ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

শেখ হাসিনাসহ জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি

গুমের মামলায় হুম্মামের জবানবন্দি

শেখ হাসিনাসহ জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি
×

হুম্মাম কাদের চৌধুরী

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) গুম করে রাখার ঘটনায় করা এক মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন আসন্ন সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী হুম্মাম কাদের চৌধুরী। গুম-নির্যাতন ও অপহরণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য শেখ হাসিনাসহ জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন তিনি। 

বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১-এ গতকাল এই প্রথম সাক্ষী দেন হুম্মাম। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। তাঁর বাবা প্রয়াত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১৬ সালে তাঁর ফাঁসি কার্যকর হয়। 
সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলাটির বিচার শুরু হলো। সূচনা বক্তব্যের পর হুম্মামের সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ট্রাইব্যুনালে এই মামলায় তাঁকে আসামি পক্ষে জেরার জন্য ২৫ জানুয়ারি দিন ধার্য করেন।

জবানবন্দিতে হুম্মাম বলেন, ‘২০১৬ সালের ৪ আগস্ট আমাকে রাজধানীর বংশাল থেকে গুম করা হয়। ওই দিন একটি মামলার হাজিরা দিতে সকালে ধানমন্ডির বাসা থেকে ঢাকা সিএমএম আদালতে যাওয়ার পথে বংশাল ট্রাফিক সিগন্যাল এলাকায় সাত-আটজন সাদা পোশাকের ব্যক্তি আমার বহনকারী গাড়িটি ঘেরাও করে। পরে তারা আমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে বংশাল থানার ওসির কক্ষে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আরেকটি মাইক্রোবাসে উঠিয়ে মিন্টো রোডের ডিবি অফিসে আনা হয়। সেখান থেকে রাত ১১টার দিকে ভাঙা একটি মাইক্রোবাসে করে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পুরোনা একটি বাড়ির ছোট কক্ষে রাখা হয়। এখানে আসার পথে আমাকে বহন করা গাড়ির সামনে বসা লোকটি হঠাৎ করে কাঁদছিলেন। ওই সময় লোকটি ক্ষমা চান। আমি মনে করেছিলাম, ক্রসফায়ারে আমাকে হত্যা করা হবে। গাড়ির ভেতরে ব্লাইন্ডফোল্ড পরানো হয়। গাড়ি থেকে নামানোর আগে আমাকে জমটুপি ও হ্যান্ডকাফ পরানো হয়। এরপর অন্য এক গ্রুপের কাছে হস্তান্তর করা হয়।’

হুম্মাম কাদের বলেন, ‘পুরোনো একটি বাড়িতে ঢোকানোর পর আমি অনুভব করি নাক ও মুখে কেমিক্যাল দেওয়া হয়েছে। এরপর আমাকে একটি টুলের ওপর বসিয়ে মেডিকেল টেস্ট করা হয় এবং ব্লাডপ্রেসার মাপার পর দুই হাত পেছনে বেধে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়। প্রথমে পরিবার ও তার বাবার রাজনৈতিক বিষয় জানতে চাওয়া হয়। এ ছাড়া জানতে চাওয়া হয়, আমি ভারত, পাকিস্তান ও আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই, ‘র’ এবং সিআইএর সঙ্গে যোগাযোগ করি কিনা। বিষয়টি অস্বীকার করলে মারধর করা হয়। মাথার পেছনে লাঠি দিয়ে আঘাত করে ফেলে দেওয়া হয়। বসার টুল থেকে পড়ে গেলে আবার বসিয়ে দেওয়া হয়। পরে আরেকটি সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমাকে ওই রুমের দেয়ালে ধাক্কা দিয়ে দড়ি পরিয়ে পরনের কাপড় খুলতে বাধ্য করা হয় এবং উলঙ্গ ছবি তোলা হয়। এভাবেই আমাকে সেখানে সাত মাস নির্য়াতন করা হয়।’    

তিনি বলেন, গুম থাকাকালে মাঝেমধ্যে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁকে মারধর করা হতো। তাঁর বাবার রাজনীতির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো। আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করেন কিনা, এসব বিষয়ে তাঁকে বারবার জিজ্ঞাসা করা হতো। 
এই মামলার আসামি ১৩ জন। এর মধ্যে ১২ জনই বর্তমান-সাবেক সেনা কর্মকর্তা। আসামিদের মধ্যে গ্রেপ্তার তিনজন হলেন– ডিজিএফআইয়ের সাবেক তিন পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। গতকাল তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। বাকি ১০ আসামি পলাতক। শেখ হাসিনা ও তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এই মামলার আসামি। হাসিনা ও সেনা কর্মকর্তাসহ এই মামলায় ১৩ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ১৮ ডিসেম্বর বিচার শুরুর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। 
 

আরও পড়ুন

×