বাঙালির সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধের সূচনা
অমরেশ রায়
প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
আজ ১৯ মার্চ। একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চের এ দিনেই শুরু হয় বাঙালির প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ। ঢাকার অদূরে গাজীপুরে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে পথে নামে সংগ্রামী জনতা।
গাজীপুরের এই জনযুদ্ধ চলমান অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে যোগ করে নতুন মাত্রা। এর আগে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি সেনা ও জনতার মধ্যে বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও এ দিনই প্রথম শুরু হয় সংগ্রামী জনতার সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ।
এ দিন সকালে হঠাৎ করেই জয়দেবপুর ও গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে জনসাধারণ ও বাঙালি সৈনিকদের তীব্র সংঘর্ষ বেধে যায়। জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্ট এবং গাজীপুর অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি এলাকার অসহযোগ আন্দোলনরত বাঙালিদের ওপর গুলি চালানোর জন্য ৫৭ নম্বর ব্রিগেডের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জাহান জাব আরবার দ্বিতীয় ব্যাটালিয়নকে আদেশ দেন। আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানান বাঙালি জওয়ান ও অফিসাররা। দ্বিতীয় ব্যাটালিয়নকে নিরস্ত্র করার পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাদের চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।
কেবল আদেশ অমান্য করাই নয়, দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ করে বসে। বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন মেজর সফিউল্লাহ। গাজীপুর অর্ডন্যান্স ফাক্টরির বাঙালি কর্মচারী, জয়দেবপুর চৌরাস্তা ও আশপাশের গ্রামবাসী, দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি জওয়ান ও অফিসার এবং টঙ্গী শিল্প এলাকার শ্রমিকরা শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলেন পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে। এ সময় পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে হুরমত, নিয়ামত, মনু খলিফাসহ অর্ধশত মানুষ শহীদ ও দুই শতাধিক আহত হন। বিক্ষুব্ধ মানুষ জয়দেবপুর থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত আড়াই মাইল রাস্তা ইট ও কাঠের গুঁড়ি ফেলে শত শত ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। লাঠি ও বন্দুক নিয়ে প্রতিহত করে পাকিস্তানি বাহিনীকে। রচিত হয় বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনে বাঙালির সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রামের প্রথম ইতিহাস।
সন্ধ্যায় সেনাবাহিনী গাজীপুরে অনির্দিষ্টকালের জন্য সান্ধ্য আইন জারি করে এবং খোয়া যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র অনুসন্ধানের নামে নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষের ওপর পাশবিক অত্যাচার চালায়। গ্রামে গ্রামে ও বাড়ি বাড়ি ঢুকে নির্যাতন করে নারী-পুরুষকে। জয়দেবপুর ও গাজীপুরে দিনভর এই সশস্ত্র যুদ্ধে বাঙালির ওপর পাকিস্তানি সেনাদের পাশবিক নির্যাতনের ঘটনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক বিবৃতিতে প্রচণ্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘তারা (সামরিক জান্তা) যদি মনে করে থাকে যে, বুলেট দিয়ে জনগণের সংগ্রাম বন্ধ করতে সক্ষম হবে, তা হলে তারা আহম্মকের স্বর্গে বাস করছে। জনগণ যখন রক্ত দিতে তৈরি হয়, তখন তাদের দমন করতে পারে এমন শক্তি দুনিয়ায় নেই।’
এদিকে, সকালে যখন জয়দেবপুর ও গাজীপুরে চলছিল পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে বাঙালির সশস্ত্র যুদ্ধ, ঠিক তখন ঢাকার প্রেসিডেন্ট হাউসে চলছিল মুজিব-ইয়াহিয়া তৃতীয় দফার বৈঠক। কোনো সমাধান ছাড়াই সেদিনও মুলতবি হলো বৈঠক।
বৈঠকে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরামর্শদাতাদের পক্ষ থেকে তিনটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এগুলো হচ্ছে–এক. প্রেসিডেন্সিয়াল ঘোষণায় সামরিক আইনের শাসন প্রত্যাহার করে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক। দুই. কেন্দ্রে আপাতত ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বে সরকার থাকতে পারে। প্রদেশগুলোতে অবিলম্বে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সরকার গঠন করবেন। তিন. পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রস্তাবিত পার্লামেন্টের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা পৃথকভাবে মিলিত হয়ে ছয় দফার ভিত্তিতে খসড়া সংবিধানের সুপারিশ করবে এবং সংসদের আনুষ্ঠানিক অধিবেশনে তা চূড়ান্ত করা যেতে পারে।
৯০ মিনিটের এই বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার ব্যাখ্যা জানতে চান ইয়াহিয়া। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘‘শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের সময়েও কলেমা পাঠের সঙ্গে ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ করব আমি।’’ পরে সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধুর তিন পরামর্শদাতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ এবং ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন ইয়াহিয়ার পরামর্শদাতারা।
- বিষয় :
- যুদ্ধের প্রস্তুতি
