ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

কমিটি গঠনের পাল্টাপাল্টি প্রস্তাব

জুলাই আদেশকে প্রতারণা বলায় সংসদে বিতর্ক

সিইসির বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ বিএনপির

জুলাই আদেশকে প্রতারণা বলায় সংসদে বিতর্ক
×

সংসদে গতকাল মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নেন সালাহউদ্দিন আহমেদ ভিডিও থেকে

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের জন্য জারি করা রাষ্ট্রপতির আদেশকে জাতির প্রতারণার দলিল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, এটি অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল।

গতকাল মঙ্গলবার সংসদ অধিবেশনে মুলতবি প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা এমন মন্তব্য করেন। এই আদেশের বৈধতা নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বিষয়টি নিয়ে সংসদে পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল বিতর্ক হয়। মুলতবি প্রস্তাবের ওপর হওয়া সেই বিতর্ক ভোট ছাড়াই শেষ হয়।

সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করে সরকারি দল বিএনপি। বিপরীতে জুলাই আদেশকে প্রতারণা বলায় বিরোধী দল জামায়াত ক্ষমতাসীন দলকে সংস্কারে অনিচ্ছুক আখ্যা দিয়ে পরিষদের অধিবেশন আহ্বানে সিদ্ধান্ত নিতে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়। 

গণভোটে অনুমোদিত জুলাই আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানে গত রোববার বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান কার্যপ্রণালি বিধির ৬২ ধারা অনুযায়ী মুলতবি প্রস্তাবের নোটিশ দিয়েছিলেন। এর ওপর গতকাল মাগরিবের নামাজের বিরতির আগে দুই ঘণ্টা এ নিয়ে বিতর্ক চলে। ৬৫ ধারা অনুযায়ী, ভোটাভুটিতে মুলতবি প্রস্তাবের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা থাকলেও স্পিকার বিতর্কের পর সংসদ মুলতবি করেন। 

সরকারি দলের পক্ষে বিতর্কে অংশ নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ। বিরোধী দলের পক্ষে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান, এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, হাসনাত আবদুল্লাহ, জামায়াতের এমপি ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান, রফিকুল ইসলাম খান, সাইফুল আলম খান, নুরুল ইসলাম বুলবুল এবং ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। সরকারি জোটের তিন এবং বিরোধী জোটের আটজন বক্তৃতা করলেও দুপক্ষকেই সমান এক ঘণ্টা করে সময় দেন স্পিকার। 

সংবিধান ছুড়ে ফেলার বক্তব্যের জন্য বিরোধী দলের সমালোচনা করেন পার্থ। তিনি সংবিধানকে একাত্তরের পরাজিত শক্তির জন্য পরাজয়ের দলিল বলে আখ্যা দেন। 
এর জবাবে হাসনাত বলেন, গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়া সংবিধান ছুড়ে ফেলার কথা বলেছিলেন। তাঁর এই সংগ্রামকে সরকারি দল ভুলে গেছে।  

পাল্টা প্রস্তাব বিরোধী দলের
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষে সালাহউদ্দিন আহমেদ সংবিধান সংস্কারে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করলে বিরোধীদলীয় নেতা সরকারি ও বিরোধী দল থেকে সমান সংখ্যক সদস্য নিয়ে পাল্টা কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন। শফিকুর রহমান জানান, তারা ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাধান চান। 

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, কোনো দল নয়, জনগণের অভিপ্রায়ে সংসদে এসেছি। আন্দালিব রহমান পার্থ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কিছু ‘ফায়ার ব্যাক ফায়ার’ হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনের লোক। তিনি ফ্যাসিবাদী আমলে আইনের নামে নিপীড়িত হয়েছেন। 

১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিলের পর রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির ক্ষমতার প্রসঙ্গ এনেই সালাহউদ্দিনের এ বক্তব্যে জামায়াত আমির জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ফরমান জারির নজির দিয়ে বলেন, সংবিধান ও আইন মানুষের জন্য। আইন কিংবা সংবিধানের জন্য জনগণ নয়। কাউকে আক্রমণ করে কথা বলতে চাই না। 

