ইতিহাস
‘তুমি কি আমায় ভালোবাসো’
সুইডেনে রাস্তার পাশে পাওয়া পাথরে ভাইকিংদের লেখা প্রাচীন রুনলিপির বার্তা। ছবি: বিবিসি
সুমন মজুমদার
প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১১:৩৯
সময়টা অন্তত হাজার বছরের পুরোনো। প্রাচীন সুইডেনে গ্যার্ডার নামে এক ভাইকিং তরুণ পাথরের ওপর খোদাই করে রুন ভাষায় তাঁর বাবা সিগজার্ভের উদ্দেশে ভালোবাসার কথা জানিয়েছিলেন! সিগজার্ভ সেই চিঠির উত্তর দিয়েছিলেন কিনা কে জানে! তবে গ্যার্ডারের বার্তা খোদাই করা সেই পাথর হাজার বছর ধরে পড়ে ছিল অবহেলায়। সম্প্রতি সুইডিশ রুন বিশেষজ্ঞ ম্যাগনাস কালস্ট্রম স্টকহোমের কয়েক ঘণ্টা দক্ষিণের একটি খামারে গিয়ে যখন প্রাচীন রুনলিপিসমৃদ্ধ পাথরটি আবিষ্কার করলেন, কেবল তখনই মানুষ জানতে পারল হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো পিতার কাছে পুত্রের চিঠির কথা।
শুধু এই পাথরটিই নয়; ভাইকিং যুগে রুনলিপি কাঠ, হাড় এমনকি সাধারণ যন্ত্রপাতির ওপরেও লেখা হতো। একাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে গোথেনবার্গের বাইরে পাওয়া একটি সুতা কাটার যন্ত্রে লেখা ছিল, ‘তুমি কি আমার কথা ভাবো? আমি তোমার কথা ভাবি। তুমি কি আমায় ভালোবাসো? আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ তবে পাথরের লেখাগুলোই ছিল সবচেয়ে টেকসই এবং দৃশ্যমান। রুনলিপি পাহাড়ের গায়েও পাওয়া যায়, তবে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ‘রুন স্টোন’ বা রুন পাথরে, যা মানুষের উচ্চতা বা তার চেয়েও বেশি লম্বা খোদাই করা পাথরের ফলক।
উত্তর ইউরোপের তুষার ঢাকা স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের দুঃসাহসী, দুর্ধর্ষ এক প্রাচীন জাতির নাম ভাইকিং। প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠা এই জাতি অষ্টম থেকে একাদশ শতক পর্যন্ত ইউরোপের এক বিরাট এলাকাজুড়ে দোর্দণ্ড প্রতাপে ছড়িয়ে ছিল। এদের নর্সম্যান বা নর্থম্যানও বলা হয়।
ভাইকিংরা যে ভাষায় বা লিপিতে লিখত তাকে বলে ‘রুন’। সুইডেনে আবিষ্কৃত পাথরটিতেও সেই রুন ভাষাতেই খোদাই ছিল বাবার প্রতি পুত্রের সে বার্তা। এর আগেও সুইডেন ও আশপাশের দেশগুলোতে রুন ভাষায় খোদাই করা প্রচুর লিপি পাওয়া গেছে। এসব লিপিতে ফুটে ওঠে প্রেম, বিচ্ছেদ এবং মহাকাব্যিক যুদ্ধের চমৎকার সব গল্প। ‘রুন’ শব্দটির প্রাচীন নর্স শব্দ, যার অর্থ ‘রহস্য’। এই লিপিটি সাধারণত ২৪টি বা পরবর্তী সময়ে ১৬টি অক্ষর নিয়ে গঠিত। গবেষকদের মতে, এ লিপি উদ্ভাবিত হয়েছিল, যখন উত্তর ইউরোপের বণিক ও পর্যটকরা দক্ষিণ ইউরোপ ভ্রমণের সময় লাতিন বর্ণমালার মতো লিপির সংস্পর্শে আসেন। এরপর তারা সেই লিপিগুলো ব্যবহার করে নিজেদের লেখার ধরন তৈরি করেন, যা প্রাচীন নর্সের মতো উত্তর ইউরোপীয় ভাষাগুলোকে ধারণ করতে পারে।
সম্প্রতি বিবিসিতে মাতিল্ডা উইলিনের লেখা এক নিবন্ধে ম্যাগনাস কালস্ট্রমের পাওয়া রুনলিপি খোদাই করা পাথরটি সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়। সেখানে জানানো হয়, একজন কৃষক প্রথম তাঁর জমিতে পাথরটি খুঁজে পান এবং এটিকে তারা দরজার পাদানি বা সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু পাথরটি উল্টানোর পর ওই কৃষক দেখতে পান, সারিবদ্ধ সব প্রাচীন চিহ্ন; অনেকটা গাছের ডালপালার মতো। কিন্তু তিনি জানতেন না, এগুলোই ছিল রুনলিপি, যা প্রায় হাজার বছর আগে ভাইকিংরা ব্যবহার করত।
সুইডিশ ন্যাশনাল হেরিটেজ বোর্ডের প্রধান রুন বিশেষজ্ঞ কালস্ট্রম বলেন, রুন পাথরগুলো মূলত স্মারক হিসেবে স্থাপন করা হতো। এগুলো বসানো হতো জনসমাগমস্থলে, রাস্তার ধারে, খেয়াঘাটে বা সভা হওয়ার জায়গায়, যাতে সবার নজরে পড়ে। ৩০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় এগুলো জনপ্রিয় হতে শুরু করলেও এর স্বর্ণযুগ ছিল ভাইকিং সময় ৮০০ থেকে ১০৫০ খ্রিষ্টাব্দ। প্রকৃতপক্ষে এই পাথরগুলো ভাইকিং যুগের সামাজিক মাধ্যম হিসেবেও অভিহিত করা হয়।
- বিষয় :
- ইতিহাস
