ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

একনেক বৈঠক

রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় বাড়ল সাড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা

রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় বাড়ল সাড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা
×

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে গতকাল পরিকল্পনা কমিশন চত্বরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা হয়। ছবি: পিআইডি

সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০১

দেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় আরও ২৫ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা বাড়ল। নির্মাণকালও বাড়ানো হয়েছে আড়াই বছরের মতো। গতকাল রোববার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে এই বর্ধিত ব্যয় ও সময় অনুমোদন করা হয়। এই অনুমোদনের পর প্রকল্পটির মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে এক লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। 

এই প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয়সহ মোট ২৫টি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে একনেক বৈঠকে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ১৯১ কোটি টাকা। ব্যয়ের ১০ হাজার ৮৮১ কোটা টাকা সরকারের নিজস্ব জোগান। ৩২ হাজার কোটি টাকা বিদেশি ঋণ ও দুই হাজার ১৯২ কোটি টাকা বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর নিজস্ব। 

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন। 

পরিকল্পনা উপদেষ্টা জানান, এটিই ছিল বর্তমান সরকারের সর্বশেষ একনেক বৈঠক। তবে প্রয়োজনে আরও একনেক বৈঠক হতে পারে। এ বিষয়ে আইনগত কোনো বাধা নেই। উদাহরণ হিসেবে তিনি ১৯৯৬ সালের কথা বলেন। ওই বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ সময় পর্যন্ত একনেক বৈঠক হয়েছে।

বর্তমান সরকার রাজনৈতিক সরকার না হলেও এক একনেক বৈঠকে এত বেশি প্রকল্প উপস্থাপন ও অনুমোদনের কারণ জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, একনেকের নির্ধারিত গত দুটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। এ কারণে এবারের বৈঠকে প্রকল্প সংখ্যা এত বেশি হয়েছে। 

পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, আগামী জুন বা ডিসেম্বরের মধ্যে যেসব প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা, নির্ধারিত সময়ে ওই সব প্রকল্প শেষ করতে না পারলে অর্থছাড় বন্ধ করে দেওয়া হবে। এ বিষয়ে নির্দেশনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সব প্রকল্প এখন থেকে প্রতি ছয় মাসের পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। 

প্রকল্পে অপচয় প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, তারা যাচাই করে দেখেছেন, অনেক প্রকল্পেরই ব্যয় কমানো সম্ভব। প্রকল্পে অপচয় হয়। অনেক প্রকল্প একসঙ্গে চলতে থাকায় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায় না। এ ছাড়া এক প্রকল্প পরিচালকের অধীনে একাধিক প্রকল্প থাকায় বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়। তিনি বলেন,  বর্তমান সরকারের প্রচেষ্টা ছিল প্রকল্প কমানোর, কিন্তু এই কাজে তারা সফল হননি। 

উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে আগামী সরকারকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) প্রকল্প প্রস্তাব সুন্দর করে সাজিয়ে দেয়। তবে সরকারকে যাচাই-বাছাই করে দেখা উচিত কোন ধরনের প্রকল্পে বিদেশি ঋণ নেওয়া যায়। ঋণের দুষ্টচক্রে আবদ্ধ হওয়ার কোনো দরকার নেই। আগামী সরকারের জন্য এই পরামর্শ রেখে যাচ্ছেন তারা। 

উপদেষ্টা বলেন, বিদেশি ঋণ নিয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অনুৎপাদনশীল খাতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উচিত নয়। অতীতে এ ধরনের প্রকল্প করা হয়েছে বিদেশি ঋণ নিয়ে। এ ধরনের ঋণে বিনিয়োগ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়ক বড় প্রকল্পে নেওয়া যেতে পারে। 

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে এত বেশি ব্যয় এবং সময় বাড়ানো-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান কমে আসার কারণে ব্যয় এতটা বেশি বেড়েছে। টাকায় বাড়লেও ডলারে ব্যয় বাড়েনি। গত ডিসেম্বরে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে রাশিয়ার ঋণ পরিশোধে জটিলতার কারণে সময় দুই বছর বাড়াতে হয়েছে। ইতোমধ্যে রাশিয়ার ঋণ পরিশোধ শুরু করেছে বাংলাদেশ। 

এ সময় পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের সদস্য এস এম শাকিল আখতার বলেন, রাশিয়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে ১১ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিচ্ছে। ২০১৫ সালে যখন এই ঋণচুক্তি হয়, তখন প্রতি ডলারের দাম ছিল ৮০ টাকা। এখন ডলারের দাম বেড়ে ১২২ টাকা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ডলারের দাম বেড়েছে ৪২ টাকা। 

গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, পদ্মা ব্যারাজ একটি ভালো প্রকল্প। তবে এটি একটি টেকনিক্যাল বড় প্রকল্প। এ কারণে প্রকল্পটির আরও যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রকল্প যে সময়ে করা প্রয়োজন, সেই প্রকল্প সে  সময়ে করা উচিত। একটা বড় প্রকল্প করতে গেলে অর্থায়ন কোত্থেকে হবে, সে বিষয়ে ভাবতে হবে। এ প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ৫০ হাজার কোটি টাকা। ব্যারাজ করতে গেলে একটি কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন হবে। বড় সেতু করার জন্য যেমন সেতু বিভাগ আছে। 

এ বিষয়ে পরিকল্পনা সচিব পরে গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, প্রকল্পটি একেবারে শেষ সময়ে এসেছে। ভালো করে প্রকল্পটি পরখ করা হয়নি। বড় প্রকল্প হিসেবে প্রকল্পটির বিষয়ে ভূরাজনৈতিক কোনো চাপ আছে কিনা– এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো ধরনের চাপ নেই। 

এদিকে গতকাল একনেকে অনুমোদন হওয়া বড় প্রকল্পের মধ্যে আরেকটি হচ্ছে চীনের সহায়তায় পঞ্চগড়ে এক হাজার শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প। মোট দুই হাজার ৪৬০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পে দুই হাজার ২৮০ কোটি টাকাই ঋণ হিসেবে দেবে চীন সরকার। প্রকল্পটির কাজ আগামী ২০২৯ সালের মধ্যে শেষ হবে। এ বিষয়ে পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, ঢাকাকেন্দ্রিক চাপ কমানোর জন্যই প্রকল্পটি বাংলাদেশের সীমান্ত জেলায় নির্মাণ করা হচ্ছে। আধুনিক চিকিৎসাসেবার এই হাসপাতালটিতে প্রতিবেশী দেশের রোগীরাও চিকিৎসা নিতে পারবেন। 

অনুমোদন হওয়া অন্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে– চট্টগ্রাম শহরের লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের নিকটে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ, স্বাস্থ্য এবং পুষ্টি সেবা উন্নতকরণ, দেশের বিভিন্ন স্থানে ফাঁড়ি, তদন্ত কেন্দ্র, ক্যাম্প, নৌ পুলিশ কেন্দ্র, রেলওয়ে পুলিশ থানা ও আউটপোস্ট, ট্যুরিস্ট পুলিশ সেন্টার ও হাইওয়ে পুলিশের জন্য থানা ও আউটপোস্ট নির্মাণ প্রকল্প ইত্যাদি।

আরও পড়ুন

×