প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন
ক্যান্সার হাসপাতালে ৪১% রোগী হয়রানির শিকার
ওষুধ সংকট, অচল যন্ত্রপাতি ও জনবল ঘাটতিতে বিপর্যস্ত সেবা
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৬:০২
দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার প্রধান কেন্দ্র জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (এনআইসিআরএইচ) বহু রোগীর জন্য ভোগান্তির আরেক নাম হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক এক সরকারি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চিকিৎসা নিতে গিয়ে ৪১ দশমিক ৩৫ শতাংশ রোগী হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিতে গিয়ে ৫৪ শতাংশ রোগী কর্মচারীদের দুর্ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন। তীব্র ওষুধ সংকট, দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকা অনেক মূল্যবান যন্ত্রপাতি এবং জনবল ঘাটতির কারণে হাসপাতালটির সেবার মান প্রশ্নবিদ্ধ।
পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) পরিচালিত প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সাধারণত কোনো প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হলে প্রকল্পটি উদ্দেশ্য অনুযায়ী কতটুকু সেবা সৃষ্টি করল এবং সেবাগ্রহীতারা কীভাবে উপকৃত হচ্ছেন, তা যাচাইয়ে প্রভাব মূল্যায়ন করে থাকে আইএমইডি। সরেজমিন পরিদর্শন, নির্মাণ অবকাঠামোর গুণগত মান যাচাই, ক্রয়-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা, নানা পর্যায়ে উপাত্ত যাচাই, স্থানীয় সুবিধাভোগী, প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে সম্প্রতি প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। তৃতীয় পক্ষ হিসেবে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে ইউসুফ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস। এতে ৩৪৮ জনের সাক্ষাৎকার ও ১২টি কেস স্টাডি অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রতিবেদনটি গত ডিসেম্বরে পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়।
এমন পরিস্থিতিতে আগামীকাল বুধবার বাংলাদেশে ‘বিশ্ব ক্যান্সার’ দিবস পালিত হচ্ছে। দিবসটির প্রতিপাদ্য– ‘ইউনাইটেড বাই ইউনিক’।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসপাতালটিতে থাকা ১২১ ধরনের যন্ত্রপাতির মধ্যে মাল্টি-স্লাইস সিটি স্ক্যানসহ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যয়বহুল যন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর। পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ বাজেটের অভাবে এমআরআই, সিটি স্ক্যান ও লিনিয়ার এক্সিলারেটর মেশিন প্রায় অচল।
এনআইসিআরএইচ উন্নীতকরণ প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল ২০০৩ সালে এবং শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০০৬ সালে। কিন্তু সাত দফা সংশোধনের পর এটি শেষ হয় ২০২০ সালে অর্থাৎ তিন বছরের প্রকল্পে সময় লাগে ১৭ বছর। মূল বরাদ্দ ছিল ১২০ কোটি টাকা, যা বেড়ে দাঁড়ায় ২১৭ কোটি টাকায়। আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্মাণসামগ্রীর মান পরীক্ষাগারে যাচাই না করেই ঠিকাদারকে তিন কোটি ১৪ লাখ টাকার বেশি পরিশোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া পিপিআর-২০০৮ লঙ্ঘন করে ক্ষমতার বাইরে গিয়ে এক আইটেমের মাধ্যমে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত ছয় কোটি ৩৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
বেড়েছে রোগী
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত কয়েক বছরে বহির্বিভাগ, ভর্তি বিভাগ ও জরুরি বিভাগ– তিন ক্ষেত্রেই রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০১৫ ও ২০২৩ সালের তথ্য তুলনা করলে দেখা যায়, বহির্বিভাগে গড় দৈনিক রোগী বেড়েছে প্রায় ৭২ শতাংশ, ৪৭৭ জন থেকে ৮২০ জনে। একই সময়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১২৬ শতাংশ, ২১৫ জন থেকে ৪৮৬ জনে। সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে জরুরি বিভাগে, যেখানে দৈনিক রোগীর সংখ্যা ১২ থেকে বেড়ে ৫৬ জনে পৌঁছেছে, অর্থাৎ প্রায় ৩৬৭ শতাংশ বৃদ্ধি।
