ফাঁসির দণ্ড পাওয়া আযাদের আত্মসমর্পণ
কারাগারে যেতে হচ্ছে না তাঁকে
মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া ফরিদপুরের আবুল কালাম আযাদ গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন শাখায় হাজির হয়ে আত্মসমর্পণের আবেদন করেন -সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৩৮ | আপডেট: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
সর্বোচ্চ আদালতে আপিলের অনুমতি পেয়েছেন একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মাওলানা আবুল কালাম আযাদ। এর আগে রাষ্ট্রপতির আদেশে তাঁর সাজা স্থগিত করা হয়। গত বছরের ২২ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করলেও গতকাল বুধবার তা জানাজানি হয়।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল বুধবার এ আদেশ দেন। অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
সাজার ১৩ বছর পর গতকাল ট্রাইব্যুনালে সশরীরে হাজির হয়ে আত্মসমর্পণের আবেদন করেন আবুল কালাম আযাদ। সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার জন্য রায়ের সত্যায়িত অনুলিপিসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র চেয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে আবেদন করেন তিনি।
ট্রাইব্যুনালে আযাদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মশিউল আলম। ট্রাইব্যুনালকে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে আযাদের মৃত্যুদণ্ডের সাজা এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়। এ নিয়ে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আমরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করতে ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে দেওয়া তাঁর রায়ের সত্যায়িত অনুলিপিসহ এ মামলার প্রয়োজনীয় সব ধরনের কাগজপত্র পেতে আবেদন করছি।
পরে মশিউল আলম সাংবাদিকদের জানান, ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আবুল কালাম আযাদকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। সে সময় তিনি দেশে ছিলেন না। গত বছর দেশে ফিরে রাষ্ট্রপতির কাছে সাজা স্থগিতের আবেদন করেন। আত্মসমর্পণ করে আপিল করার শর্তে রাষ্ট্রপতি তাঁর সাজা এক বছরের জন্য স্থগিত করেছেন; যা ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
গতকাল সকালে আযাদ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন শাখায় হাজির হয়ে আত্মসমর্পণের আবেদন করে বেরিয়ে যান। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তাঁর উপস্থিতিতে শুনানির পর ট্রাইব্যুনাল আবেদন গ্রহণ করেন এবং আপিলের জন্য তাঁর রায়-সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্র দিতে সম্মত হন। একই সঙ্গে তিনি ‘যেমন আছেন, তেমন থাকার’ আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। ফলে আপাতত তাঁকে কারাগারে যেতে হচ্ছে না। এ সময় প্রসিকিউশনের পক্ষে গাজী এমএইচ তামিমসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের ও গণহত্যার দায়ে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রোকন পলাতক আবুল কালাম আযাদকে ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-২। স্বাধীনতার ৪১ বছর পরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এটি ছিল প্রথম রায়।
ফরিদপুরের সালথা (সাবেক নগরকান্দা) উপজেলার বড় খাড়দিয়া গ্রামের বাসিন্দা মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু মিয়া নামে খ্যাত বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে ইসলামবিষয়ক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর বিরুদ্ধে একাত্তরে ফরিদপুর অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচার শুরু হয় ২০১১ সালে। এরপরই তিনি ভারত হয়ে পাকিস্তানে পালিয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের আটটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে তাঁর অনুপস্থিতিতে ট্রাইব্যুনালের রায়ে সাতটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। ট্রাইব্যুনালের আইন অনুযায়ী রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হয়।
মামলায় অভিযোগ
মুক্তিযুদ্ধের সময় ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র আবুল কালাম আযাদ ছাত্রসংঘের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২৫ মার্চের কালরাত্রির পর তিনি সহযোগীদের নিয়ে ফরিদপুরের বিভিন্ন স্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটান। এ কারণে ফরিদপুর এলাকায় তিনি পরিচিতি পান বাচ্চু রাজাকার নামে।
একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতায় আযাদের নেতৃত্বেই ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের বড় খাড়দিয়া গ্রামে ‘খাড়দিয়ার মেলিটারি’ বাহিনী গঠিত হয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর এই বাহিনী মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে খাড়দিয়ার আশপাশের প্রায় ৫০টি গ্রামে ব্যাপক তাণ্ডবলীলা চালায়। অনেক মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন ‘বাচ্চু রাজাকার’ ও তাঁর বাহিনী। তাদের হাতে ধর্ষিত হন নগরকান্দা উপজেলার দাদপুর ইউনিয়নের নতিবদিয়া গ্রামের দুই নারী।
- বিষয় :
- ফাঁসির আদেশ
- আত্মসমর্পণ
