কারিতাস-সমকাল গোলটেবিল
প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাস্তুচ্যুতদের সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ দাবি
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল কার্যালয়ে গতকাল বুধবার ‘নগর জলবায়ু অভিযোজন : সামাজিক সুরক্ষা ও অন্তর্ভুক্তি চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা -সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৩৩ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ২১:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকা থেকে দুর্গত মানুষ রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন নগরে এসে আশ্রয় নিচ্ছে। কিন্তু তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থানসহ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূলধারায় অন্তর্ভুক্তি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। নগরমুখী জলবায়ু উদ্বাস্তুতের অধিকার ও জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে জোর দিয়েছেন এই খাতে কর্মরত সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া এ ক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
গতকাল বুধবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল কার্যালয়ে ‘নগর জলবায়ু অভিযোজন: সামাজিক সুরক্ষা ও অন্তর্ভুক্তি চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
কারিতাস বাংলাদেশ ও সমকাল যৌথভাবে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী। স্বাগত বক্তব্য দেন কারিতাস বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক দাউদ জীবন দাশ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) চেয়ারপারসন ড. তাসনিম সিদ্দিকী।
আলোচনায় অংশ নেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত, বেলার প্রধান নির্বাহী এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান, পরিকল্পনা কমিশনের অতিরিক্ত সচিব ড. অঞ্জন কুমার দেব রায়, সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তাফা মাহমুদ সারোয়ার, ঢাকায় জার্মান দূতাবাসের ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশনের উপদেষ্টা রিদিতা রকিব, নগরবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব, চরচা সম্পাদক সোহরাব হাসান, ওয়ার্ল্ড ভিশনের হিউম্যানিটেরিয়ান ইমার্জেন্সি অ্যাফেয়ার পরিচালক দোলন যোসেফ গোমেজ, কারিতাস বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান আলেকজান্ডার ত্রিপুরা, গণমাধ্যমকর্মী ও কারিতাসের প্রকল্প উপদেষ্টা ড. জামিল আহমেদ, খুলনার উদ্বাস্তু প্রতিনিধি সাবিনা খাতুন।
ড. আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবিলায় বিগত সময়ে ৭০০ কোটি টাকার ফান্ড করা হয়েছিল। ডেল্টা প্ল্যান এবং লস অ্যান্ড ডেমেজ প্রজেক্টও নেওয়া হয়েছিল। সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাবে এগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, জলবায়ু উদ্বাস্তুদের নিজ এলাকায় থাকতে উৎসাহিত করতে হবে। কারণ জনবিস্ফোরণের এই দেশে কাকে রেখে কাকে পুনর্বাসন করবেন? আর জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাস্তব সমস্যা। এর সমাধানও বাস্তবতার আলোকে হতে হবে। বিশ্বের বর্তমান হারে বাড়তে থাকলে ২০-৫০ বছর পর কৃষি উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাবে। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে পরিকল্পনা নিতে হবে।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আমরা বলি, জলবায়ু অভিযোজনে উপকূল প্লাবিত হয়ে যাবে। তাহলে আমরা এই মানুষগুলোকে রক্ষার জন্য তাদের জীবনযাত্রার উন্নয়ন বা সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করি না কেন? আরও নতুন নতুন দুর্যোগ হতে পারে। ২১ জেলার মানুষ নদীভাঙন, লবণাক্ত পানি ও জলবায়ু উদ্বাস্তু হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে। এনজিওগুলো কিছু জায়গায় অ্যাড্রেস করছে, কিন্তু সেটি পাইলটিং হতে পারে। বড় আকারে পদক্ষেপ সরকারি পর্যায়ে নিতে হবে। তিনি বলেন, বস্তিবাসীসহ সকল নাগরিকের বাসস্থানসহ সকল মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের প্রতিশ্রুতি। তাদের গ্রামে ফিরিয়ে নিলেও উপযুক্ত আশ্রয় ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের অন্তর্ভুক্তকরণের পরামর্শ দেন তিনি।
