মহিলা অধিদপ্তর
সরকারি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে সেবার সংকট
সরকারি প্রতিবেদনেও অসংগতির তথ্য
দেলওয়ার হোসেন
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৫২ | আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৯:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
খাবার কম দেওয়া, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নিরাপত্তা, শিক্ষা, খেলার সামগ্রী ও জায়গার অভাব– এই বাক্যগুলো যেন সরকারি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। বেশির ভাগ সরকারি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে সরেজমিন গেলে কিংবা ভুক্তভোগীদের অভিযোগ থেকে এমন চিত্রই পাওয়া যায়। কখনও কখনও সরকারি প্রতিবেদনেও এমন তথ্য ওঠে আসে।
সারাদেশে সরকারি ৪৩টি দিবাযত্ন কেন্দ্রে দুই হাজার ৮৩০ শিশু রাখার ব্যবস্থা আছে। কর্মজীবী মায়েরা কাজে গেলে তাদের শিশুরা যাতে নিরাপদে থাকতে পারে, সেজন্য সরকার এই উদ্যোগ নেয়।
কেন্দ্রগুলোতে সরকারি খরচে শিশুদের সকাল, দুপুর ও বিকেলে খাবার দেওয়া হয়। তারা পুরো দিন সেখানেই থাকার কথা। সেজন্য শিশুদের খেলাধুলা, ঘুম ও পরিচর্যার ব্যবস্থাও কেন্দ্রে থাকতে হবে। এসব কেন্দ্রের সেবা নিতে শিশুদের একবার নাম নিবন্ধন করতে হয়। নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য নিবন্ধন ফি ১০০ টাকা এবং মধ্যবিত্তের জন্য ৫০০ টাকা।
৪৩টি দিবাযত্ন কেন্দ্রের মধ্যে ৩৩টি নিম্নবিত্তের শিশুদের জন্য, বাকি ১০টি মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য।
অবশ্য গত বছরের জানুয়ারি মাসে আজিমপুর কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে এই বিভাজন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। কেন্দ্রগুলোর আবাসন সক্ষমতা যথাক্রমে ৮০, ৬০ ও ৫০। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে এ কেন্দ্রগুলো পরিচালিত হয়।
সরকারি নথিতে দেখা যায়, সবগুলো কেন্দ্র মিলে গত সেপ্টেম্বরে এক হাজার ৪৮১ জন, অক্টোবর ও নভেম্বরে এক হাজার ৬৮০ জন করে শিশু উপস্থিত ছিল। তবে সরেজমিন ১৫টি কেন্দ্র ঘুরে দেখে এবং অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিশু উপস্থিতির সংখ্যা বাস্তবে অনেক কম থাকে। এ ক্ষেত্রে খাবার খরচের বাড়তি টাকা ঠিকাদার ও কিছু ডে কেয়ার কর্মকর্তার পকেটে যায় বলে অভিযোগ আছে। কেন্দ্রের অন্যান্য খরচ নির্ধারিত থাকে। সেখানে শিক্ষা ও খেলার যথাযথ উপকরণ, বিছানা ইত্যাদি কম কেনার অভিযোগও আছে।
সবচেয়ে বেশি অভিযোগ পাওয়া গেছে, সকালে ভালো খাবার না দেওয়ার। আর বিকেলে খাবার না দিয়ে ছুটি দিয়ে দেওয়ার। দুপুরে সব বয়সী শিশুদের জন্য এক রকম খাবার রান্না করা হয়। ফলে কম বয়সী শিশুরা সেটা ভালোভাবে খেতে পারে না।
নিয়ম অনুযায়ী, কেন্দ্রগুলো সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকা; অপুষ্টি রোধে সুষম ও বিকল্প খাবার দেওয়ার কথা। শিশুদের দেখভালের পাশাপাশি বয়স উপযোগী খেলাধুলা, ছবি আঁকা, বর্ণ পরিচিতি, ছড়া শেখা, ঘুম ও চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করার বাধ্যবাধকতা আছে।
