ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

কাগজে-কলমে সারের মজুত পর্যাপ্ত, মাঠে হাহাকার

কাগজে-কলমে সারের মজুত পর্যাপ্ত, মাঠে হাহাকার
×

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

উত্তরবঙ্গের রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর ও গাইবান্ধায় বোরো মৌসুমের শুরুতেই সার নিয়ে শুরু হয়েছে চরম অরাজকতা। কাগজ-কলমে সারের মজুত পর্যাপ্ত থাকলেও মাঠপর্যায়ে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের গড়ে তোলা শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে তৈরি হয়েছে কৃত্রিম সংকট। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। কোথাও সারের দাবিতে হাহাকার চললেও কৃষি বিভাগের দাবি– পরিস্থিতি স্বাভাবিক। এই দ্বিমুখী অবস্থানের চাপে পিষ্ট হচ্ছেন প্রান্তিক চাষিরা, যার প্রভাব সরাসরি বোরো ধানের উৎপাদন খরচে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

রাজশাহীতে দাম বাড়ার নেপথ্যে সিন্ডিকেট
রাজশাহীর বাগমারা ও তানোর এলাকায় সারের সংকট সবচেয়ে তীব্র। বাগমারার তাহেরপুর গ্রামের কৃষক কাউসার আলী বলেন, ‘এক সপ্তাহ ঘুরে ডিলারের কাছে সার না পেয়ে কালোবাজার থেকে ৮০০ টাকা বাড়তি দিয়ে টিএসপি কিনেছি। ডিলাররা গুদামে সার রাখে না, সব পাচার করে দেয়।’ গত ৪ ডিসেম্বর বাগমারার আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল ওয়ারেস বাবু ওরফে মুরগি বাবুর বাড়ি থেকে ৪৪৪ বস্তা সার উদ্ধার এর প্রমাণ দেয়। বাঘা উপজেলার কৃষক মহসিন আলী জানান, এক হাজার ৫০ টাকার ডিএপি এক হাজার ৩০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে তাহেরপুরের ডিলার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সারের সংকট নেই, খুচরা ব্যবসায়ীরা দাম বেশি নিতে পারে।’ তবে বাগমারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘কালোবাজারে সার বিক্রির তথ্য আমার জানা নেই, অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব।’ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহীর উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন দাবি করেন, জেলায় ছয় হাজার টন সার মজুত রয়েছে।

নওগাঁয় নন-ইউরিয়া সারে নৈরাজ্য 
ধান-চাল উৎপাদনে প্রসিদ্ধ নওগাঁয় ইউরিয়া সার মিললেও ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি–এই তিন সারের দাম আকাশচুম্বী। খুচরা দোকানে এক হাজার ৫০ টাকার ডিএপি বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৫০০ টাকায়। পোরশা উপজেলার মশিদপুর গ্রামের কৃষকদের অভিযোগ, ডিলাররা ‘সরবরাহ শেষ’ বলে তাদের ফিরিয়ে দিলেও গ্রাম্য খুচরা দোকানে বাড়তি দামে সব সারই পাওয়া যাচ্ছে।
পোরশার মশিদপুর ইউনিয়নের শিশা বাজারে বিএডিসি ডিলার মতিন শাহ দাবি করেন, ‘সরকার নির্ধারিত দামেই সার বিক্রি হচ্ছে।’ একই দাবি নিয়ামতপুর উপজেলার চন্দননগর ইউনিয়নের বিসিআইসি ডিলার মোস্তাফিজুর রহমানেরও। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ফেব্রুয়ারি মাসে জেলায় ডিএপি ও এমওপি সারের বিতরণ বরাদ্দের চেয়েও বেশি হয়েছে, যা মূলত আগের মজুত থেকে মেটানো হয়েছে। তদারকির অভাবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন।

দিনাজপুরে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম
সিন্ডিকেটে পিষ্ট কৃষক দিনাজপুরে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ ৭২ হাজার ৬৫০ হেক্টর হলেও চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অনেক কম। সদর উপজেলার মাধবপুর গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জমির জন্য টিএসপি সার কিনতে গিয়ে হয়রানি হচ্ছি। বাজারে যে দাম লেখা, তার চেয়ে অনেক বেশি দিতে হচ্ছে।’ বলতৈড় এলাকার কৃষক সেলিম রেজা সরাসরি অভিযোগ করেন, ‘এখানে একটা সিন্ডিকেট হয়েছে, টাকা বেশি দিলেই সার মিলছে।’
কৃষকদের হিসাবমতে, এক বিঘা জমিতে বোরো চাষে লাভ হয় মাত্র ৫-১০ হাজার টাকা। সারের বাড়তি দাম এই সামান্য লাভের গুড়ও খেয়ে ফেলছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি মাসে বরাদ্দের ঘাটতি ছিল, তবে মার্চের বরাদ্দ চলে এসেছে। অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

গাইবান্ধায় থামছে না কালোবাজারি
গাইবান্ধায় সার কালোবাজারি এতটাই বেপরোয়া যে প্রশাসন কয়েক দফায় কয়েকশ বস্তা সার জব্দসহ জরিমানা করেছে। গত ২৭ জানুয়ারি ২০০ বস্তা ইউরিয়া সার পাচারের সময় একটি ট্রাক জব্দ করা হয়। পলাশবাড়ীর ডিলার মেসার্স রামচন্দ্র সাহার জন্য বরাদ্দ এ সার সদর উপজেলায় পাচার করা হচ্ছিল। খোলাহাটি ইউনিয়নের কৃষক সাগির মিয়া জানান, প্রতি কেজি সারে তিন থেকে পাঁচ টাকা বাড়তি দিতে হচ্ছে, কিন্তু রসিদ দিচ্ছেন না।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাকিবুল আলম জানান, অবৈধ মজুতের দায়ে ব্যবসায়ীদের জরিমানা করা হচ্ছে। তবে জেলার অতিরিক্ত উপপরিচালক আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘জেলায় সারের কোনো সংকট নেই, নিয়মিত তদারকি চলছে।’ এদিকে গোবিন্দগঞ্জে সার ও কীটনাশকের উচ্চমূল্যের কারণে আলুচাষিরা বিঘাপ্রতি ২৭ থেকে ৩২ হাজার টাকা লোকসান গুনছেন।
উত্তরাঞ্চলের এই চার জেলায় কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকির দাবির সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার কোনো মিল নেই। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের যোগসাজশে যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তা 
ভাঙতে না পারলে বোরো ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হতে পারে। কৃষকদের দাবি, কেবল লোক দেখানো জরিমানা নয়, ডিলারশিপ বাতিলসহ কঠোর আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমেই এই সার সিন্ডিকেট নির্মূল করা সম্ভব।

আরও পড়ুন

×