এসপিএম প্রকল্পের অচল অবস্থার মধ্যে দরপত্র বিতর্ক
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ০৮:৩৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
নির্মাণ শেষ হলেও পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণে ঠিকাদার নিয়োগ না হওয়ায় ৮ হাজার কোটি টাকার ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম)’ প্রকল্পটি কোনো কাজে আসছে না। এরমধ্যে ঠিকাদার নিয়োগের আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ৩০ আগস্ট শুরু হয়েছিল। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সমুদ্রে অপেক্ষমাণ বড় ট্যাঙ্কার থেকে পাইপের মাধ্যমে সরাসরি জ্বালানি তেল খালাস করা যায়। উদ্দেশ্য ছিল তেল খালাসে সময় ও খরচ কমানো। প্রকল্পের নির্মাণ (ইপিসি) কাজ করে চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড (সিপিপিইসি)। তবে পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণে ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে বিলম্বিত হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হলেও পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ঠিকাদার না থাকায় এখনও এটি চালু করা যায়নি। জানা গেছে, সিপিপিইসিকে প্রকল্পের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনাও এগিয়ে গিয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সেই আলোচনা থেমে যায়।
অন্তর্বর্তী সরকার দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করে বিপিসি। গত বছরের ৩০ এপ্রিল আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। দুটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখালেও প্রস্তাবিত মূলধন বিপিসির অনুমিত ব্যয়ের চেয়ে ৫১ শতাংশ বেশি হওয়ায় কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া যায়নি। গত ১৭ সেপ্টেম্বর দরপত্র বাতিল করা হয়। এরপর ফের আন্তর্জাতিক দরপত্র ডাকা হয়।
প্রকল্পের অবকাঠামোতে কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমে ভাসমান মুরিং স্থাপন করা হয়েছে। সাগরের তলদেশে ১১০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে; যা মহেশখালী স্টোরেজ ট্যাঙ্ক থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইআরএল) পর্যন্ত পৌঁছে। এছাড়া পাম্পিং স্টেশন, তিনটি অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল ট্যাঙ্ক, বুস্টার পাম্প এবং জেনারেটর অন্তর্ভুক্ত। প্রকল্প চালু হলে এক লাখ টন তেল খালাসে ২৪ ঘণ্টা লাগবে, যা বর্তমানে সনাতন পদ্ধতিতে করতে ১০-১১ দিন লাগে। এছাড়া এই পদ্ধতিতে বিস্ফোরণের ঝুঁকি ও অপচয়ও বেশি।
দ্বিতীয় দফা দরপত্রের প্রস্তাব জমা দেওয়ার তারিখ নির্ধারণ করা হয় ১৭ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচনের মাত্র ৫ দিন পরে এবং নতুন মন্ত্রিসভার শপথের দিন তারিখ হওয়ায় দরপত্রের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। উক্ত দরপত্রের অংশগ্রহণ এর জন্য মোট ১১টি কোম্পানি দরপত্র ক্রয় করে এবং প্রাক-দরপত্র সভায় অংশগ্রহণ করে। শেষ পর্যন্ত মাত্র তিনটি প্রস্তাব (বিড) জমা পড়ে। নির্বাচনী প্রচারণার সময়ে অন অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা স্থগিত ছিল। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তাদের নাগরিকদের চলাচলের ওপর ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে। এ কারণে অনেক দক্ষ কোম্পানি প্রস্তাব জমা দিতে পারেনি। প্রাক-দরপত্র সভায় নেদারল্যান্ডসের স্মিত ল্যামনালকো ও মিসরের মেরিডাইভ অংশ নিয়েও চূড়ান্ত দরপত্রে অংশ নেয়নি। এই দুই প্রতিষ্ঠানসহ দরপ্রস্তাব ক্রয়কারী অধিকাংশ কোম্পানি নির্বাচনের পর দরপত্র গ্রহণের তারিখ রাখার অনুরোধ করে। তা গ্রহণ করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ার পার্তামিনা, চীনের সিপিপি এবং হিলং–এই তিন প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয়। তবে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অতীত কার্যক্রম ও অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পার্তামিনা দুর্নীতির কারণে সমালোচিত, সিপিপি আগের প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা ও অতিরিক্ত ব্যয় করেছে, হিলং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্কিত চুক্তির কারণে সমালোচিত। দরপ্রস্তাব কিনেও জমা দিতে না পারেনি এমন কোম্পানিগুলো ফের দরপত্র ডাকার দাবি জানিয়েছে।
এ বিষয়ে জ্বালানি সচিব সাইফুল ইসলাম এবং এসপিএমের সাবেক প্রকল্প পরিচালক এবং বর্তমানে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ হাসনাতের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাদের সাড়া মেলেনি।
- বিষয় :
- দরপত্র