ঢাকার ২৫টি দিবাযত্ন তদারকির দায়িত্বে আছেন সদরদপ্তরের কর্মকর্তারা। জেলা পর্যায়ের ১৮টি কেন্দ্র তদারকি করেন জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালকরা। প্রতি মাসে কমপক্ষে একবার শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করে প্রতিবেদন অধিদপ্তরের উপপরিচালক (দিবাযত্ন) বরাবর পাঠানোর নিয়ম আছে। সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে অধিদপ্তর থেকেও প্রতিটি কেন্দ্র তদারকি করার কথা।
প্রতিটি কেন্দ্রে একজন করে ডে-কেয়ার কর্মকর্তা, শিক্ষিকা, স্বাস্থ্য শিক্ষিকা, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও দুজন করে বাবুর্চি, নিরাপত্তা প্রহরী এবং চার আয়াসহ (শিশু যত্নকারী) মোট ১২টি পদ আছে। কিন্তু শ্রীমঙ্গল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লা দিবাযত্ন কেন্দ্রে মাত্র তিনজন করে কর্মী আছেন। কেন্দ্র তিনটির শিশুর ধারণক্ষমতা ৮০ জন করে।
শিশুদের সেবার জন্য সরকারি কর্মকর্তার বাইরে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নেওয়া কর্মীও আছেন। একাধিক কেন্দ্রে গিয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে, তারা নিয়মিত বেতন পান না। আবার তাদের প্রশিক্ষণ না দেওয়ায় অনেকে নিয়ম মেনে শিশুদের সেবা দিতে পারেন না।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৪টি কেন্দ্রে ডে কেয়ার কর্মকর্তা নেই। জেলা মহিলাবিষয়ক কার্যালয়ের উপপরিচালক ও উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তারা এসব কেন্দ্রে অতিরিক্ত, চলতি দায়িত্ব অথবা সংযুক্তিতে কাজ করেন। অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বাড়তি ভাতা পান। কিন্তু একাধিক দায়িত্বে থাকায় শিশুদের সঠিকভাবে সেবা দিতে পারছেন না তারাও।
৪৩টি দিবাযত্ন পরিচালনায় চলতি অর্থবছর (২০২৫-২৬) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৮ কোটি ৬৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। এর আগের দুই বছর বরাদ্দ ছিল প্রায় ৩০ কোটি টাকা করে। কেন্দ্রগুলোতে বছরের শুরুতে অধিদপ্তর থেকে ধারণক্ষমতার হিসেবে অর্থছাড় করা হয়।
অধিদপ্তরের উপপরিচালক কানিজ তাজিয়া সরকারি ৪৩ দিবাযত্ন কেন্দ্র দেখভাল করছেন। ঢাকার ২৫ দিবাযত্ন কেন্দ্রের ১১টির আয়-ব্যয় কর্মকর্তাও তিনি। তাঁকে গত ১৫ মে মাদারীপুরের ডাসার উপজেলায় মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা পদে বদলি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ ছিল, যোগদানে বিলম্ব হলে ২০২৫ সালের ২২ মে থেকে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত হবেন। তবে তিনি এখন ঢাকায় দায়িত্ব পালন করছেন।
কুমিল্লা: বরাদ্দ আছে– বিছানা, খেলনা ও শিক্ষা উপকরণ নেই
কুমিল্লা দিবাযত্ন কেন্দ্রে ৮০ জন শিশু রাখার ব্যবস্থা আছে। চলতি অর্থবছরে কেন্দ্রটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। কেন্দ্রের ডে কেয়ার কর্মকর্তা কানিজ ফাতেমা এর আয়-ব্যয় কর্মকর্তাও। তিনি প্রথম শ্রেণির উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা। কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণির ডে কেয়ার কর্মকর্তা পদে কাজ করছেন।