রেজওয়ানুর রহমান বলেন, নদীভাঙন, বন্যা বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যারা উদ্বাস্তু হয়ে পড়ছেন, তাদের জন্য কেবল ঘর করে দিলেই হবে না। তাদের জীবনমানের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিবীমা বা গৃহবীমা চালু করতে হবে। নিজ এলাকায় জীবিকা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা দরকার।
ড. অঞ্জন কুমার দেব রায় বলেন, গবেষণা অনুযায়ী একটি নগরীতে মানুষের হাঁটাচলার জন্য ৪০ শতাংশ জায়গা থাকার কথা। কিন্তু ঢাকায় হাঁটা, এমনকি রাস্তা অতিক্রম করারও কোনো জায়গা নেই। নানা কারণে যারা উদ্বাস্তু হয়ে পড়ছেন, তাদের নগরজীবনে প্রবেশের বিষয়ে উৎসাহিত করা ঠিক হবে না।
মোস্তাফা মাহমুদ সারোয়ার বলেন, উদ্বাস্তুদের জাতীয় পরিচয়পত্র-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের ক্ষেত্রে সরকার আন্তরিক। প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুত ফ্যামিলি কার্ডসহ সমাজসেবা অধিদপ্তরের অর্ধশতাধিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকেও এনআইডির বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে। বস্তিবাসীদের জন্য ৭৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ছোট আকারের ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
মূল প্রবন্ধে ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ২০৫০ সাল নাগাদ সারাবিশ্বে ২৬ মিলিয়ন মানুষকে বাস্তুচ্যুত হতে হবে। যার মধ্যে ১৯ মিলিয়নই হবে বাংলাদেশে। তিনি বলেন, ২০২১ সালে দেশে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনা হলেও এর বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
রিদিতা রকিব বলেন, জলবায়ু উদ্বাস্তু বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে জার্মানি দীর্ঘদিন থেকে কাজ করে আসছে। তবে উদ্বাস্তুদের পরিচয় নির্ধারণে জটিলতা সংকট তৈরি করেছে। এটি স্বচ্ছ ও জেন্ডারবান্ধব করতে হবে।
ইকবাল হাবিব বলেন, জলবায়ু অভিযোজন বা নানা কারণে প্রতি বছর তিন থেকে পাঁচ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হয়। তাদের বড় অংশই নগরের দিকে ধাবিত হন, বস্তিতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করেন। তাদের বিষয়ে সংখ্যাগত তথ্য ও পরিসংখ্যানও সরকারের কাছে নেই। এই দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে অদৃশ্য রেখে বা অনিবন্ধিত রেখে টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা কোনোভাবেই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। নগরদরিদ্রদের জন্য নগরভিত্তিক সুরক্ষা গড়ে তোলা, সাশ্রয়ী আবাসন এবং নিরাপদ কর্মসংস্থানহ তাদের সব মৌলিক চাহিদা পূরণকে প্রাধান্য দিয়ে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি।
সোহরাব হাসান বলেন, যারা বাস্তুচ্যুত হন, প্রথমেই তাদের জায়গা হয় নগরের বস্তিতে। কিন্তু বাসস্থানসহ সব ক্ষেত্রেই তাদের জীবন অনিশ্চিত ও অনিরাপদ। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার শিকারও তারা বেশি হয়। অনেক সময় তাদের রাজনীতির বলি বানানো হয়। অথচ তারা তো রাজনৈতিক কারণে উদ্বাস্তু নয়। যারা জনপ্রতিনিধি হচ্ছেন বা হতে চাইছেন, তাদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করতে হবে– নির্বাচিত হলে তারা এদের জন্য কী করবেন।
দোলন যোসেফ গমেজ বলেন, নগর উদ্বাস্তুদের বিষয়ে আমরা কাজ করছি, আলোচনা করছি। কিন্তু এ বিষয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের প্রধান ভূমিকা থাকতে হবে। অভ্যন্তরীণ অভিবাসন নীতি ও কৌশল নিয়ে সবাইকে মিলে কাজ করতে হবে।
ড. জামিল আহমেদ বলেন, প্রথম সারির কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে থাকলেও বাকিগুলোতে জলবায়ুবিষয়ক আলাদা বিট তৈরি এবং প্রতিবেদকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই জলবায়ু উদ্বাস্তু-সংক্রান্ত তথ্যসমৃদ্ধ প্রতিবেদন পাওয়া যাবে।
সাবিনা খাতুন জানান, আইলার প্রভাবে ঘরবাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তু হন তিনিসহ তাঁর পরিবার। সে সময় অন্যত্র আবাসন গড়ে তুললেও জাতীয় এনআইডি ও টিসিবি কার্ড করার সুযোগ পাননি। তিনি ও তাঁর স্বামীর কর্মজীবনের নিশ্চয়তাও পাননি। এই সমস্যাগুলোর সমাধান নিশ্চিত করে উদ্বাস্তুদের জীবনমানের উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়া হলে তাঁর মতো হাজার হাজার উদ্বাস্তু পরিবার বেঁচে যাবে।
গোলটেবিল সঞ্চালনা করেন সমকালের সহযোগী সম্পাদক শেখ রোকন। বৈঠকের শুরুতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও উদ্বাস্তুদের জীবনচিত্রের ওপর ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
- বিষয় :
- গোলটেবিল
- প্রাকৃতিক দুর্যোগ
- জলবায়ু পরিবর্তন
