১ হাজার ১২৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ মামলার আসামি মাসুদ উদ্দিন
তার বিরুদ্ধে মানব পাচারসহ দুদকের চার মামলা
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী
হকিকত জাহান হকি
প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬ | ০৯:১৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
এক-এগারোর সময়ের আলোচিত সামরিক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে ১ হাজার ১২৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মানব পাচার মামলায় আসামি করা হয়েছে। এই অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা চার মামলাতেই আসামি করা হলো তাঁকে। তিনি রিক্রুটিং এজেন্সি ফাইভ-এম ইন্টারন্যাশনালের মালিক।
মাসুদ উদ্দিন ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে বিদেশগামী কর্মীদের কাছ থেকে সরকারি ফি’র চেয়ে বাড়তি পাঁচগুণ বেশি অর্থ নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম সমকালকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
দুদকের তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ আমলের সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালও তাঁর মালিকানাধীন রিক্রুটিং এজেন্সি মেসার্স ওরবিটাল এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে মানব পাচারে যুক্ত ছিলেন। সাবেক এই অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে মাসুদ উদ্দিনের সখ্য ছিল। মানব পাচারে জড়িত আরও রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকের সঙ্গে মাসুদ উদ্দিনের ব্যবসায়িক ঘনিষ্ঠতা ছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এক-এগারোর সময় মাসুদ উদ্দিন দোর্দণ্ড প্রতাপে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। তখনই তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ ওঠে। তিনি দ্বাদশ সংসদে ফেনী-৩ আসনে জাতীয় পার্টির এমপি ছিলেন। ওই সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতারণা, জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি জনশক্তি রপ্তানির নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়েছেন।
দুদক সূত্র জানায়, প্রতারণার মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় মানব পাচার করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে আ হ ম মুস্তফা কামালসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত চারটি মামলা হয়েছে। ওই ৩২ জনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আসামি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ১২ রিক্রুটিং এজেন্সির ৩২ মালিক-কর্মকর্তা সরকার নির্ধারিত ফি ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার জায়গায় ৬৭ হাজার ৩৮০ বিদেশগামী কর্মীর কাছ থেকে পাঁচগুণ অর্থ নিয়েছেন।
ওই ১২টি রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে মেসার্স ওরবিটাল এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে ৬ হাজার ২৯ প্রবাসীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০০ কোটি ৯৮ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আ হ ম মুস্তফা কামাল ও তাঁর স্ত্রী কাশমিরি কামাল। মেসার্স ওরবিটাল ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে ২ হাজার ৯৯৫ জন থেকে অতিরিক্ত ৫০ কোটি ১৬ লাখ ৬২ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির আরেক মালিক আ হ ম মুস্তফা কামালের মেয়ে নাফিসা কামাল। তাঁকেও মামলায় আসামি করা হয়েছে।
স্নিগ্ধা ওভারসিজ লিমিটেডের মাধ্যমে ৬ হাজার ৬৫৭ জন প্রবাসীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ১১১ কোটি ৫০ লাখ ৪৭ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী, তাঁর স্ত্রী নুরজাহান বেগম, শেখ আব্দুল্লাহ, জাহাঙ্গীর আলম, এম আমিরুল ইসলাম, জসিম উদ্দিন ও মো. জিয়াউর রহমান ভূইয়া। তারাও আসামির তালিকায় রয়েছেন।
বিনিময় ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে ৫ হাজার ৪৫৮ জন থেকে অতিরিক্ত ৯১ কোটি ৪২ লাখ ১৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুস সোবহান ভূইয়া ও তাঁর স্ত্রী তাসলিমা আক্তার। তারাও মামলার আসামি। ফাইভএম ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে ৭ হাজার ১২৪ জন প্রবাসী থেকে অতিরিক্ত ১১৯ কোটি ৩২ লাখ ৭০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, নূর মোহাম্মদ আবদুল মুকিত, মেহবুবা আফতাব সাথী, মাসুদ উদ্দিনের মেয়ে তাসনিয়া মাসুদ আসামি। তারাও আসামির তালিকায় রয়েছেন। মেসার্স ইউনিক ইস্টার্ন প্রাইভেট লিমিটেডের মাধ্যমে ৩ হাজার ৭৮৮ জন থেকে ৬৩ কোটি ৪৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোহা. নুর আলী, তাঁর স্ত্রী সেলিনা আলী, মেয়ে নাবিলা আলী, নাছির উদ্দিন আহমেদ, সাবেক সচিব খোন্দকার শওকত হোসেনকে আসামি করা হয়েছে।
ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের মাধ্যমে ৭ হাজার ৭৮৭ জন থেকে অতিরিক্ত ১৩০ কোটি ৪৩ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এই অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোহাম্মদ রুহুল আমিন এবং তাঁর স্ত্রী লুৎফুর নেছা শেলীকে আসামি করা হয়েছে।
এছাড়া মেসার্স আহমদ ইন্টারন্যাশনাল, বিএম ট্রাভেলস লিমিটেড, বিএনএস ওভারসিজ লিমিটেড, রুবেল বাংলাদেশ লিমিটেড ও দ্য ইফতী ওভারসিজ নামের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজগে ২৭ হাজার ৫৪২ জন প্রবাসীর কাছ থেকে ৪৬১ কোটি ৩২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৯ জনকে আসামি করেছে দুদক।
- বিষয় :
- আত্মসাৎ