গত ৪ ও ৭ ডিসেম্বর এ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ছয়জন শিশু উপস্থিত আছে। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় বিছানা, খেলনা ও শিক্ষা উপকরণ নেই। বিকেল পর্যন্ত রাখার কথা থাকলেও দুপুরে তাদের ছুটি দেওয়া হয়। ফলে বিকেলের খাবার দেওয়া হয়নি।
একজন শিশুর জন্য সরকারি বরাদ্দ দৈনিক ১৩৫ টাকা। নিয়ম হলো– সপ্তাহে দুদিন দুপুরে ভাতের সঙ্গে রুই মাছ, দুদিন মুরগির রেজালা ও এক দিন সবজি খিচুড়ির সঙ্গে মুরগি দেওয়া। সঙ্গে প্রতিদিন ডাল, সবজি, শাক, সালাদ থাকতে হবে।
দৈনিক খাদ্য তালিকা অনুযায়ী, ৪ ডিসেম্বর সকালে দেওয়ার কথা ছিল ডিম স্যান্ডউইচ বা দুধসুজি। দেওয়া হয়েছে সুজি। দুপুরে দেওয়ার কথা ছিল– ভাত, ডাল, সবজি, মুরগির রেজালা, সালাদ। দেওয়া হয়েছে ভাত আর মুরগির ঝোল। বিকেলের খাদ্য তালিকায় ছিল– দই, তাজা ফলের রস। কিন্তু দুপুরে শিশুদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ৭ ডিসেম্বরের চিত্রও ছিল প্রায় একই রকম।
এই কেন্দ্রের খাবার সরবরাহের ঠিকাদার আর আর এন্টারপ্রাইজের মালিক খোরশেদ আলম। তিনি চার বছর ধরে খাবার সরবরাহের কাজ পাচ্ছেন। তিনি একই সঙ্গে ঢাকার সাভার ও মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল দিবাযত্ন কেন্দ্রেরও ঠিকাদার।
কুমিল্লা কেন্দ্রে শিশু মেহেরাজের মা সিমু আক্তার সমকালকে বলেন, ডে কেয়ারে আচার-ব্যবহার ভালো না। বাচ্চা নিয়ে গেলে বলে, ঠিক আছে রাইখা যান। শুনছি, বড় ম্যাডাম নিজেই বাজার করেন। কিন্তু খাবার ভালো না। সিমু আক্তার বলেন, এখন দিনে দুই-তিনটা বাচ্চা থাকে। যত্ন করার কেউ না থাকায় অনেক সময় বাচ্চারা বের হয়ে যায়।
কার্যাদেশের শর্ত অনুযায়ী, ঠিকাদার খাবার কিনে নিয়মিত কেন্দ্রে সরবরাহ করবেন। ডে কেয়ার কর্মকর্তার খাবার কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে কানিজ ফাতেমা সমকালকে বলেন, ‘আগে শিশুদের খাবার না দিয়ে প্রতিদিন একজন মায়ের হাতে ৫০ টাকা দেওয়া হতো। আমি খাবার দেওয়া শুরু করেছি। শিশুদের কথা চিন্তা করে নিজেই বাজার করি। ঠিকাদার বিকাশে টাকা দিয়ে দেন।’
কেন্দ্রে শিশু বেশি দেখিয়ে বেশি বিল করার অভিযোগের বিষয়ে ডে কেয়ার কর্মকর্তা বলেন, ঠিকাদারের দিক থেকে বিল করার সময় এমন চাপ থাকে। তবে তা মানা হয় না। বিছানাপত্র কম বা না থাকার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, শিশু কম হওয়ায় বিছানাসহ অনেক কিছু কেনা হয়নি। এই কেন্দ্রে জনবল ছিল মাত্র তিনজন। এর মধ্যে নিরাপত্তা প্রহরী সোহাগ শিকদার ও আয়া মর্জিনা বেগমকে এক বছরে পাঁচবার শোকজ করা হয়েছে। পরে ডে কেয়ার কর্মকর্তার সুপারিশে নিরাপত্তা প্রহরী সোহাগ শিকদারকে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। আয়া মর্জিনা বেগমকে বদলি করা হয়েছে যশোর দিবাযত্ন কেন্দ্রে। পাচক ফেরদৌসী আক্তারকে বদলি করা হয় কুমিল্লা জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে।
শ্রীমঙ্গল কেন্দ্রে উপস্থিতি বাড়িয়ে দেখানো হয়
২ ও ৬ নভেম্বর শ্রীমঙ্গল দিবাযত্ন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ৮০ জনের কেন্দ্রে শিশু আছে ১৫ জন। কাগজপত্রে খাবার বিল দেখা গেছে ৪৭ জনের। এই কেন্দ্রেও খাদ্য সরবরাহকারী খোরশেদ আলম। গত অক্টোবরে তাঁর ঠিকাদারির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এখন ডে কেয়ার কর্মকর্তা খাবার কেনাকাটা করেন।
ওই দিন বিকেলের খাবার না দিয়ে দুপুরে শিশুদের ছুটি দেওয়া হয়। দুপুরে ছুটির ফলে শিশুদের কোনো কোনো কর্মজীবী মা বিপাকে পড়েন।
গত নভেম্বর থেকে কেন্দ্রের ডে কেয়ার কর্মকর্তা শাহেদা আকতার খাবার কেনাকাটা করছেন। এই দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি শ্রীমঙ্গল উপজেলার মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা এবং মৌলভীবাজার জেলার উপপরিচালক ও জুড়ী উপজেলার মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
আইন অনুযায়ী ঠিকাদার ছাড়া ডে কেয়ারে কেউ খাদ্য সরবরাহ করতে পারে না। তিনি অধিদপ্তরের উপপরিচালকের স্বাক্ষরিত এক চিঠির সূত্রে খাদ্য কেনাকাটা করছেন বলে জানান।
শাহেদা আকতার বলেন, ‘ঠিকাদার খোরশেদ আলম নিয়মিত খাবার সরবরাহ করতে পারেননি। এখন আমাকেই বাজার করে শিশুদের খাওয়াতে হচ্ছে। ঠিকাদার নিয়োগ পর্যন্ত তো কাজ চালিয়ে যেতে হবে।’
ঠিকাদার খোরশেদ আলম সমকালকে বলেন, এখানে খাবার সরবরাহ করে তেমন লাভ নেই। ডে কেয়ার কর্মকর্তারা নিজেরাই খাবার কিনছেন।
সরকারি প্রতিবেদনেও অসংগতির তথ্য
রাজধানীর ফরিদাবাদ, নাখালপাড়া, কামরাঙ্গীরচর, উত্তরা, কল্যাণপুর, প্লানিং কমিশন, মগবাজার, মিরপুর, আজিমপুর কেন্দ্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা গেছে।
অধিদপ্তরের তদারকি কর্মকর্তাদের প্রতিবেদনেও নানা অনিয়ম ও সংকটের তথ্য এসেছে। তদারকি কর্মকর্তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিবাযত্ন কেন্দ্রে শিশু উপস্থিতি অনেক কম, পুরোনো বিছানা ও অপরিষ্কার স্থানে শিশুদের রাখা হয়। খেলনা নেই, কেন্দ্রের আয়তন কমপক্ষে তিন হাজার বর্গফুট হওয়ার নিয়ম থাকলেও ৮০০ থেকে এক হাজার ২০০ বর্গফুট আয়তনের বাসাবাড়িতে স্থাপন করা হয়েছে। সংকট রয়েছে বাথরুম, ঘুমানো ও খেলার জায়গার। কেন্দ্রগুলোতে বিনোদনের জন্য টিভি নেই। ফ্রিজ অনেক পুরোনো।
ফরিদাবাদ শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের তদারকি কর্মকর্তা বলেন, ‘বাথরুম, খেলনা, শিশু উপস্থিতিসহ অনেক সমস্যা পেয়েছি। সেগুলো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।’
সাভার কেন্দ্রের উপস্থিতি বেড়েছে অধিদপ্তরে
সাভার দিবাযত্ন কেন্দ্রে ৫০ শিশু রাখার ব্যবস্থা আছে। হাজিরা খাতা অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বর মাসে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ শিশু উপস্থিত ছিল। গড়ে ৪১ শিশু উপস্থিতির তথ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়। অধিদপ্তর থেকে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের চিফ অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসারের কার্যালয়ে যে তথ্য পাঠানো হয়েছে তাতে উপস্থিতি দেখানো হয় ৫১ জন।
জানতে চাইলে সাভারের ডে কেয়ার কর্মকর্তা রেজওয়ানা চৌধুরী বলেন, ‘উপস্থিতি তালিকা অধিদপ্তরে যাওয়ার পর কেউ কাটাকাটি করতে পারে না। এখন সেখানে কীভাবে কী হয়েছে, তা তো আমি বলতে পারব না।’
