ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

জামিন করিয়ে দিতে কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার ঘটনায় তোলপাড়

জামিন করিয়ে দিতে কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার ঘটনায় তোলপাড়
×

আমিনুল ইসলাম, সাইমুম রেজা

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৪৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

একজন পদত্যাগী প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে আসামিকে জামিন করিয়ে দিতে কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগের অডিও ফাঁস হওয়ার ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বিভাগ। অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখতে এরই মধ্যে পাঁচ সদস্যের একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর নিজেই এই তদন্ত কমিটির প্রধান। 
গতকাল মঙ্গলবার চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে বিষয়টি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর। 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় কারাগারে থাকা চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক এমপি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর আইনজীবী রিজওয়ানা ইউসুফের সঙ্গে কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে জামিন করানোর বিষয়ে প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারের কথোপকথনের একটি অডিও ফাঁস হয়। এক মিনিট ৩৬ সেকেন্ড এবং তিন মিনিট ৪২ সেকেন্ডের দুটি কল রেকর্ডে আর্থিক লেনদেনের পাশাপাশি প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ, আবদুল্লাহ আল নোমান, মইনুল করিম ও তানভীর হাসান জোহার নামও উঠে আসে। ঘুষের এই টাকা কয়েক কিস্তিতে পরিশোধের পরিকল্পনা হয়। এদিকে গত সোমবার ওই প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। এ নিয়ে আইন অঙ্গন ও প্রশাসনিক মহলে তোলপাড় দেখা দিয়েছে।

কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার ঘটনা জানাজানি হলে গতকাল সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে সব প্রসিকিউটরকে নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন চিফ প্রসিকিউটর। ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে হুঁশিয়ার করে তিনি বলেন, প্রসিকিউটরদের দায়িত্ব পালনে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না। এ ছাড়া এই মামলার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে সংশ্লিষ্ট আইন কর্মকর্তাকে ফোন করেন চিফ প্রসিকিউটর। 

চিফ প্রসিকিউটর যা বললেন
বৈঠকের পর দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। এ সময় এক সাংবাদিক জানতে চান, ঘুষ চাওয়ার বিষয়ে অডিও ফাঁসের ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের পুরো বিচার প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয় কিনা। জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, শতভাগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কোনো প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে অবশ্যই ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আমাদের ইমেজ সংকট হয়। তবে আমি আগেই বলেছিলাম, আমার কর্মকালে কোনো প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ন্যূনতম দুর্নীতির অভিযোগ এলে বরদাশত করা হবে না। তিনি আরও বলেন, মঙ্গলবার সকালে বৈঠক করে প্রত্যেক প্রসিকিউটরকে আমি একই কথা বলেছি। আমরা প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, প্রসিকিউশনের তরফে অভ্যন্তরীণ একটি কমিটি করে তদন্ত করা হবে। 

আমিনুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কাজ করতে হলে নির্লোভ হতে হবে। লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থাকতে হবে সবাইকে। এমন না হতে পারলে এখানে থাকার প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, আমরা এমন একটি সংবাদ খবরের কাগজে দেখেছি। এটা গুরুতর অভিযোগ। গণমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশিত হওয়ায় আমি খুবই ব্যথিত ও দুঃখিত। 
তিনি বলেন, আমাদের কোনো প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠার কথা ছিল না। যখন উঠেছে তাৎক্ষণিকভাবে আগেই এটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। আমরা এটা প্রশ্রয় কেন দিয়েছি জানি না। তবে এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ আসেনি। তিনি বলেন, যে অডিওটা এসেছে, যদি ফরমাল অভিযোগ আমার কাছে নাও আসে, চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় থেকে একটা অভ্যন্তরীণ তদন্ত আমরা করব। শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে আমাদের এই ট্রাইব্যুনাল গঠন হওয়ার পরে, সব বিষয় আমি আমার অভ্যন্তরীণ একটা কমিটি গঠন করে সবটাই তদন্ত করে দেখব। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করা হবে। 

এ সময় সাংবাদিকরা জানতে চান, এরই মধ্যে ট্রাইব্যুনালে তিনটি মামলার রায় হয়ে গেছে। আশুলিয়ার মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামি রায় ঘোষণার পর চিৎকার করে বলেন, ‘আমি টাকা দিতে পারিনি বলে অন্যজনকে রাজসাক্ষী করেছে এবং আমার কাছে টাকা চেয়েছিল, আমি দিতে পারিনি বলে আজকে আমার এই পরিণতি হয়েছে।’
এই অভিযোগ আমলে নেওয়ার সুযোগ আছে কিনা– জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমার যোগদানের আগের যদি কোনো ঘটনা থাকে, এটা অনলাইন মাধ্যম হোক, ফরমাল চার্জ হোক, আমি সবগুলোর বিষয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত করে দেখব। 

আগের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের সময়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ওনার ব্যর্থতা সফলতাটা তো আমি মূল্যায়ন করতে পারব না। তবে প্রশ্নটা হচ্ছে যে, পার্টিকুলার যে অভিযোগটা এসেছে, এই বিষয়ে সাবেক চিফ প্রসিকিউটরের নলেজে আছে কিনা, তিনি কী ব্যবস্থা নিয়েছেন, এ ব্যাপারে তাঁর সাহায্য চাইব।

কে এই সাইমুম রেজা
সাইমুম রেজা বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ছিলেন। তিনি ঢাকার নাগরিক সমাজে পরিচিত মুখ। ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ও সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ হলেও ট্রাইব্যুনালে নিয়োগ পাওয়ার আগে তাঁর মামলা পরিচালনার অভিজ্ঞতা খুব কম ছিল। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন সাইমুম। তাঁর স্ত্রী একজন সেনা কর্মকর্তা। 

আরও পড়ুন

×