গান, কবিতা ও সংহতির বিস্তৃত ইতিহাস
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ | ০৮:৪১ | আপডেট: ২৮ মার্চ ২০২৬ | ১৫:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের ভেতরে সবুজে ঘেরা এক শান্ত বিকেলে যেন ফিরে দেখা হলো একাত্তরের বিশ্বজনীন ইতিহাস। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও যে ইতিহাস শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং বিশ্বমানবতার। তারই দলিল হয়ে উঠেছে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের বই ‘ভালোবাসায় বাড়ানো হাত: মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি লেখক-শিল্পী বন্ধু।’
এই বইকে কেন্দ্র করে আয়োজিত আলোচনা, সংগীত ও প্রদর্শনী যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একা ছিল না; এর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বিশ্বজুড়ে শিল্পী, কবি ও বুদ্ধিজীবীরা।
স্বাধীনতা দিবসের পরদিন রাজধানীর ধানমন্ডিতে বেঙ্গল শিল্পালয়ের সাততলার খোলা ছাদে অনুষ্ঠিত হয় ‘আলাপে-বিস্তারে’ শিরোনামের এই আয়োজন। বিকেলের আলো ম্লান হতে না হতেই জমে ওঠে ভিন্নধর্মী এক পরিবেশ। যেখানে আলোচনার পাশাপাশি প্রদর্শনী ও সংগীত মিলেমিশে তৈরি করে এক নান্দনিক আবহ।
সাততলার খোলা ছাদে চোখে পড়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন আন্তর্জাতিক সংহতির নানা নিদর্শন। সুসজ্জিত টেবিল ও ডিসপ্লে বোর্ডে সাজানো ছিল জর্জ হ্যারিসনের ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর ভিনাইল রেকর্ড, তাঁর স্ত্রী অলিভিয়া হ্যারিসনের স্বাক্ষর করা একটি রেকর্ডও।
পাশাপাশি ছিল জোয়ান বায়েজের ‘সং অব বাংলাদেশ’-এর লং প্লে, তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই, ‘কনসার্ট ফর সিমপ্যাথি’র ব্রুশিয়ার ও আলোকচিত্র, ‘গুডবাই সামার কনসার্ট’-এর ছবি। আরও ছিল পণ্ডিত রবি শঙ্কর, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, এ্যালেন গিন্সবার্গ এবং আন্দ্রেই ভোজনেস্কির আলোকচিত্র। যারা প্রত্যেকে কোনো না কোনোভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কণ্ঠ মিলিয়েছিলেন। কলকাতা ও মুম্বাইয়ের শিল্পীদের বিভিন্ন উদ্যোগের ছবিও ছিল; যা প্রমাণ করে ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে কীভাবে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল পাকিস্তান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।
বইটি নিয়ে আলোচনার জন্য উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক, সংগীত শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী এবং প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় এ্যালেন গিন্সবার্গের বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ আবৃত্তির মধ্য দিয়ে। কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তি যেন একাত্তরের শরণার্থী জীবনের বেদনা, ক্ষুধা ও অসহায়ত্বকে নতুন করে অনুভব করায়। মুহূর্তেই অনুষ্ঠানস্থলের পরিবেশ হয়ে ওঠে আবেগঘন, গম্ভীর। কবিতাটি আবৃত্তি করেন তাহসিন রেজা। কবিতাটি অনুবাদ করেন খান মোহাম্মদ ফারাবী।
এরপর বক্তব্য দেন বইটির লেখক মতিউর রহমান। তিনি তাঁর দীর্ঘ অনুসন্ধানের কথা তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় শিল্পী, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা এক ধরনের ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭০-৭১ পর্যন্ত সময়জুড়ে সাংস্কৃতিক আন্দোলনই বাঙালির রাজনৈতিক চেতনার ভিত তৈরি করেছে। এই শক্তি শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ভারত, নিউইয়র্ক, লন্ডনসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল।
মতিউর রহমান বলেন, ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে আগরতলায় অবস্থানকালে প্রথম ‘বাংলাদেশ কনসার্ট’-এর একটি ছোট সংবাদ তাঁর নজরে আসে। তখন বিষয়টি নিয়ে তেমন বিস্তারিত জানা না গেলেও স্বাধীনতার পর লন্ডন থেকে আসা এক বন্ধুর কাছে সেই কনসার্টের রেকর্ড হাতে পেয়ে তাঁর আগ্রহ আরও বাড়ে। সেখান থেকেই শুরু হয় বিশ্বজুড়ে শিল্পীদের সংহতির ইতিহাস অনুসন্ধানের যাত্রা। তিনি বলেন, ‘এই অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখেছি, বিশ্বের নানা প্রান্তের শিল্পীরা শুধু সহানুভূতি দেখাননি, বরং সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়ে তুলেছেন।’