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের চিফ অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসার শামীম আহমদ উজ্জ্বল বলেন, ‘অধিদপ্তর থেকে যে তালিকা পাঠানো হয়, সে অনুযায়ী আমরা ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করি।’
গাবতলীতে বাস্তবের সঙ্গে নথির মিল নেই
রাজধানীর গাবতলী দিবাযত্ন কেন্দ্রে গত ৯ নভেম্বর গিয়ে পাঁচ শিশুকে পাওয়া যায়। দুপুরের মধ্যে তাদের ছুটি দেওয়া হয়। কিন্তু নভেম্বরে গড় উপস্থিতি দেখানো হয়েছে ৩৮ জন। নথিপত্রে, গাবতলী দিবাযত্ন কেন্দ্রে শিশু রাখা যাবে ৫০ জন। কিন্তু বাস্তবে ছোট দুটি রুমে ঘুমানোর ব্যবস্থা আছে ১০ থেকে ১৫ জন শিশুর। খাওয়ার জন্য ডাইনিংয়ে চেয়ার আছে পাঁচটি। খেলা ও পড়ালেখার জন্য আলাদা কোনো জায়গা নেই।
এ কেন্দ্রের আয়-ব্যয় দেখার দায়িত্বে আছেন অধিদপ্তরের উপপরিচালক কানিজ তাজিয়া। তিনি সিসি ক্যামেরায় শিশুদের প্রতিদিনের উপস্থিতি, হাজিরা খাতা ও খাদ্য বিল যাচাই করে বিল অনুমোদন করেন।
কর্মজীবী মা হুমায়রা বেগম সমকালকে বলেন, তাঁর স্বামী তাদের সন্তানকে সকাল ৯টায় গাবতলী দিবাযত্ন কেন্দ্রে দিয়ে যান। দুপুরে তিনি শিশুকে বাসায় নিয়ে যান। কেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচজন শিশু থাকে বলে জানান তিনি।
গাবতলীর ডে-কেয়ার কর্মকর্তা লায়লা আরজুমান বলেন, এটা আবাসিক এলাকা হওয়ায় শিশু উপস্থিতি কম হয়। তবে হেড অফিসের নির্দেশ আছে, দিবাযত্ন কেন্দ্রের তথ্য কাউকে দেওয়া যাবে না।
এ কেন্দ্রের খাদ্য সরবরাহকারী ব্রাদার এন্টারপ্রাইজের মালিক কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী আমি খাবার সরবরাহ করেছি। উপস্থিতি কত ছিল তা ডে-কেয়ার কর্মকর্তা জানেন।’ কামাল হোসেন মোহাম্মদপুর কেন্দ্রেও খাদ্য সরবরাহ করেন।
উপপরিচালক কানিজ তাজিয়া বলেন, ‘একাধিক দায়িত্বের কারণে প্রতিদিন পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করতে পারি না। তবে এখন থেকে খাদ্যের বিলের সঙ্গে শিশু উপস্থিতি যাচাই করে দেখব। চার-পাঁচজন শিশু থাকলে তারা উপস্থিতি ৩৮ জন দেখাতে পারবে না।’
আদাবর কেন্দ্রে ধারণক্ষমতার চেয়ে উপস্থিতি বেশি
রাজধানীর আদাবর শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র ১৬ নম্বর সড়কে সুনিবিড় হাউজিংয়ে ৯ থেকে ১৩ নভেম্বর শিশু উপস্থিত ছিল গড়ে ৪০ জন। তবে নভেম্বরে গড় উপস্থিতি দেখানো হয়েছে ৫৯ জন।
ডে কেয়ার কর্মকর্তা দুর্গা শর্মা বলেন, ‘এখানে ধারণক্ষমতা ৫০ শিশুর, উপস্থিতির বিষয়ে শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানাব।’ পরে আবার যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘অধিদপ্তরের নির্দেশ আছে, এ বিষয়ে তথ্য দেওয়া যাবে না।’
