প্রাণঘাতী অস্ত্র বন্ধের প্রতিশ্রুতি থাকলেও প্রতিফলন নেই
সীমান্তের সব মৃত্যুই বিচারবহির্ভূত হত্যা ড. সাহাব এনাম খান অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
ইন্দ্রজিৎ সরকার
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৮:৫৩ | আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬ | ১১:৪৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ। বছরের পর বছর এই সীমান্তে প্রাণ হারাচ্ছেন অনেক বাংলাদেশি নাগরিক। গত পাঁচ বছরে এখানে ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। আর চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে নিহত হয়েছেন আটজন। তাদের বেশির ভাগ মারা গেছেন ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) গুলিতে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাতে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের গুলিতে দুই বাংলাদেশি আহত হন।
সীমান্তে এ ধরনের মৃত্যু বা সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ। ভারতের পক্ষ থেকেও সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে সেই আশ্বাসের বাস্তব প্রতিচ্ছবি কখনও দেখা যায়নি। প্রতিবার সীমান্ত সম্মেলনে এ নিয়ে আলোচনা হলেও থেমে নেই হত্যাকাণ্ড। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ ধরনের ঘটনাকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ হিসেবেই আখ্যা দেয়।
এমন পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সাম্প্রতিক মন্তব্য বিভিন্ন মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যদি অন্য দেশের বাহিনী আমাদের সীমান্তে বা শূন্যরেখায় এসে কাউকে হত্যা করে, সেটাকে আমরা বর্ডার কিলিং বা সীমান্ত হত্যা বলতে পারি। কিন্তু আমাদের সীমানার ভেতরে বা তাদের সীমানার ভেতরে কেউ কোনো অপরাধে জড়িত থাকলে বা অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করলে, সেটি তারা তাদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী মোকাবিলা করবে। এটাকে বর্ডার কিলিং বলা ঠিক হবে না।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের, ভারতের বা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আমাদের সীমান্তে সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ডই হয়তো সীমান্ত হত্যা নয়। তবে সবই বিচারবহির্ভূত হত্যা। তার চেয়ে বড় কথা, সীমান্তের হত্যাকাণ্ডকে আইনিভাবে সংজ্ঞায়িত করে মানবাধিকার রক্ষার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন সমকালকে বলেন, সীমান্তের শূন্যরেখা বা আশপাশ এলাকায় যখন নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করা হয়, তখন এটাকে পাশ কাটিয়ে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের মানুষ হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তারা অপরাধ করে থাকলে আইন অনুযায়ী বিচারের সুযোগ আছে। কিন্তু সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তির এ ধরনের বক্তব্যে অন্যরা সুযোগ নিতে পারে।
আগামী ৮ থেকে ১১ জুন ভারতের দিল্লিতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেখানে আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে সীমান্ত হত্যা, পুশইন বন্ধের প্রসঙ্গ গুরুত্ব পাবে বলে জানা গেছে।
সীমান্তে ৫ বছরে ১৩৪ হত্যাকাণ্ড
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত সীমান্তে ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া চলতি বছরের মে পর্যন্ত সীমান্তে নিহত হয়েছেন আটজন। তাদের মধ্যে পাঁচজন গুলিতে নিহত; বাকি তিনজন শারীরিক নির্যাতনে মারা গেছেন। গুলিতে নিহতের তিনটি ঘটনাই মে মাসের। এ সময়ে আহত হয়েছেন পাঁচজন এবং একজন অপহরণ বা আটকের শিকার হয়েছেন।
এর আগে ২০২৫ সালে সীমান্তে ২৪ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া শারীরিক নির্যাতনে মারা গেছেন ১০ জন। একই সময়ে আহত হয়েছেন ৩৮ জন। অপহরণ বা আটক হয়েছেন ১৪ জন, যাদের মধ্যে চারজন ফিরে এসেছেন। ২০২৪ সালে সীমান্তে গুলিতে নিহত হন ২৫ জন। শারীরিক নির্যাতনে আরও চারজন এবং বিএসএফের ধাওয়ায় একজনের মৃত্যু হয়। এ বছর আহত হন ২৫ জন। ২০২৩ সালে সীমান্তে ২৯ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ২৮ জনের মৃত্যু হয় গুলিতে; অপরজন শারীরিক নির্যাতনে মারা যান। একই সময়ে আহত হন ৩১ জন। ২০২২ সালে সীমান্তে ২৩ জন প্রাণ হারান। তাদের মধ্যে ১৬ জন গুলিতে, চারজন শারীরিক নির্যাতনে, দুজন বিএসএফের ধাওয়ায় এবং একজনের মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বছর ১৫ জন আহত এবং ১১ জন অপহরণের শিকার হন। ২০২১ সালে ১৮ জন সীমান্তে মারা গেছেন, তার মধ্যে ১৬ জনকেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া একজন শারীরিক নির্যাতন এবং একজন বিএসএফের ধাওয়ায় পালাতে গিয়ে মারা যান।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) গত বছর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সীমান্তে ১০ বছরে বিএসএফের হাতে কমপক্ষে ৩০৫ জন বাংলাদেশি নিহত হন। আহত হয়েছেন ২৮২ জন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাব এনাম খান সমকালকে বলেন, ভারতের আইন অনুযায়ী সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ নেই। কিন্তু ভারত বারবার এর ব্যত্যয় ঘটায়। আইনি দিক থেকে সব মৃত্যুকে সীমান্ত হত্যা বলা না গেলেও বেশির ভাগই তাই। আর অবশ্যই সীমান্তের সব মৃত্যু বিচারবহির্ভূত হত্যা, যা মানবাধিকারের বড় রকমের ব্যত্যয়। এটা বলা যায়, সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশিরা। কেউ যদি অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে এদেশে চলে আসেন, তখন তাঁকে হত্যা করা হলে তো সীমান্ত হত্যা বলা যাবে না।
- বিষয় :
- হত্যা
- সীমান্তে হত্যা
- ভারত