জুলাই আদেশকে অন্তহীন প্রতারণা আখ্যা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য খণ্ডন করে জামায়াত আমির বলেছেন, আদেশ জারি হয়েছে ১৩ নভেম্বর। ভোট হয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারি। বিএনপির দাবিতে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হয়েছে। এ জন্য তারা অন্তর্বর্তী সরকারকে ধন্যবাদও জানিয়েছিল। গণভোট তাদেরও দাবি ছিল। গণভোট কী কী বিষয়ে হচ্ছে, তা সবার জানা ছিল। আজকের প্রধানমন্ত্রীও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়েছিলেন। 

জামায়াত আমির বলেন, জামায়াত জোট আগের অবস্থানেই রয়েছে। গণভোটে সিদ্ধান্তের ভার জনগণকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। বেশির ভাগ জনগণ সমর্থন দিয়েছে। এখন বাস্তবায়ন প্রশ্নে একে যদি অসাংবিধানিক বলা হয়, তাহলে অতীতের অনেক গণভোট নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।
সংবিধানে না থাকায় জুলাই আদেশ বৈধ নয়– সরকারি দলের এ বক্তব্যে জামায়াত আমির বলেছেন, সংবিধানবহির্ভূত অনেক কাজই হয়েছে। আমরা সবাই মিলেই করেছি। দেশ ও জনগণের প্রয়োজনে কেউ আপত্তি করিনি। 

প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাব প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, পরিষদের অধিবেশন আহ্বানে কমিটির প্রস্তাব এলে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করতে পারব। জনগণ গণভোটকে গ্রহণ করেছে। আমরাও গ্রহণ করার মাধ্যমে যদি জনগণকে সম্মান করি, তাহলে এই সংসদ সম্মানিত হবে। জনগণের অভিপ্রায় প্রতিফলিত হোক। 

আদেশ বৈধ নয়
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ বৈধ আইন নয়। ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ গঠিত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির আর আদেশ জারির এখতিয়ার নেই। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল।

বিএনপির এমপিরা বিরত থাকলেও জামায়াত জোটসহ ৭৮ এমপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) কাছে। সংবিধানের বাইরে গিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ ফরম বিতরণ করে সিইসি শপথ ভঙ্গ এবং সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন বলে অভিযোগ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই পুরো প্রক্রিয়া অবৈধ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ ও তপশিল উদ্ধৃত করে গত বছরের জারি করা জুলাই আদেশকে আইনিভাবে অসার বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন সংসদ সদস্যদের নির্বাচনের একটি ব্যালট দিয়েছিল। সেখানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হওয়ার জন্য কোনো আলাদা ব্যালট ছিল না। জনগণ সংসদ সদস্য হিসেবে আমাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে; অস্তিত্বহীন কোনো পরিষদের সদস্য হিসেবে নয়।

বিগত সরকারের জারি করা আদেশটি শুরু থেকেই বাতিল ছিল দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যে আদেশের জন্মই অবৈধ, তার ভিত্তিতে কোনো অধিবেশন আহ্বান করা যায় না। এই আদেশটি অন্তর্বর্তী সরকারের একটি প্রতারণার দলিল। সার্বভৌম পার্লামেন্টের অধিকার ক্ষুণ্ন করার একটি ব্যর্থ চেষ্টা। 

গণভোটের মাধ্যমে প্রাপ্ত জনরায় প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জনগণ জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে আছে কিনা– তা জানার জন্য আমরাই গণভোটের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু গণভোটের ব্যালটে যেভাবে প্রশ্ন সাজানো হয়েছে, তা জনগণকে বিভ্রান্ত করার শামিল। জোর করে ‘কুইনাইন ট্যাবলেট কলার ভেতরে’ ঢুকিয়ে খাওয়ানোর মতো করে তিনটি ভালো প্রশ্নের সঙ্গে একটি বিতর্কিত আদেশ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিএনপি সংস্কার চায় না– এমন প্রচারণাকে বিভ্রান্তিকর উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে– বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদ মানে না। স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অক্ষর ও বাক্য আমরা ধারণ করি। তবে আমরা সেই সংস্কার চাই, যা সংবিধানসম্মত এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখে।

সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠনে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে প্রস্তাব করেন সালাহউদ্দিন। তিনি বলেন, সব দল এবং স্বতন্ত্র সদস্যদের নিয়ে কমিটি হবে। জুলাই জাতীয় সনদের ৪৭টি বিষয়ে যে ঐকমত্য হয়েছে, তা আগামীতে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে এবং জনগণের ম্যান্ডেট অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আইনমন্ত্রী বলেন, বিএনপি আবেগি দল। জুলাই সনদকে রক্তে ধারণ করে। এ জন্য বাস্তবায়নের আগেই সংসদ নির্বাচনে ৫ শতাংশের কাছাকাছি নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। বিরোধী দল জুলাই সনদ নিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেললেও একজনও নারী প্রার্থী দেয়নি। 

পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, ভারত নিয়ে খোঁচা 
জামায়াত এমপি ড. মাসুদ বলেন, বিগত ১৭ বছর উন্নয়নের কথা বলে নির্বাচনকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন ভোটের কালি শুকাতে না শুকাতেই উন্নয়নের কথা বলে জুলাই সনদকে ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। জুলাই অভ্যুত্থানে শিশুরা, ছাত্ররা ফ্যামিলি কার্ড নয়, রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য পথে নেমেছিল। সেদিন ছাত্র-জনতা শেখ হাসিনার সংশোধন মেনে নেয়নি; তারা সংস্কার চেয়েছিল। 
শফিকুল ইসলাম বলেন, ৫১ শতাংশ জনগণ ফ্যামিলি কার্ডের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। আর ৭০ শতাংশ জুলাই সনদের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। 
আখতার হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী ৩০ জানুয়ারি রংপুরে শহীদ আবু সাঈদের জন্মভূমিতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, দয়া করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দিন। দয়া চেয়ে এখন কেন গণভোটের রায় মানতে চান না? জনগণ জুলাই আদেশের পক্ষে রায় দিয়েছে। জনগণের রায়কে অসাংবিধানিক বলা ধৃষ্টতা, সংসদকে কলঙ্কিত করা। গণভোট অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদন হোক বা না হোক, গণভোটকে অবৈধ বলার সুযোগ নেই।
আন্দালিব রহমান বলেন, বিএনপি জোটকে জুলাইয়ের বিরুদ্ধে নিয়ে যাওয়ার পাঁয়তারা দেখতে পাচ্ছি। সরকারি জোট জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু আমাদের নোট অব ডিসেন্ট (আপত্তি) আগে থেকেই দেওয়া। 

সংবিধান সংস্কার পরিষদ কোথা থেকে আসছে– প্রশ্ন তুলে আন্দালিব রহমান বলেন, গণভোটে ৭০ শতাংশ হ্যাঁ ভোট পড়লেও সংবিধান পরিবর্তনের জন্য ৫১ শতাংশ ভোট বিএনপি জোট পেয়েছে। 
এনসিপির উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা জেন-জিকে প্রতিনিধিত্ব করুন। জামায়াত জেনারেশন হয়ে যাবেন না। 

জামায়াত ভারতের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করেছে বলে খোঁচা দিলে বিরোধী দলের আসন থেকে না না বলা হয়। এর জবাবে জামায়াতের রফিকুল ইসলাম নিজের বক্তব্যের সময় বলেন, যারা ভারতের সঙ্গে গোপন বৈঠকের মিথ্যা অভিযোগ করেন, তাদের আত্মীয়রা ভারতে পালিয়ে রয়েছে। 

পার্থের বক্তব্য খণ্ডন করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, সরকারি জোট সংবিধানের যে অংশ নিজের সুবিধার তা মানে, যা অসুবিধার তা মানে না। তারা কখনও সাংবিধানিক, কখনও অসাংবিধানিক। 
জুলাই আদেশকে বৈধ আখ্যা দিয়ে হাসনাত বলেন, সংবিধান মানতে গেলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ৬ আগস্ট দেশে কোনো প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। তাহলে কার পরামর্শে সেদিন রাষ্ট্রপতি খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়েছিলেন? ছাত্র-জনতার অভিপ্রায়ে তাঁর মুক্তি হয়েছিল। এই অভিপ্রায়েই আদেশ জারি হয়েছে। গণরায় কখনও কিতাবের কাছে মাথানত করে না। ৬৮ শতাংশ জনগণ ভোটে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন, এই সংবিধানের কোন জায়গায় মৌলিক  পরিবর্তন আনতে হবে।
পাবনা-১ আসনের জামায়াতের এমপি নজিবুর রহমান বলেন, সরকারকে পরিষ্কার করতে হবে– জুলাইকে বিপ্লব হিসেবে স্বীকার করেন কিনা। 

 

আরও পড়ুন

×