অগ্নিঝরা মার্চ
ঘরে ঘরে উড়েছে স্বাধীন বাংলার পতাকা
অমরেশ রায়
প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬ | ১১:৪৮
একাত্তরের ৯ মার্চ বাংলার ঘরে ঘরে উড়েছে সবুজ জমিনের মাঝে লাল সূর্যের ওপর বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত স্বাধীন বাংলার পতাকা। সরকারি ও আধা সরকারি ভবন এবং যানবাহনে উড়েছে কালো পতাকা। এদিনও মুক্তিসংগ্রামের উত্তাল সমুদ্রে ভেসেছে গোটা দেশ। হাতের মুঠোয় মৃত্যু নিয়েও বীর বাঙালি স্বাধীনতার জন্য প্রবল উদ্দীপনায় ছিল।
অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী দেশজুড়ে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। সচিবালয়সহ সব সরকারি ও আধা সরকারি অফিস, আদালত বন্ধ থাকে।
জনসাধারণের চলাচলের সুবিধার জন্য ট্রেন, লঞ্চ, বাস, ট্যাক্সি ও অন্য যানবাহন চালু থাকে। খোলা থাকে দোকানপাট ও হাটবাজার। সারাদেশে ব্যাংকিং কাজকর্মও চলে। তবে অভ্যন্তরীণ রুটে বন্ধ থাকে বিমান চলাচল।
এদিন সকালে ন্যাপপ্রধান মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ঢাকায় পৌঁছলে বঙ্গবন্ধু তাঁকে টেলিফোন করেন। ফোনে আলোচনার পর আওয়ামী লীগ ও ন্যাপের কেন্দ্রীয় নেতারা প্রায় আড়াই ঘণ্টা বৈঠক করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের জরুরি সভা থেকে জাতীয় সরকার গঠনের জন্য বঙ্গবন্ধুর প্রতি আহ্বান জানানো হয়। সভায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।
বিকেলে পল্টন ময়দানে ‘স্বাধীন বাংলা আন্দোলন সমন্বয় কমিটির’ উদ্যোগে আয়োজিত জনসভায় মওলানা ভাসানী ২৫ মার্চের মধ্যে সাত কোটি বাঙালিকে স্বাধীনতা দিতে ইয়াহিয়া খানকে আলটিমেটাম দেন। নতুবা তিনিও শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে এক হয়ে বাঙালির স্বাধীনতার জন্য সর্বাত্মক সংগ্রাম শুরু করার হুঁশিয়ারি দেন। মওলানা ভাসানী তাঁর ভাষণে আরও বলেন, ‘খামোকা কেহ মুজিবকে অবিশ্বাস করিবেন না, মুজিবকে আমি ভালো করিয়া চিনি।’
একই জনসভায় বাংলা লীগ প্রধান আতাউর রহমান খান বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশে বলেন, ‘আপনি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। আপনি স্বাধীন বাংলার জাতীয় সরকার ঘোষণা করুন।’
এদিকে, পূর্ব পাকিস্তানের এই উত্তাল সংগ্রামমুখর পরিস্থিতি বিদেশি রাষ্ট্রগুলোতেও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। জাতিসংঘের মহাসচিব উথান্ট প্রয়োজনে ঢাকা থেকে জাতিসংঘের স্টাফ ও তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য ঢাকার জাতিসংঘ উপ-আবাসিক প্রতিনিধিকে নির্দেশ দেন। জাপানের পররাষ্ট্র দপ্তরও ঢাকায় অবস্থিত তাদের নাগরিকদের প্রত্যাহার করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পশ্চিম জার্মানি সরকার তার দেশের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য সামরিক বিমান পাঠানোর সিদ্ধান্ত জানায়।
এদিকে ইসলামাবাদে সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়, ‘আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসবেন।’
সামরিক কর্তৃপক্ষ রাজশাহী শহরে প্রতিদিন রাত ৯টা থেকে আট ঘণ্টার কারফিউ জারি করে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কারফিউ জারির প্রতিবাদ জানিয়ে এক বিবৃতিতে বলা হয়, সেনাবাহিনীকে ছাউনিতে ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণার পর রাজশাহীতে হঠাৎ সান্ধ্য আইন জারির কারণ বোধগম্য নয়। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, সরকার এখনও সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়নি।
করাচিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ন্যাপপ্রধান ওয়ালী খান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার জন্য ঢাকায় আসার ঘোষণা করেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রাদেশিক আমির গোলাম আযম এক বিবৃতিতে দেশকে চরম বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়ার প্রতি আবেদন জানান।
একই দিন ইসলামাবাদে লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে পাকিস্তানের ‘খ’ অঞ্চলের (পূর্ব পাকিস্তান) সামরিক শাসক নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতিরা নবনিযুক্ত সামরিক গভর্নর জেনারেল টিক্কা খানের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা না করার সিদ্ধান্ত নেন।
- বিষয় :
- পতাকা