রোগী ভোগান্তির বাস্তব চিত্র
নেত্রকোনার বাসিন্দা জুবেদা বেগম গতকাল অনকোলজি বিভাগে কেমোথেরাপি নিতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, ছয় মাস পর সিরিয়াল মিলেছে। তবে ভর্তির সুযোগ ছিল না। কেমোথেরাপি দিয়ে আবার নেত্রকোনায় ফিরতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় এখানে খরচ কিছুটা কম। কিন্তু ভোগান্তি ভয়াবহ। একবার কেমোথেরাপিতে ২২ হাজার টাকা লাগে, আর ওষুধ-যাতায়াতে আরও চার হাজার। চিকিৎসা করতে গিয়ে আমাদের পরিবার প্রায় নিঃস্ব হয়ে গেছে।
ওষুধ সংকট ও ধীরগতির সেবা
হাসপাতালে ওষুধ সংকটের কারণে অনেক রোগীকে বাইরে থেকে অত্যন্ত দামি ওষুধ কিনতে হচ্ছে। এতে দরিদ্র রোগীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন। জরিপে দেখা গেছে ১৬ দশমিক ১২ শতাংশ রোগী ধীরগতির সেবার অভিযোগ করেছেন। ৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ রোগী সেবাদাতাদের অনীহার কথা বলেছেন। ৪০ শতাংশ রোগী প্রশাসনিক অসহযোগিতার অভিযোগ তুলছেন।
অচল যন্ত্রপাতি
রক্ষণাবেক্ষণ বাজেটের অভাবে হাসপাতালের এমআরআই ও টিসি স্ক্যান মেশিন দীর্ঘদিন ধরে অচল। সরেজমিন দেখা গেছে, লিনিয়ার এক্সিলারেটরসহ অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি মেরামত না করায় কার্যত ব্যবহারের বাইরে। এর ফলে রেডিওথেরাপি ও রেডিওলজি বিভাগের বহু পরীক্ষা রোগীদের বাইরে করাতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। অনেক দরিদ্র রোগীর পক্ষে এসব পরীক্ষার ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব।
রোগীদের হয়রানি ও সেবাবঞ্চনা
রোগীরা জানিয়েছেন, যন্ত্রপাতি সচল না থাকায় চিকিৎসা বিলম্বিত হচ্ছে। কিছু রোগীর অভিযোগ, ইচ্ছাকৃতভাবে রেডিওথেরাপি মেশিন মেরামত না করে তাদের বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশেষ ধরনের (টার্গেট গ্রুপের) রোগীদের জন্য আলাদা কাউন্টার, দ্রুত সেবা ব্যবস্থা ও ডিজিটাল সিরিয়াল চালু করা হলে ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বিলুপ্ত স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সদস্য ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন বলেন, দেশে আট থেকে ১০ লাখ ক্যান্সার রোগী আছে। বছরে নতুন করে প্রায় দুই লাখ মানুষ এই মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। এর মধ্যে প্রায় দেড় লাখ মানুষ ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘদিন ধরে দেশে ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থা অপ্রতুল থাকায় অনেক রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হয়েছেন। এতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়েছে। যারা বিদেশ যেতে পারেননি, তাদের বিনা চিকিৎসায় ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে সরকারকে দেশের ক্যান্সার চিকিৎসা অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. গোলাম মহিউদ্দীন ফারুক বলেন, পরিস্থিতি বুঝে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে হলে সবার আগে হাসপাতাল ও জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যান্সার রোগী নিবন্ধন জরুরি। এটি এখন পর্যন্ত দেশে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি ও গবেষণা ইনস্টিটিউট পাইলট প্রকল্প নিয়ে চেষ্টা করছে। সেবা দেওয়ার সক্ষমতা না বাড়লে রোগীর ভোগান্তি কমবে না।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. জাহাঙ্গীর কবীর বলেন, ‘হাসপাতালটি ৫০০ শয্যার হলেও কার্যত চলছে ৩০০ শয্যার জনবল দিয়ে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও দক্ষ নার্সের সংকটে রোগীরা মানসম্মত সেবা পাচ্ছেন না। রোগীর চাপ অনেক বেড়েছে। আমরা দুটি নতুন থেরাপি মেশিন কিনেছি এবং অচল যন্ত্র সচল করার উদ্যোগ নিয়েছি। তবে জনবল না বাড়ালে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন।
