হিমাগারে পচল ৫৭ হাজার বস্তা আলু
শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
শেরপুর শহরের নৌহাটা এলাকায় বিসিক শিল্প নগরীতে অবস্থিত বেসরকারি হিমাগার তাজ কোল্ড স্টোরেজে রাখা ৫৭ হাজার বস্তা (তিন হাজার ১০০ টনের বেশি) আলু পচে ও পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে।
গতকাল সোমবার কোল্ড স্টোরেজ পরিদর্শন শেষে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। হিমাগার কর্তৃপক্ষ জানায়, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অ্যামোনিয়া গ্যাস লিকেজ হয়ে এ ঘটনা ঘটেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে বসে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে হিমাগারে রাখা আলু নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে আসন্ন শীত মৌসুমে জেলায় আলুবীজ সংকেট চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কৃষকরা।
জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় পাঁচ হাজার ৪৫ হেক্টর জমিতে এক লাখ ৯০০ টন আলু উৎপাদন হয়। আলু মৌসুমের শুরুতে ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং পরবর্তী সময়ে অধিক লাভের আশায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জেলার একমাত্র বেসরকারি হিমাগার তাজ কোল্ড স্টোরেজে আলু সংরক্ষণ করেন। হিমাগার কর্তৃপক্ষ আলু বাছাই করে চটের বস্তায় ভরে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এবং নির্দিষ্ট আর্দ্রতায় সেগুলো সংরক্ষণ করে।
কৃষিপ্রধান এ জেলায় সরকারি হিমাগার রয়েছে মাত্র দুটি। একটি জেলা শহরের শেরীব্রিজ এলাকায়। অন্যটি নকলা উপজেলার পাঠাকাটা ইউনিয়নে। এ দুই হিমাগারে শুধু বীজ আলু সংরক্ষণ করা হয়। ধারণক্ষমতা মাত্র তিন হাজার টন। এ জন্য জেলার কৃষকদের তাজ হিমাগারের ওপরই ভরসা করতে হয়। সেখানে এক লাখ ৭৩ হাজার বস্তা বা ১০ হাজার টন আলু রাখা যায়।
কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জানায়, চলতি বছর তারা এক বস্তা আলু রাখার জন্য হিমাগারকে ৩৬০ টাকা খরচ দিয়েছেন। আগামী নভেম্বর পর্যন্তে এই আলু হিমাগারে থাকার কথা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ জুলাই হিমাগারে রেফ্রিজারেশন ইউনিটের পাইপ ফেটে যায়। এ সময় বিষাক্ত অ্যামোনিয়া গ্যাস লিক হতে থাকে। হিমাগারের ফোরম্যান আব্দুল মান্নান ও তাঁর সহকারীরা চেষ্টা করেও লিক সারতে পারেননি। এক পর্যায়ে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হলে তারা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আানে। তবে এ সময়ে ছড়িয়ে পড়া গ্যাসের কারণে হিমাগারের তিনটি চেম্বারের মধ্যে দুই নম্বর চেম্বারে থাকা প্রায় ৫৭ হাজার বস্তা বীজ ও খাওয়ার আলু পচে নষ্ট হয়ে যায়।
বিষয়টি প্রথমে গোপন থাকলেও কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জানতে পেরে গত রোববার হিমাগারে এসে আলু পচে যাওয়া খবরের সত্যতা নিশ্চিত হন। পরে দিশেহারা কৃষকরা বিক্ষোভ শুরু করেন।
সদর উপজেলার হেরুয়া গ্রামের প্রান্তিক কৃষক সুলতান মিয়া বলেন, তাঁর সংরক্ষণ করা ৫১ বস্তা বীজ আলু পচে গেছে। লতারিয়া গ্রামের দেলোয়ার, আনোয়ার, ও সালাম জানান, তাদের রাখা সব আলু পুড়ে ও পচে নষ্ট হয়ে গেছে। লাখ টাকার ক্ষতির দাবি করেছেন ব্যবসায়ী আব্দুল গণি। তিনি বলেন, হিমাগারে তাঁর এক হাজার ৬৪০ বস্তা দেশি আলু ছিল। সব নষ্ট হয়ে গেছে।
তাজ কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, আগামী বৃহস্পতিবার কৃষক ও মজুতদারদের সঙ্গে বসে আলোচনা করে একটি সম্মানজনক সমাধান করার জন্য কর্তৃপক্ষ
উদ্যোগ নিয়েছে।
জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ পচা আলুর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠিয়েছে। তারা এসব নষ্ট আলু জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি মনে করছেন। এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা বিনতে রফিক বলেন, তিনি জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখতে পান তিনটি ইউনিটের মধ্যে দুই নম্বর ইউনিটে অ্যামোনিয়া গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে আলু নষ্ট হয়ে গেছে। বিষয়টি তিনি জেলা প্রশাসককে জানিয়েছেন।
শেরপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বাজার পরিদর্শক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, বর্তমানে আলুর পাইকারি বাজার দর কেজিপ্রতি ১৮ টাকা। সেই হিসেবে নষ্ট আলুর মূল্য পাঁচ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। তবে খুচরা বাজারে আলুর দাম আরও বেশি হবে। খুচরা বাজারে ২৩ টাকা কেজি দরে দাম ধরলে ক্ষতির পরিমাণ হবে সাত কোটি ১৩ লাখ টাকা।
শেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, গতকাল সোমবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে প্রায় ৫৭ হাজার বস্তা আলু পচে নষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, হিমাগারটি সরকারি নয়, ব্যক্তি মালিকানাধীন। তাই জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সমন্বয় করে কৃষকরা যাতে ক্ষতিপূরণ পান তার চেষ্টা করছি।
জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াছমিন বলেন, আলুচাষিরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর জন্য হিমাগার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে।
- বিষয় :
- আলু