কেন্দ্রটির আয়তন ৯০০ বর্গফুটের মতো। একটি কক্ষে পড়াশোনা, একটিতে খাওয়া, একটি ঘুমের এবং একটি খেলার ঘর হিসেবে ব্যবহার হয়। আছে একটি টয়লেট ও একটি স্টোররুম। আর একটি কক্ষ ব্যবহার হয় দাপ্তরিক কাজে। কেন্দ্রটির প্রবেশের পথ ও ভেতরে পর্যাপ্ত আলো না থাকায় দিনের বেলায়ও বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানো ছিল। কেন্দ্রের প্রথম কক্ষে কোনো জানালা নেই, বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় বোঁটকা গন্ধ নাকে লাগে। দেয়ালে কোথাও জমেছে কালো ময়লা, কোথাও উঠে গেছে রং। মেঝেতে স্যাঁতসেঁতে ভাব। ভবনের বাইরে আবর্জনায় পোকা ও মাছি উড়ছে।
জানতে চাইলে উপপরিচালক কানিজ তাজিয়া বলেন, ‘দিবাযত্ন কেন্দ্রে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা কোনো রকমে চলছি।’ কেন্দ্রগুলোতে সাংবাদিকদের তথ্য দিতে না করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা স্পর্শকাতর জায়গা। শিশুদের বিষয়ে আমরা সবাইকে ভেতরে যেতে দিই না।’ তিনি জানান, দিবাযত্ন কেন্দ্রের জন্য ভালো বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায় না।
তামান্না ট্রেডিং করপোরেশনের মালিক কাজী সোহরাব হোসেন খাদ্য সরবরাহ করেন আদাবর, আজিমপুর মধ্যবিত্ত, কামরাঙ্গীচর ও প্রকল্পের পাঁচটি দিবাযত্নে। অভিযোগ আছে, তিনি কার্যাদেশের শর্ত অনুযায়ী খাদ্য সরবরাহ করেন না। সব পণ্য উন্নতমানের ও প্যাকেটজাত সরবরাহ করার কথা বলা হলেও বেশির ভাগ পণ্যের মান ভালো থাকে না।
ঠিকাদার কাজী সোহরাব হোসেন বলেন, ‘কার্যাদেশ অনুযায়ী মালপত্র না দিলে আপনি কর্তৃপক্ষকে বলেন। তারা ব্যবস্থা নেবে।’
সচিব দেখলেন ৪৫ জন, বিল করা হয়েছে ৫৭ শিশুর
গত ২৬ অক্টোবর মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ সচিব মমতাজ বেগম সিলেট দিবাযত্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন খাতায় তিনি লেখেন, ‘অদ্য ৪৫ জন বাচ্চা হাজির আছে। শুরু থেকে দুইজন গার্ডের পদ প্রায়শই শূন্য ছিল।’
তথ্য বলছে, এই কেন্দ্রে একজন ইনচার্জের পদ আছে, কিন্তু কর্মকর্তা নেই। আয়া ও শিক্ষক আছেন দুইজন করে চারজন। পাচক আছেন একজন। গার্ড ও ইনচার্জের পদ শূন্য থাকায় শিশুরা থাকে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে।
এই কেন্দ্রে অক্টোবরে গড়ে বিল করা হয়েছে ৫৭ জনের। নভেম্বরে গড়ে উপস্থিতি দেখানো হয়েছে ৬৪ জন শিশু। এখানে ধারণক্ষমতা ৬০ জনের।
দিবাযত্ন কেন্দ্রের চলতি দায়িত্বে থাকা সিলেটের উপপরিচালক শাহিনা আক্তার বলেন, ‘প্রতিদিন সমান উপস্থিতি থাকবে না। কম-বেশি হবেই। উপস্থিতি সংখ্যা যাচাই-বাছাই করে বলতে হবে।’ তিনি জানান, দিবাযত্নে কর্মচারীর সংখ্যা কম থাকায় অল্প টাকায় একজনকে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সদরদপ্তরে দ্বিগুণ বেশি উপস্থিতি
রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন রোডে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের সদরদপ্তরে একটি দিবাযত্ন কেন্দ্র আছে। গত ১২ নভেম্বর দুপুর বেলায় সেখানে গিয়ে দেখা যায়, শিশুরা মধ্যাহ্নভোজ শেষে ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেদিন ১৪ জন শিশু এসেছিল। এর মধ্যে পাঁচ শিশুকে দুপুরের পর ছুটি দেওয়া হয়।
কিন্তু অধিদপ্তরে শিশু উপস্থিতির তথ্য পাঠানো হয়েছে ৩৬ জনের। সে হিসেবে খাবারের বিল করা হয়। অধিদপ্তরের ডিজিসহ সব কর্মকর্তা এখানে অফিস করেন। অধিদপ্তরের শিশু দিবাযত্ন শাখা ও দিবাযত্নটি সপ্তম তলায় পাশাপাশি।
