ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্মরণসভা
অধ্যাপক সাখাওয়াত শিক্ষার্থীদের অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে গতকাল সোমবার অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের স্মরণসভায় বক্তব্য দেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:২১
অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান শিক্ষকের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন। খুব কম শিক্ষকই গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা শাস্ত্রকে তাঁর মতো সহজ করে বলতে পেরেছেন। সাখাওয়াত আলী খানের নিয়মানুবর্তিতা, ক্লাসের পাঠ ও সহজবোধ্য উপস্থাপনকে অধ্যয়ন করতে হবে।
গতকাল সোমবার এক স্মরণসভায় অংশ নিয়ে সদ্য প্রয়াত অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের ভূমিকাকে এভাবেই মূল্যায়ন করেন তাঁর ছাত্রছাত্রীরা। তাদের কেউ এখন পেশায় শিক্ষক-গবেষক, কেউ সাংবাদিক, কেউবা আছেন অন্যান্য পেশায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে ‘স্মৃতি তর্পণ’ শিরোনামে এই স্মরণসভার আয়োজন করেছিল গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ।
১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে স্নাতক কোর্স চালু হয়। সে সময় বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান। স্নাতকের প্রথম ব্যাচে প্রথম হয়ে বিভাগের শিক্ষক হয়েছিলেন সুব্রত শংকর ধর। অবশ্য পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। অধ্যাপক সাখাওয়াতের স্মরণসভায় অংশ নিয়ে সুব্রত শংকর ধর বলেন, ‘শিক্ষকের পাশাপাশি তিনি শিক্ষার্থীদের অভিভাবকও ছিলেন।’
সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক কাজী আবদুল মান্নান ১৯৭৪ সাল থেকে অধ্যাপক সাখাওয়াতের সহকর্মী ছিলেন। তিনি বলেন, ‘সাখাওয়াত ভাইয়ের সেন্স অব হিউমার খুব শক্তিশালী ছিল। তাঁকে আমি মিস করব।’
প্রধানমন্ত্রীর ‘স্পিচ রাইটার’ এস এ এম মাহফুজুর রহমানও অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের ছাত্র ছিলেন। বেসরকারি বার্তা সংস্থা ইউএনবির সাবেক এই সম্পাদক বলেন, ‘আমাদের শিক্ষকরা ক্লাসে যা বলতেন, তাদের বলার ভঙ্গি ও ভাবনাগুলো এখনও আমাদের কানে বাজে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) সায়মা হক বিদিশা বলেন, যেসব জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক সম্পর্কে সবসময় ইতিবাচক কথা শুনেছি, তাদের মধ্যে সাখাওয়াত স্যার একজন।
অধ্যাপক সাখাওয়াত ১৯৭২ সাল থেকে পাঁচ দশকের বেশি সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। ২০০৮ সালে অবসর নেওয়ার পর তিনি সেখানে পাঁচ বছর সংখ্যাতিরিক্ত (সুপারনিউমারারি) অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি বিভাগটির ‘অনারারি প্রফেসর’ ছিলেন। বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ অধ্যাপক সাখাওয়াত ৮৫ বছর বয়সে গত ৯ মার্চ ঢাকায় মারা যান।
গতকাল স্মরণসভার শুরুতে তাঁর জীবনী তুলে ধরেন সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাওন্তী হায়দার। অধ্যাপক সাখাওয়াতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করার পর শুরু হয় স্মৃতিচারণা।
অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন বলেন, ‘কী করে যে কোনো সময়ে হাসিমুখে থাকা যায়, এটা ছিল স্যারের একটা বড় ব্যাপার। যত কঠিন বিষয়ই হোক, স্যার বললে সেটা মজার হয়ে যেত।’
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক শেখ আবদুস সালাম বলেন, ‘আমাদের কেউ বেশি শিক্ষক, কেউ বেশি পলিটিশিয়ান। কিন্তু সাখাওয়াত স্যার ছিলেন একজন মানুষ।’
অধ্যাপক কাবেরী গায়েন বলেন, ‘সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ শাস্ত্রকে অধ্যাপক সাখাওয়াতের মতো সহজ করে আমরা আর কেউ বলতে পেরেছি কি না, জানি না।’
অধ্যাপক মফিজুর রহমান বলেন, ‘সাখাওয়াত আলী খানের মতো রাশভারী ও সরলতার মিশেল কম পাওয়া যায়। তাঁর নিয়মানুবর্তিতা, ক্লাসের পাঠ এবং সহজবোধ্য উপস্থাপনকে অধ্যয়ন করতে হবে।’
শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে অধ্যাপক সাখাওয়াতের দারুণ আন্তরিকতা ছিল বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক আবুল মনসুর আহাম্মদ। সাংবাদিকতা বিভাগ বা বিভাগের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে অধ্যাপক সাখাওয়াতসহ এই বিভাগের প্রয়াত শিক্ষকদের স্মরণে বছরে অন্তত একটি স্মরণসভা আয়োজনের প্রস্তাব দেন তিনি।
অধ্যাপক সাখাওয়াতের মতো স্টোরিটেলার (কথক) আর পাওয়া যাবে কিনা, সে ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করেন সহযোগী অধ্যাপক এ এস এম আসাদুজ্জামান।
অধ্যাপক সাখাওয়াতের অনূদিত ‘কালিদাসের মেঘদূতের পাণ্ডুলিপি’ থেকে ভূমিকাসহ কিছু অংশ পড়ে শোনান সহকারী অধ্যাপক মার্জিয়া রহমান।
‘বাবার মনজুড়ে ছিলেন ছাত্রছাত্রীরা’
স্মরণসভায় অধ্যাপক সাখাওয়াতের স্ত্রী মালেকা খান, মেয়ে সুমনা শারমীন, ছেলে নওশাদ আলী খানসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন সুমনা শারমীন। তিনি প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক। সুমনা বলেন, ‘বাবার মনজুড়ে ছিলেন ছাত্রছাত্রীরা। তাঁর জীবন ছিল নিয়মতান্ত্রিক, পেশার প্রতি ছিল অঙ্গীকার।’
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শামসুল হক বলেন, মৃত্যু পর্যন্ত অ্যালামনাইর প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন সাখাওয়াত আলী খান। তিনি এমন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ ছিলেন যে যা বলতেন, তা-ই শিরোধার্য ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তৈয়েবুর রহমানের সভাপতিত্বে ও অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও প্রশিক্ষক কুররাতুল-আইন-তাহমিনা, প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি শিশির মোড়ল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মিনহাজ উদ্দিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ, সংগীতবিষয়ক পত্রিকা ‘সরগম’-এর সম্পাদক কাজী রওনাক হোসেন, শহীদ আসাদ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান মিলন, সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের (সেড) পরিচালক ফিলিপ গাইন, পেট্রোবাংলার উপমহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) তরিকুল ইসলাম খান এবং ডিইউএমসিজেএএর সাধারণ সম্পাদক মীর আত্তাকী মাসরুরুজ্জামান। অধ্যাপক সাখাওয়াতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর দুই শিক্ষার্থী গান পরিবেশন করেন।
- বিষয় :
- স্মরণসভা
