ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

ডিজিটাল কারসাজিতে দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

ডিজিটাল কারসাজিতে দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ
×

তবিবুর রহমান

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২৬ | আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে (এনআইওএইচ) দীর্ঘদিন ধরে নীরবে চলা টাকা লুটের ঘটনা সামনে এসেছে। প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী রিয়াজ উদ্দিন নথি জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। 

এ ঘটনায় অভিযুক্ত অফিস সহকারীকে গ্রেপ্তার করা হয় গত ৯ মার্চ। ওই দিনই তাঁকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন। তদন্ত কমিটির জিজ্ঞাসাবাদে রিয়াজ উদ্দিন অর্থ আত্মসাতের কথা স্বীকারও করেছেন। আত্মসাৎ করা টাকা দিয়ে তিনি সাভারে জমি কিনেছেন। পাশাপাশি স্বর্ণালঙ্কার কেনার তথ্যও পেয়েছে তদন্ত দল। 

তদন্ত কমিটির প্রধান হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. এইচ এম রেজওয়ানুর রহমান বলেন, তদন্তে প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তথ্য লুকাতে প্রায় ২০ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার কথাও স্বীকার করেছেন। 

তদন্ত সূত্রে জানা যায়, রিয়াজ উদ্দিন সফটওয়্যারের তথ্যে কারসাজি করে হাসপাতালের বিভিন্ন সেবা থেকে আদায় করা টাকার হিসাব গরমিল করে ব্যাংকে জমা দিতেন। ফলে প্রকৃত আয় ও জমার অঙ্ক মিলিয়ে না দেখায় এতদিন এই জালিয়াতি ধরা পড়েনি। বছরের পর বছর এভাবে নিরীক্ষকের (অডিট) চোখ ফাঁকি দিয়ে টাকা আত্মসাৎ করা হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী, টিকিট, রেজিস্ট্রেশন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচার, কেবিন-শয্যা, রক্ত সংগ্রহ ও অ্যাম্বুলেন্স সেবার বিনিময়ে পাওয়া টাকা হিসাব করে সপ্তাহে দু’দিন রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা। তবে অভিযুক্ত অফিস সহকারী সফটওয়্যারে তথ্য কারচুপি করে জমা টাকা কমিয়ে দেখাতেন। ব্যাংকের চালানেও তিনি একইভাবে কারসাজি করছিলেন। 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক নিরীক্ষায় প্রথমে ৮৬ লাখ টাকা জমা না দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। পরে হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অধিকতর তদন্তে গত পাঁচ বছরের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়। সেখানে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪২ লাখ ৮৯ হাজার ৫৮৫ টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ কোটি ৫৬ লাখ ৯০ হাজার ৫৭৪ টাকা; অর্থাৎ দুই অর্থবছরে ১ কোটি ৯৯ লাখ ৮০ হাজার ১৫৯ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি।

তদন্ত কমিটির জিজ্ঞাসাবাদে রিয়াজ উদ্দিন দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানের উপপরিচালক ডা. হালিমা সুলতানা হক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা রফিকুল হোসেন ও হিসাবরক্ষক হানিফ মিয়াও জমা পড়া ফি থেকে টাকা নিয়েছিলেন। পরে আর তারা সেই টাকা ফেরত দেননি। তবে রিয়াজ উদ্দিন এই অভিযোগের ব্যাপারে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সবাই তদন্ত কমিটির কাছে এ অভিযোগ অস্বীকারও করেছেন। 

রিয়াজ উদ্দিন ২০১৪ সালে অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। ২০১৮ সালে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব পান। এর পর থেকেই অনিয়ম শুরু হয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় রিয়াজের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এখনও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। 
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপপরিচালক ডা. হালিমা সুলতানা হক বলেন, নিজেকে রক্ষা করতে রিয়াজ উদ্দিন অন্যদের নাম ব্যবহার করেছেন। অন্যের পরামর্শে আমার নাম বলেছেন। এমনও হতে পারে মূল ঘটনা আড়াল করতে আমাদের নাম সামনে নিয়ে আসা হয়েছে।

প্রশাসনিক কর্মকর্তা রফিকুল হোসেন বলেন, রিয়াজ উদ্দিন নিয়মিত যেসব কাগজপত্র জমা দিতেন, সেগুলো প্রাথমিকভাবে ঠিকই মনে 
হতো। তবে সফটওয়্যারের তথ্য কারসাজি করে টাকা কম দেখানোর বিষয়টি আমাদের নজরে আসেনি। এ অনিয়মের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

হিসাবরক্ষক হানিফ মিয়া বলেন, রিয়াজ উদ্দিন আমার দপ্তরে কোনো কাগজ জমা দিতেন না। তাঁর কাজের সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। রিয়াজ উদ্দিনের কাছ থেকে আমি কোনো টাকা নিইনি।

হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. এ এস এম এম কাদির বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আইন শাখার দায়িত্বরত কর্মকর্তা ডা. পরিমল কুমার পালকে জানানো হয়েছে। তাঁর নির্দেশনায় অভিযুক্ত রিয়াজকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×