ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আদেশ অনুযায়ী ১৫ মার্চ শেষ সময়

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন অনিশ্চিত

শপথ নেবে না বিএনপি

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন অনিশ্চিত
×

ফাইল ছবি

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬ | ০৮:৩৫ | আপডেট: ১৪ মার্চ ২০২৬ | ০৯:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী নির্বাচিত এমপিদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ এখনও গঠন করা হয়নি। আদেশ অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। এই সময়সীমা শেষ হবে ১৫ মার্চ। এই সময়সীমা পার হওয়ার পর কী হবে, তা নিশ্চিত নয়। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংস্কার সংলাপে বিএনপির নেতৃত্ব দেওয়া সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে আরোপিত আদেশ এক দিনে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। 

এর আগে তিনি গত ১৩ নভেম্বর জারি করা জুলাই সনদের বাস্তবায়ন আদেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। গত মঙ্গলবার বলেন, আদেশটি স্ত্রীলিঙ্গ বা পুংলিঙ্গ, তাই তো বুঝি না। সংবিধান কার্যকরের পর আদেশ জারির আর সুযোগ নেই।

তবে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এই বক্তব্য নাকচ করেছেন। তিনি সমকালকে বলেন, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিরোধী জোটসহ ৭৮ এমপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়েছেন। এর মাধ্যমে পরিষদ গঠন হয়ে গেছে। পরিষদের কোরাম ৬০ জন সদস্য হলেও হয়ে যাবে। কোরামের চেয়ে বেশি সদস্য শপথ নেওয়ায় ১৫ মার্চের মধ্যে অধিবেশন না হলেও সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত পরিষদ বিলুপ্ত হবে না। যারা জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও জুলাই সনদকে সম্মান করে না, তারাই পরিষদকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। ১৫ মার্চের পর আদেশে বর্ণিত পরিষদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে মন্তব্য করেনি বিএনপি। 

গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন আদেশের ওপর গণভোট হয়। ৬৮ শতাংশের বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোটে আদেশটি অনুমোদিত হয়। আদেশ অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে জুলাই সনদের ৪৮ সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের ৩৮টি বাস্তবায়ন করতে হবে। বাকি ১০টি বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক নয়। দলগুলো নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) অনুযায়ী, এসব সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে পারবে।

গণভোটের প্রশ্নে ছিল, সনদে বর্ণিত পদ্ধতির আলোকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, ন্যায়পাল এবং দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন বাদে বাকি সংস্কারগুলোতে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। 

আদেশে বলা হয়, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংসদ নির্বাচনের ভোটের অনুপাতে (পিআর) সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন করতে হবে। ১০০ আসনের এই উচ্চকক্ষের অনুমোদন নিতে হবে সংবিধান সংশোধনে। বিএনপি উচ্চকক্ষ গঠনে রাজি হলেও পিআর এবং সংবিধান সংশোধনে অনুমোদন দিতে একমত নয়। ৩০টি সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ সব দল একমত ছিল। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় আদেশ অনুযায়ী এগুলো বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।   

সংসদ নির্বাচনে ৫১ শতাংশ ভোট পেয়ে ২০৯ আসনে জয়ী বিএনপির ভাষ্য, জনগণ তাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী সংস্কারের। তবে জামায়াত এই ভাষ্যকে নাকচ করছে। দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, বিএনপির চেয়ে অনেক বেশি ৬৮ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। দেশের মালিক হিসেবে তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে সম্মতি দিয়েছে। সুতরাং, আদেশ অনুযায়ী সংস্কার করতে হবে। 

গণঅভ্যুত্থানের অভিপ্রায়ের ক্ষমতাবলে জারি করা আদেশে বলা হয়েছে, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নবনির্বাচিত এমপিদের নিয়ে ১৮০ কার্যদিবস মেয়াদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। এই পরিষদ অনুযায়ী, সনদে বর্ণিত উপায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার; নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য কমিশন এবং চলতি সংসদেই উচ্চকক্ষ গঠনের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করবে। যে ৩০ সংস্কার প্রস্তাবে সব দলের ঐকমত্য হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে পরিষদকে।

আদেশের ১০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের ৩০ দিনের সংসদ অধিবেশন আহ্বানের অনুরূপ পদ্ধতিতে পরিষদের আহ্বান করতে হবে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রপতি পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করবেন।

আদেশের ৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচিত এমপিদের যিনি যে পদ্ধতিতে শপথ পাঠ করিয়েছেন, একই পদ্ধতিতে তারা পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন। বিএনপি বলছে, সংবিধানে পরিষদের বিধান অন্তর্ভুক্ত ছাড়া শপথ সম্ভব নয়। 

গণভোট আয়োজনে গত ২৫ নভেম্বর অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী, আদেশের ওপর গণভোট হয়েছে। ইতোমধ্যে গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট হয়েছে। গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ কেন অবৈধ হবে না– জানতে চেয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. তাহের সমকালকে বলেন, আদেশ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি অধিবেশন আহ্বান করবেন। তা তিনি না করে গণভোটকে অগ্রাহ্য করেছেন। পরিষদ বাস্তবায়নে সংসদের ভেতরে-বাইরে তৎপর থাকবে বিরোধী দল।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংস্কারের জন্য পরিষদ গঠন না করায় জামায়াত ডেপুটি স্পিকারের পদ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ১ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের চা চক্রে বিরোধী দলকে জুলাই সনদ অনুযায়ী ডেপুটি স্পিকারের পদ দেওয়ার প্রস্তাব দেয় সরকার। তবে পুরো সনদ বাস্তবায়ন ছাড়া এই পদ নিতে চায় না জামায়াত।

হামিদুর রহমান আযাদ সমকালকে বলেন, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি যেভাবে সংসদ বিলুপ্ত করেছিলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ করেছিলেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদন ছাড়া ১০৬ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিয়েছিলেন, এগুলোর সাংবিধানিক বৈধতা নেই। বৈধতা একমাত্র জুলাই গণঅভ্যুত্থান। যা গণভোটে অনুমোদন হয়েছে। গণভোট অস্বীকার করলে নির্বাচন, সরকার, সংসদ সবই অবৈধ। তাই পরিষদ গঠন করে গণভোটের ফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারই বৈধতার একমাত্র পথ।

আরও পড়ুন

×