব জরুরি। 

বর্তমানে ৪১৮ জন বিদেশি নাগরিক কারাগারে বন্দি আছেন। মাদক চোরাচালান, অবৈধ উপায়ে স্বর্ণ পাচার, প্রতারণা, জাল ডলার ব্যবসা, পাসপোর্ট জটিলতা, অবৈধ ভিওআইপির ব্যবসা ও মানব পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন তারা। তাদের অনেকের বৈধ কাগজ নেই। তারা নিজের দেশের নাম বললেও সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস তাদের নাগরিক হিসেবে মানতে নারাজ। বন্দিদের পরিচয় সম্পর্কে জানতে চেয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসে চিঠি দিয়ে যোগাযোগ করা হলেও সময়মতো উত্তর পায় না মন্ত্রণালয়। এতে সরকারের বাড়তি টাকাও ব্যয় হয়। পাশাপাশি এসব বন্দি বেশির ভাগ সময়ই উগ্র আচরণ করেন। বিশেষ করে আফ্রিকা অঞ্চলের নাগরিকদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ বেশি। এ কারণে তাদের সামলাতেও বাড়তি কারারক্ষী মোতায়েন করতে হয়।
সব কারাগারে নারী বন্দি দুই হাজার ৯০০ জন। এ ছাড়া ২৭০ শিশু তাদের মায়ের সঙ্গে কারাগারে রয়েছে। তাদের শৈশব কারাগারে চার দেয়ালে বন্দি। সাধারণত ছয় বছরের কম বয়সী শিশুরা মায়েদের সঙ্গেই কারাগারের সেলে অবস্থান করে। মায়ের সঙ্গে কারাগারে যাওয়ার পরপরই সংশ্লিষ্ট শিশুর নাম ও বয়স রেজিস্টারে নথিভুক্ত করা হয়। 
কারা অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, গণঅভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় করা মামলায় সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আমলা, পুলিশসহ ১৯০ জন বর্তমানে কারাগারে আছেন। তারা ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দি হিসেবে পরিচিত। 

সহকারী কারা মহাপরিদর্শক মো. জান্নাত-উল ফরহাদ সমকালকে বলেন, বন্দিদের হাসপাতালে আনা-নেওয়ার জন্য আমাদের অ্যাম্বুলেন্স সংকট রয়েছে। বর্তমানে ২৭টি অ্যাম্বুলেন্স আছে। জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য অনেক বন্দিকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হয়। কারাগারের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসক অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকলে বন্দিরা ভালো সেবা পেত। তিনি বলেন, বন্দিদের জন্য মাথাপিছু সরকারের একটা বরাদ্দ থাকে। বর্তমানে যে সংখ্যক বন্দি রয়েছেন, তাদের ব্যবস্থাপনায় আমাদের তেমন কোনো সংকট হচ্ছে না।  

আরও পড়ুন

×