ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শহীদ মিনার আর আমাদের শিল্পী হয়ে ওঠার গল্প

শহীদ মিনার আর আমাদের  শিল্পী হয়ে ওঠার গল্প
×

রফিকুন নবী

রফিকুন নবী

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৯:০৪ | আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১০:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৫২ সালে আমি ঢাকার কাছে কালীগঞ্জের একটি স্কুলে পড়তাম। তখন ক্লাস ফোরে উঠেছি। একদিন হঠাৎ বেলা ১১টার দিকে স্কুল ছুটি দিয়ে দেওয়া হলো। আমরা ছোটরা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। পরে জানলাম, ঢাকায় বাংলা ভাষার দাবিতে মিছিল হয়েছে, সেখানে গুলি চালানো হয়েছে এবং ছাত্র-জনতা নিহত হয়েছে। সেই খবরে স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

ছুটি দেওয়ার পর স্কুলের মাঠে একটি সভা হলো। শিক্ষকরা বক্তৃতা দিলেন, সিনিয়র ছাত্ররাও কথা বললেন। আমাদেরও সেখানে থাকতে হয়েছিল। সেই সভার মাধ্যমে প্রথম আমি একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনা জানতে পারি। ছোট ছিলাম; কিন্তু একটা অদ্ভুত শোক আর উত্তেজনার পরিবেশ বুঝতে পেরেছিলাম।

১৯৫২ সালের জুলাই মাসে আমরা ঢাকায় চলে আসি। ঢাকায় এসে স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর দেখি ভাষা আন্দোলনের রেশ তখনও চলছে। পাড়ায় পাড়ায় বক্তৃতা অনুষ্ঠান হতো, বিচিত্রানুষ্ঠানের নামে দেশাত্মবোধক গানের আসর বসত। আমাদের পাড়ায় যেমন হতো, অন্য পাড়ায়ও দেখতাম। অনেক স্কুলেও একুশকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠান হতো। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই– এই আন্দোলন তখনও চলমান ছিল।
পরের বছরগুলোতে দেশে নানা রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হলেও ভাষা আন্দোলনের ধারাটা থেমে যায়নি।
১৯৫৯ সালে আমি কলেজে ভর্তি হই।

 ৬০-এর দশকে বর্তমান শহীদ মিনারের নির্মাণকাজ শুরু হয়। তখন ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে আমাদের সচেতনতা বেড়েছে। ফেব্রুয়ারি এলেই মিছিল, আলোচনা, অনুষ্ঠান– সবকিছু শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে হতে শুরু করল।

ষাটের দশকে আমরা যারা শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, তারা ধীরে ধীরে রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে উঠি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্র সংগঠনগুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠান করত, আর সেই অনুষ্ঠানের জন্য আমাদের দিয়ে পোস্টার আঁকানো হতো। আমরা পোস্টার, ফেস্টুন, কার্টুন আঁকা শুরু করি। ভাষা আন্দোলন কবি-সাহিত্যিকদের যেমন উদ্দীপ্ত করেছিল, আমাদের শিল্পের জগতেও তেমন উদ্দীপনা তৈরি করেছিল। শেখ লুৎফর রহমান, আলতাফ মাহমুদ, আব্দুল লতিফসহ অনেকে তখন গণসংগীত গাইতেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। বিশেষ করে একুশে ফেব্রুয়ারিতে।

শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠান ধীরে ধীরে বড় আকার ধারণ করে। ষাটের দশক থেকে আলপনা আঁকার প্রচলন শুরু হয়। তখন শাহবাগের চারুকলার গেট থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত, আবার শহীদ মিনার থেকে গোরস্তান পর্যন্ত সাদা-কালো রঙে আলপনা আঁকা হতো। তিন-চার দিন আগে থেকে কাজ শুরু করতাম, আর ২০ ফেব্রুয়ারির রাত পর্যন্ত চলত সেই প্রস্তুতি। এই আলপনাগুলো আঁকতেন শিল্পী গোলাম সরোয়ার। তিনি মূলত আলপনার মূল ড্রইংয়ের লে-আউট এঁকে দিতেন।

সে সময় শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার এবং শিল্পী ইমদাদ হোসেন মিলে শহীদ মিনারে বড় লাল সূর্যের প্রতীক ব্যবহারের প্রচলন শুরু করেন। পরে এটি একুশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হয়।
প্রথম দিকে ছোট ছোট পত্রিকা বের হতো, সেখানে আমাদের আঁকা ছবি ছাপা হতো। ষাটের দশকের মাঝামাঝি রাজনৈতিক আন্দোলন তীব্র হলে আমাদের পোস্টার প্রোগ্রাম আরও বেড়ে যায়। আমি যেহেতু কার্টুন আঁকতে পারতাম, আমাকে দিয়ে অনেক পোস্টার আঁকানো হতো। এগুলো আমরা স্বেচ্ছায় করতাম; কিন্তু খুব গোপনে। কারণ সরকারি ঝুঁকি ছিল। পোস্টারগুলো দেয়ালে লাগানোর জন্য নয়, মিছিলের মানুষের হাতে হাতে থাকার জন্য বানানো হতো।

আমাদের পুরো ষাটের দশকটা শহীদ মিনারকেন্দ্রিক আয়োজনের মধ্যে কেটেছে। তারপর এলো ৬৯। সে সময় শহীদ মিনারকে আরও সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছিল। বড় বড় পেইন্টিং করা হয়, আদর্শলিপির অক্ষর ব্যবহার করে ব্যঙ্গাত্মক চিত্রের মাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করা হয়। খোলা জায়গায় সেসব ছবির প্রদর্শনী হয়েছিল।

ভাষা আন্দোলন তখন শিল্পীদের কাজের অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছিল। শিল্পী মর্তুজা বশীর, শিল্পী রশীদ চৌধুরী, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার, শিল্পী কামরুল হাসান– অনেকে ভাষা আন্দোলন নিয়ে বড় ব্যানারে ছবি আঁকতেন। সেসব কাজ আমাদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

আমাদের সময়টা ছিল খুব নিবেদনের। এখন প্রেক্ষাপট বদলেছে। এখন আলপনা অনেকটা রুটিন হয়ে গেছে, এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। শহীদ মিনারে এখন উৎসবের আমেজ বেশি দেখা যায়। রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে; কিন্তু ভাষা আন্দোলনের যে প্রতীকী শক্তি– সেটাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠান হয় এখন।
তবে এখন শহীদ মিনার সারাবছরের একটি উন্মুক্ত জায়গা হয়ে গেছে। মানুষ সেখানে থাকে, ঘোরাঘুরি করে, কেউ কেউ ঘুমায়ও। ফলে শহীদ মিনারের যে মার্জিত আবহ এক সময় ছিল, তা সবসময় বজায় থাকে না।

আমার কাছে একুশে ফেব্রুয়ারি হলো এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্য চেতনার শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। সেই ধারাই পরে স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে গড়িয়ে যায়।

শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা বাঙালি সবসময় করেছে, আমরাও করি। ১৯৫২ সালে অনেক মানুষ আহত-নিহত হয়েছিলেন, যাদের নাম আমরা জানি না। আমি তাদেরও স্মরণ করি, কারণ তারাও এই ইতিহাসের অংশ।
 

লেখক : চিত্রশিল্পী ও কার্টুনিস্ট

অনুলিখন : দ্রোহী তারা

আরও পড়ুন

×