ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ

শান্তি ফেরানো ও কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা

যারা ভোট দিয়েছেন, যারা দেননি, সরকারে সবার অধিকার সমান

শান্তি ফেরানো ও কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা
×

নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল বুধবার সকালে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন- পিআইডি

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:২২ | আপডেট: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১০:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাকে প্রধান অগ্রাধিকার বলে ঘোষণা করেছেন। এ জন্য তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। 

নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা প্রত্যেক নাগরিকের জন্যই এই দেশকে একটি নিরাপদ ভূমিতে পরিণত করতে চাই। একটি স্বনির্ভর নিরাপদ মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই সরকারের লক্ষ্য।’
গতকাল বুধবার রাত পৌনে ১০টায় তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। বেতার ও টেলিভিশনে তা সম্প্রচার করা হয়। এতে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘দলীয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি অথবা জোর-জবরদস্তি নয়; আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা।’ 

১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ দিনই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ২৫ মন্ত্রী ও ২৪ প্রতিমন্ত্রী নিয়ে নতুন মন্ত্রিপরিষদ গঠন করা হয়। 

ভাষণে দ্রব্যমূল্য নিয়ে ব্যবসায়ীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্য যাতে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায়, এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের সতর্ক থাকতে হবে। 
দেশবাসীকে পবিত্র রমজান মাসের শুভেচ্ছা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘রামাদান (রমজান) আত্মশুদ্ধির মাস। আমরা যদি আত্মশুদ্ধি শব্দটির মর্মার্থ উপলব্ধি করি, তাহলে এ মাসে মানুষের ভোগান্তি বাড়ার কথা নয়। যদিও অনেকের মধ্যেই এই মাসটি ঘিরে ব্যবসায় অধিক মুনাফা লাভের প্রবণতা লক্ষণীয়। আপনাদের প্রতি আহ্বান– রামাদানের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে এ মাসটিকে আপনারা ব্যবসায় মুনাফা লাভের মাস হিসেবে পরিগণিত করবেন না।’

তারেক রহমান আরও বলেন, হাজারো প্রাণের বিনিময়ে একটি মাফিয়া সিন্ডিকেটের পতন ঘটিয়ে রাষ্ট্র এবং সরকারে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। বিএনপি সরকার সব ক্ষেত্রেই অনাচার-অনিয়মের সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে বদ্ধপরিকর। 

সরকারের প্রতি সবার সমান অধিকার 
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, ‘নবগঠিত সরকার গঠনের সুযোগ দিতে যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন কিংবা দেননি অথবা কাউকেই ভোট দেননি; এই সরকারের প্রতি আপনাদের সবার অধিকার সমান।’ 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি সরকার বিশ্বাস করে, দলমত ধর্ম দর্শন যার যার, রাষ্ট্র সবার। এই দেশে, এই রাষ্ট্রে একজন বাংলাদেশি হিসেবে, আপনার আমার আমাদের প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের অধিকার সমান।’
এ সময় আইনের শাসন মেনে রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চলবে বিধিবদ্ধ নীতি-নিয়মে।’ 

এই দেশ আমাদের সবার
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদের সময়ের দুর্নীতি-দুঃশাসনে পর্যুদস্ত একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল শাসন কাঠামো আর অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। আমি দেশবাসীর উদ্দেশে একটি বার্তা দিতে চাই– মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান তথা দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পাহাড় কিংবা সমতলে বসবাসকারী– এই দেশ আমাদের সবার। 

নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রামাদান মাসে রোজাদাররা বিশেষ করে ইফতার, তারাবি, সাহ্‌রি এই সময়গুলোতে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পেতে চান। এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছি। অপচয় রোধ করে কৃচ্ছ্র সাধন প্রতিটি মুসলমানের ইমানি দায়িত্ব। অফিস-আদালতে বিনা প্রয়োজনে কিংবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি খরচের ব্যাপারে সচেতনতা অবলম্বন করাও ইবাদতের অংশ বলেই আমি মনে করি।

