ভয়াল ২৫ মার্চ আজ
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও আমাদের দায়
একাত্তরের গণহত্যা
ডা. সারওয়ার আলী
ডা. সারওয়ার আলী
প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬ | ০৮:২৯ | আপডেট: ২৫ মার্চ ২০২৬ | ১০:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
পাকিস্তানের ২৩ বছরের শাসনামলে সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে এ অঞ্চলের মানুষ কখনোই অবাধভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়নি। দীর্ঘ সংগ্রাম ও গণতন্ত্রের দাবির মধ্য দিয়ে যখন নির্বাচনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষের দল বিজয়ী হলো, তখন সংবিধান ও নিয়ম অনুযায়ী তাদেরই সরকার গঠনের অধিকার ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক সরকার সেই গণরায় মেনে নেয়নি। তারা মনে করেছিল, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক নীতি পাকিস্তানের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এই অজুহাতে তথাকথিত বিদ্রোহ দমনের নামে শুরু হয় ইতিহাসের এক ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ।
বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে যা ঘটেছিল, তা কেবল একটি ব্যাপক হত্যাকাণ্ড নয়, আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী এটি একটি জাতিকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত গণহত্যা বা ‘জেনোসাইড’। এ হত্যাযজ্ঞে নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠীকে বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু করা
হয়েছিল। বস্তির সাধারণ মানুষ, যারা মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে হত্যা করা হয় দেশের বুদ্ধিজীবীদের, যারা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে কেমন রাষ্ট্র গড়ে উঠবে, সে বিষয়ে মানুষের মধ্যে চেতনা জাগিয়ে তুলেছিলেন।
এ হত্যাকাণ্ডের আরেকটি বড় লক্ষ্যবস্তু ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ। পাকিস্তানি শাসকদের ধারণা ছিল, ইসলামী পাকিস্তানের মতাদর্শের বিরুদ্ধে ভারত ও হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রভাবেই এ দেশের মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে এবং আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকেছে। ফলে পরিকল্পিতভাবে তাদের ওপর নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।
এ কারণেই আন্তর্জাতিক পরিভাষায় ১৯৭১ সালের ঘটনাকে শুধু গণহত্যা বলা যথেষ্ট নয়; এটিকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে শহীদের সংখ্যা নিয়ে আজও নানা বিতর্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে আমরা যে ৩০ লাখ শহীদের কথা বলি, সেই সংখ্যাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক জিইয়ে রাখার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
একজন জেনোসাইড বিশেষজ্ঞের মতে, পৃথিবীর বিভিন্ন গণহত্যার ক্ষেত্রে সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা প্রায়ই কঠিন হয়ে পড়ে। তবে সংখ্যার বিতর্কে গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতাকে খাটো করে দেখা আত্মঘাতী। এ বিষয়ে সবার সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।

আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত অল্প সময়ের মধ্যে এত মানুষের হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই ঘটেছে। এ কারণে এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এ ক্ষেত্রে একটি বড় সুসংবাদ হলো, সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসে একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে, যাতে ১৯৭১ সালের গণহত্যাকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।
শুধু আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ওপর নির্ভর করলেই চলবে না। এ বিষয়ে রাষ্ট্রের যেমন করণীয় রয়েছে, তেমনি দেশের সাধারণ মানুষেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আছে। রাষ্ট্রের করণীয় তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘের মাধ্যমে একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে, যার মাধ্যমে ১৯৭১ সালের গণহত্যা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করতে পারে।
অন্যদিকে দেশের মানুষের ওপরও একটি সর্বজনীন দায়িত্ব বর্তায়। যারা এ গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন, তাদের উচিত সেই ভয়াবহ স্মৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা। কারণ ইতিহাস যদি বলা না হয়, তবে তা ধীরে ধীরে বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যেতে পারে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে এমন কোনো শহর বা গ্রাম নেই, যেখানে হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়নি বা যেখানে গণকবর নেই। তাই বিষয়টি শুধু বিচার চাওয়ার প্রশ্ন নয়; এটি মানবতার ইতিহাসে অন্যতম নিষ্ঠুর, অমানবিক এবং নৃশংস ঘটনার স্মারক।
বাংলাদেশকে যদি একটি মানবিক সমাজ হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে গণহত্যার স্মৃতি আমাদের সম্মিলিতভাবে ধারণ করতে হবে। মানুষ যখন এই ইতিহাস স্মরণ করবে, তখন যেন সবাই নিজের দায়িত্বটি উপলব্ধি করে। তবেই জাতি হিসেবে আমাদের আজকের কর্তব্য পূরণ হবে এবং একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার পথ আরও সুদৃঢ় হবে।
অনুলিখন: দ্রোহী তারা
- বিষয় :
- একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ
