মজুদ নিয়ে শঙ্কা ‘মনস্তাত্ত্বিক’, ঘাটতি নেই: জ্বালানি মন্ত্রণালয়
সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী। ছবি-সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১৭:৩৫
দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, সেটিকে ‘মনস্তাত্ত্বিক চাপ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী। তার দাবি, সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই বরং আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনাকাটার প্রবণতাই বাজারে চাপ বাড়াচ্ছে।
বুধবার সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, শুরু থেকেই গণমাধ্যমের সহযোগিতায় পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছে। এরপর তিনি সাম্প্রতিক অভিযান ও মজুদ পরিস্থিতির বিস্তারিত তুলে ধরেন।
গত ৩ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে ৯ হাজার ১১৬টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে বলে জানান মনির হোসেন। এসব অভিযানে ৩ হাজার ৫১০টি মামলা হয়েছে, জরিমানা আদায় হয়েছে ১ কোটি ৫৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং ৪৫ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, এ সময়ে মোট ৫ লাখ ৪ হাজার ২৩৬ লিটার অবৈধ জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ডিজেল ৩ লাখ ৬৬ হাজার লিটার, অকটেন ৩৯ হাজার ৭৭৬ লিটার, পেট্রোল ৮৭ হাজার ৯৫৯ লিটার এবং ফার্নেস তেল ৪৮ হাজার ৫০০ লিটার।
বর্তমান মজুদের চিত্র তুলে ধরে মনির বলেন, দেশে ডিজেল মজুদ রয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৩৮৫ মেট্রিক টন, অকটেন ৩১ হাজার ৮২১ মেট্রিক টন, পেট্রোল ১৮ হাজার ২১১ মেট্রিক টন, ফার্নেস তেল ৭৭ হাজার ৫৪৬ মেট্রিক টন এবং জেট ফুয়েল ১৮ হাজার ২২৩ মেট্রিক টন।
যুগ্মসচিব বলেন, অকটেন ও পেট্রোলের মজুদ দিয়ে আগামী দুই মাসেও কোনো সমস্যা হবে না। ডিজেলের ক্ষেত্রেও এপ্রিল তো বটেই, মে মাসেও সমস্যা দেখছি না।
দেশের একমাত্র পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি জানান, বছরে প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল সেখানে পরিশোধন করা হয়। বর্তমানে চারটি ইউনিটের মধ্যে দুটি চালু রয়েছে।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে নির্ধারিত সময়ে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। তবে আগের মজুদ দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ বা মে মাসের শুরুতে নতুন জাহাজ আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। রিফাইনারির এই সীমাবদ্ধতা সরবরাহে কোনো প্রভাব ফেলবে না।
বাজারে পাম্পে ভিড়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যুগ্মসচিব বলেন, এটি সরবরাহ ঘাটতির কারণে নয়। ২৮ ফেব্রুয়ারির আগে আমরা যে পরিমাণ তেল দিতাম, এখনো তাই দিচ্ছি। কিন্তু মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় বেশি কিনছে।
উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, একটি পাম্পে আগে দৈনিক ৫০-৫৪ হাজার লিটার অকটেন সরবরাহ করা হতো, এখন সেখানে ৮০ হাজার লিটারের বেশি দিয়েও চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না।
জ্বালানি তেলের দাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতি মাসেই পরিস্থিতি বিবেচনা করে মূল্য সমন্বয় করা হয়। এপ্রিলের দাম ইতোমধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে দাম বাড়বে কি না, তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে সরকারের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন মনির। তিনি জানান, জ্বালানি পরিবহনকারী লরিতে ট্র্যাকিং ডিভাইস বসানো হবে। ‘ফুয়েল পাস’ নামে একটি পাইলট প্রকল্প ইতোমধ্যে কয়েকটি স্টেশনে চালু হয়েছে এবং এতে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার নিবন্ধন হয়েছে।
শিল্প খাতে ডিজেল সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি ডিলারদের একটি ডাটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে, যাতে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় ডিলারদের শনাক্ত করা যায়।
সব মিলিয়ে, মজুদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও জনমনে তৈরি হওয়া শঙ্কাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন জ্বালানি বিভাগের এই কর্মকর্তা।