কাগজপত্রে এখানে শিশু ধারণক্ষমতা ৫০ জনের। ওই দিন দুজন অভিভাবক শিশু ভর্তি করাতে এলেও তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
কর্মজীবী মা মাহবুবা আক্তার মুনিয়া বলেন, ‘এখানে প্রতিদিন শিশু উপস্থিতি দেখা যায় ১০ থেকে ১২ জন। সর্বোচ্চ উপস্থিতি দেখেছি ১৮ থেকে ২০ জন।’
এই কেন্দ্রের ডে কেয়ার কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস লাবনী বলেন, এখানে ২০ জনের বেশি শিশু রাখার জায়গা নেই। তাই নতুন ভর্তি নেওয়া যায় না। উপপরিচালক কানিজ তাজিয়া বলেন, ‘দিবাযত্ন কেন্দ্রটি আমার রুমের পাশে, এটা সত্য। কিন্তু সব সময় ভেতরে গিয়ে তো দেখা হয় না।’
সচিবালয় কেন্দ্রে উপস্থিতির বেশি ২০ জন
বাংলাদেশ সচিবালয়ে অবস্থিত দিবাযত্ন কেন্দ্রে ৫ থেকে ৯ অক্টোবর সর্বোচ্চ উপস্থিতি ছিল ৫৫ জন। কিন্তু ওই মাসে গড়ে ৭৮ জন শিশুর বিল করা হয়েছে। গত ১০ ডিসেম্বর ছিল ৪৩ জন, গত ১ জানুয়ারি ৩৫ জন। এ সময়ও অতিরিক্ত ১৫ জন শিশুর বিল করা হয়েছে।
ডে কেয়ার কর্মকর্তা মাহফুজা খাতুন, ‘অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী হাজিরার হিসাব পাঠানো হয়। এর বেশি জানতে চাইলে অধিদপ্তর থেকে জেনে নিন।’
আজিমপুর কেন্দ্র নিয়ে ভয় দূর হয়নি
২০২৩ সালের ২০ ডিসেম্বর আজিমপুর দিবাযত্ন কেন্দ্রের টয়লেটের বালতির পানিতে ডুবে ১১ মাস বয়সী উম্মে আলিফা নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। এরপর শিশুর বাবা হাকিবুল হাসান বাদী হয়ে ডে কেয়ার কর্মকর্তাসহ ছয়জনের নামে মামলা করেন।
ঘটনার পর অধিদপ্তর থেকে তৎকালীন ডে কেয়ার কর্মকর্তা রেজিনা ওয়ালীকে সাময়িক বরখাস্ত ও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পর দিবাযত্নের কোনো কর্মীর শাস্তি হয়নি। ডে কেয়ার কর্মকর্তার বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার করা হয়।
আজিমপুরের বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী তবিবুর রহমান বলেন, ‘আজিমপুরে শিশু মৃত্যুর পর মনে আতঙ্ক কাজ করে। এখন মাসে ৭ হাজার টাকা দিয়ে সন্তানকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিবাযত্ন কেন্দ্রে রাখি।’
বিধিমালা চূড়ান্ত হয়নি
শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার বিষয়ে আইন হয় ২০২১ সালে। পরের বছর শিশু দিবাযত্ন বিধিমালার খসড়া তৈরি করা হয়। তবে বিধিমালা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
কেন্দ্রের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার বিষয়ে জানতে চাইলে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জিনাত আরা সমকালকে বলেন, ‘আমি আপনার দেখা বা কথার ওপর ভিত্তি করে কিছু বলতে পারব না। আমি আমার মতো করে দেখে তারপর কথা বলব।’
শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সদ্য নিযুক্ত মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন সমকালকে বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর সেবামূলক কাজগুলো নিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। সবকিছুর মধ্যে দুর্নীতি ঢুকে গেছে। এগুলোর প্রতিকার করা হবে।’
- বিষয় :
- মহিলা পরিষদ