২০২২ সালে প্রথমা প্রকাশনী থেকে বইটি প্রকাশিত হয়। বইটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য একটি দলিলস্বরূপ। এতে থাকা আটটি অধ্যায়ের মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেছেন জর্জ হ্যারিসন ও রবি শঙ্করের উদ্যোগে আয়োজিত ঐতিহাসিক কনসার্টের পাশাপাশি ‘গুডবাই সামার কনসার্ট’ এবং লন্ডনের ‘কনসার্ট ইন সিমপ্যাথি ১৯৭১’-এর বিস্তারিত তথ্য। এ ছাড়া রয়েছে জোয়ান বায়েজের গান ‘সং অব বাংলাদেশ’ রচনার পটভূমি, আর্জেন্টিনায় ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর উদ্যোগ এবং নিউইয়র্কে এ্যালেন গিন্সবার্গ ও আন্দ্রেই ভোজনেস্কির কবিতা পাঠের ঘটনাও।
মফিদুল হক বলেন, ষাটের দশকে তৃতীয় বিশ্বের প্রগতিশীল আন্দোলনের মধ্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি বিশেষ উচ্চতা অর্জন করেছিল এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে এক গভীর অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল। তিনি উল্লেখ করেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশ্বের নানা প্রান্তের সাধারণ মানুষও বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন। যার অনেক ঘটনা এখনও অজানা। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, মুম্বাইয়ের রেলস্টেশনের জুতো পালিশ করা নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষরা তাদের এক দিনের উপার্জন মুক্তিযুদ্ধের জন্য দান করেছিলেন।
মফিদুল হক বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত বা বিতর্কিত করার কিছু প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, কিন্তু এ ধরনের অপচেষ্টায় ইতিহাসের মর্যাদা নষ্ট হবে না। বরং বর্তমান বিশ্বে মানবিকতার অবক্ষয় ও বিভাজনের রাজনীতির মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের মানবিক চেতনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সৈয়দ আব্দুল হাদী তাঁর বক্তব্যে বলেন, বইটি পড়ে তিনি গভীরভাবে মুগ্ধ হয়েছেন। তাঁর মতে, এটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতারও এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তিনি বলেন, লেখকের যে পরিমাণ শ্রম, নিষ্ঠা এবং খুঁটিনাটি তথ্যের প্রতি মনোযোগ, তা সত্যিই বিস্ময়কর।
সৈয়দ আব্দুল হাদী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের ভেতরেও ‘বিক্ষুব্ধ লেখক সমাজ’ ও ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’-এর মতো সংগঠন গড়ে উঠেছিল। বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। এসব বিষয় নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
সাজ্জাদ শরিফ তাঁর বক্তব্যে বলেন, বিশ্বের অনেক জাতি সভ্যতার উত্তরাধিকার স্বাভাবিক ধারায় পেলেও বাংলাদেশের মানুষকে তা অর্জন করতে হয়েছে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। এই কারণে মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষের কাছে শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং একটি অস্তিত্বের ভিত্তি।
প্রত্যেকের বক্তব্যেই উঠে আসে ১৯৭১ সালের মার্চের সেই ভয়াবহ দিনগুলোর স্মৃতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে গণহত্যা, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগ। স্মরণ করা হয় মুনীর চৌধুরী, গোবিন্দ চন্দ্র দেব, আনোয়ার পাশা, আলতাফ মাহমুদ, শহীদুল্লা কায়সারের মতো শহীদদের অবদান।
আলোচনার পর সংগীত পরিবেশন করেন ওয়ার্দা আশরাফ। দরাজ কণ্ঠে তিনি পরিবেশন করেন পণ্ডিত রবি শঙ্করের ‘ও ভগবান খোদা তায়ালা’, জর্জ হ্যারিসনের ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ এবং জোয়ান বায়েজের গান ‘বাংলাদেশ’ গান তিনটি। যে গানগুলো একসময় বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়ে তুলেছিল।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক, অভিনেতা আফজাল হোসেন, সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সভাপতি আবুল খায়ের লিটু, আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন, কথাসাহিত্যিক ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক, কথাসাহিত্যিক আফসানা বেগম, পারভেজ হোসেন, শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক শাখাওয়াত টিপু, শিল্পী কৃষ্ণকলি ইসলাম, বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী প্রমুখ।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর হেড অব কালচারাল গ্রোগ্রাম কবির বকুল।
- বিষয় :
- ইতিহাস