কর্মসংস্থান ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে অঙ্গীকার
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের চারপাশে সমস্যার শেষ নেই। তবে সমস্যার পাশাপাশি সম্ভাবনাও কিন্তু কম নয়। আমাদের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে যদি আমরা দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারি, তাহলে এই জনসংখ্যাই হবে আমাদের জনসম্পদ। আমরা নিজেদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলে শুধু বাংলাদেশই নয়, বিশ্ববাজারও আমাদের জন্য উন্মুক্ত। তথ্যপ্রযুক্তির সিঁড়ি বেয়ে 
বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে। প্রযুক্তির এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সম্মান এবং সচ্ছলতার সঙ্গে টিকে থাকতে হলে আমাদের কোনো না কোনো একটি বিষয়ে বা কাজে পারদর্শী হতে হবে। দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী এবং তরুণ যুবশক্তির উদ্দেশে বলতে চাই, মেধায় জ্ঞানে বিজ্ঞানে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য যত রকমের সহযোগিতা দেওয়া যায়, সব রকমের সহযোগিতা দিতে সরকার প্রস্তুত। কর্মসংস্থান ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়ে বর্তমান সরকার যাত্রা শুরু করেছে।

প্রতিষ্ঠান চলবে বিধিবদ্ধ নীতি-নিয়মে
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। সারাদেশে জুয়া ও মাদকের বিস্তারকেও বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা অবনতির অন্যতম কারণ বলে চিহ্নিত করেছে। সুতরাং, জুয়া ও মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সব রকমের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। জনজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ উদ্যোগ গ্রহণ করছে। দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চলবে বিধিবদ্ধ নীতি নিয়মে।  

মহানবী (সা.)-এর ন্যায়পরায়ণতার আদর্শ অনুসরণ
দেশের সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং জনসাধারণের প্রতি কৃচ্ছ্রসাধনের আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর আগে সরকারের মন্ত্রী এবং বিএনপির এমপিদের দিয়েই একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চেয়েছি। বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম সভাতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিএনপি থেকে নির্বাচিত কোনো এমপি সরকারি সুবিধা নিয়ে ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি আমদানি করবেন না এবং প্লট সুবিধা নেবেন না। বলেছিলাম, রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে বিএনপি সরকার মহানবী (সা.)-এর ন্যায়পরায়ণতার আদর্শ অনুসরণ করবে। বিএনপির সংসদীয় দলের এসব সিদ্ধান্ত ন্যায়পরায়ণতার আদর্শেরই প্রতিফলন।

রাজধানীতে চাপ কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা
বিভাগীয় শহরগুলোতে বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় যানজট প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, হাটে-মাঠে-ঘাটে, অফিস-আদালতে জনগণের ভোগান্তির শেষ নেই। জনজীবনের নানা ক্ষেত্রে জনদুর্ভোগ লাঘব করা না গেলে জনমনে স্বস্তি ফিরবে না। রাজধানীতে জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। মানুষ তার নিজ জেলায় কিংবা নিজের বাসাবাড়িতে থেকেও যাতে সহজভাবে সঠিক সময়ে অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেন, সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সারাদেশে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথমেই রেল-নৌ-সড়ক এবং সেতু মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয় করা হচ্ছে। সারাদেশে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার সহজ, সুলভ এবং নিরাপদ করা গেলে একদিকে যেমন জনগণের শহর-নগরকেন্দ্রিক নির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে পরিবেশেরও উন্নতি হবে।

অঙ্গীকার পূরণ করার দায়িত্ব সরকারের
দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর পর দেশে ফিরে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশ এবং জনগণের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান।’ এ প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে আমার পরিকল্পনার অনেক কিছুই আপনাদের সামনে তুলে ধরেছিলাম। আপনারা বিএনপিকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন। সব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ দিয়েছেন। এখন এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সব অঙ্গীকার পূরণ করার দায়িত্ব বিএনপি সরকারের। আমরা আমাদের পরিকল্পনা এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে দিয়েছি। অঙ্গীকার পূরণের এই যাত্রাপথে আমরা ভবিষ্যতের দিনগুলোতেও আপনাদের অব্যাহত সমর্থন প্রত্যাশা করি।

ব্যবসায়ীদের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি সহজ ও স্পষ্ট
তারেক রহমান বলেন, ক্ষুদ্র, মাঝারি কিংবা ছোট ও বড় সব ব্যবসায়ীর প্রতি বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি সহজ এবং স্পষ্ট। বর্তমান সরকার ব্যবসায়ী এবং ক্রেতা সাধারণ উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চায়। সুতরাং সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করলে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে কিংবা ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের স্বার্থ রক্ষা হবে, এ ব্যাপারে আপনাদের যে কোনো ধরনের পরামর্শ কিংবা অভিযোগ শুনতে সরকার প্রস্তুত। ক্রেতা-বিক্রেতা, গ্রহীতা– এই সরকার সবারই সরকার।

 

আরও পড়ুন

×