শ্রম সংশোধন বিল
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের স্বীকৃতি মিলল না
আবু হেনা মুহিব
প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা মাত্র ১৫ শতাংশ। বাকি ৮৫ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। কাঠামো দুর্বলতায় বিশাল এই শ্রমিক গোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় শ্রম আইনে স্বীকার করা হয় না। এ কারণে শ্রম আইনে সব সুবিধা এবং সুরক্ষার বাইরে রয়েছেন এসব শ্রমিক।
গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাস হওয়া শ্রম সংশোধন বিলে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের মধ্যে কেবল গৃহ শ্রমিক ও কৃষি শ্রমিকদের মধ্যে যারা কৃষি খামারে কাজ করেন, তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে তাদের অংশ ৫ শতাংশের মতো। ফলে ৮০ শতাংশ শ্রমিকই রাষ্ট্রীয় আইনের সুরক্ষার আওতার বাইরে থাকতে হচ্ছে। শ্রম আইনের আওতার বাইরে থাকা শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রতিকার পাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শুমারি অনুযায়ী, দেশে ছয় কোটি ৩৫ লাখ শ্রমশক্তি রয়েছে। এর মধ্যে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে রয়েছে পাঁচ কোটি ৬৫ লাখ। বাকিরা প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন।
জানতে চাইলে বিলুপ্ত শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, এবারের শ্রম আইন সংশোধনীতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল। সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে সুপারিশে তারা রাষ্ট্রের সব শ্রমিককে শ্রম আইনে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সামাজিক নিরাপত্তার কথা বলেছেন। অথচ তা আমলে আনা হয়নি। এতে অন্তত অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অন্তত ৮০ শতাংশ শ্রমিককে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বাইরে থাকতে হচ্ছে। এ রকম বিশাল শ্রমিক গোষ্ঠীকে আইনের বাইরে রেখে আইনটিকে সার্থক শ্রম আইন বলা যায় না।
তিনি বলেন, ক্ষতিপূরণের মতো মৌলিক দাবির বিষয়ে আইনে কিছুই বলা হয়নি। বকেয়া মজুরির ক্ষেত্রে বিধান কী হবে, সেগুলো কোথাও নেই। বরং মালিকদের জন্য সুবিধাজনক হয় এ করম কয়েকটি ধারা রাতারাতি বদলে দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকের সংজ্ঞা থেকে কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়া, প্রভিডেন্ট ফান্ড, এক কারখানায় পাঁচ থেকে ট্রেড ইউনিয়ন তিনটি নামিয়ে আনা। এসব পরিবর্তন সরকার, মালিক ও শ্রমিক– ত্রিপক্ষীয় সুপারিশকে পাশ কাটিয়ে এককভাবে বিল পাসের আগে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত। এই বিল বা আইনে শ্রমিকের স্বার্থ সুরক্ষা হবে না। ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজ করা ও গৃহ শ্রমিকদের আইনে অন্তর্ভুক্ত করার বাইরে সংশোধিত শ্রম বিলে ইতিবাচক আর কিছু নেই।
আলোচিত ট্রেড ইউনিয়ন প্রসঙ্গে শ্রম (সংশোধন) বিলে বলা হয়, কোনো কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা ২০ জনের সম্মতিতে ট্রেড ইউনিয়ন করা যাবে। এতদিন ট্রেড ইউনিয়ন হিসেবে নিবন্ধন পেতে কোনো প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শ্রমিকের সই স্বাক্ষর থাকার শর্ত ছিল। তবে ২০ শ্রমিককে ট্রেড ইউনিয়ন করতে হলে ওই প্রতিষ্ঠানে মোট শ্রমিকের সংখ্যা সর্বনিম্ন ২০ জন থেকে সর্বোচ্চ ৩০০ জনের মধ্যে হতে হবে। বাকি ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের মোট শ্রমিকের সংখ্যার অনুপাতে ট্রেড ইউনিয়ন করতে বিভিন্ন হারের কথা বলা হয়েছে। যেমন, মোট শ্রমিকের সংখ্যা ৩০১ থেকে ৫০০ জনের মধ্যে হলে ৪০ জন, ৫০১ থেকে এক হাজার ৫০০ হলে ৫০ জন, এক হাজার ৫০১ থেকে তিন হাজার মধ্যে হলে ১০০ জন এবং তিন হাজার একজনের বেশি শ্রমিক সংখ্যা যতই হোক ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন পেতে ৩০০ শ্রমিকের সই স্বাক্ষরের প্রয়োজন হবে। তবে একটি প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ তিনটি ট্রেড ইউনিয়ন থাকতে পারবে, যা আগে ছিল পাঁচটি। এ ছাড়া কোনো শ্রমিক একাধিক ট্রেড ইউনিয়নে সংযুক্ত থাকতে পারবে না। এ রকম ক্ষেত্রে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি প্রসঙ্গে বিলে বলা হয়, কোনো শ্রমিক কিংবা ট্রেড ইউনিয়নের কোনো সদস্যকে কোনো কারণে চাকরির অবসান করা হলে কালো তালিকাভুক্ত করে নোটিশ জারি করা কিংবা তথ্যভান্ডারে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। কালো তালিকাভুক্তি নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অস্বস্তি রয়েছে। সাধারণত কোনো শ্রমিককে অসদাচরণের কারণে চাকরিচ্যুত করা হলে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়ে থেকে। তথ্যভান্ডারে তালিকাভুক্ত শ্রমিককে কোনো কারখানা কাজে নেয় না।
এ ছাড়া পাঁচ বছরের পরিবর্তে প্রতি তিন বছর পর মজুরি বোর্ড গঠন, বার্ষিক উৎসব ছুটি ১১ দিন থেকে বাড়িয়ে ১৩ দিনে উন্নীত এবং মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২০ দিন করা হয়েছে। ১০০ বা তার বেশি শ্রমিক কর্মরত আছেন এমন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে দুই-তৃতীয়াংশ শ্রমিকের লিখিত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যৎ তহবিল গঠন অথবা জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের প্রগতি স্কিমে অংশগ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে। এই আইনে কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা ও জেন্ডার সমতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গত অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশের আলোকে গত ১৭ নভেম্বর জারি করা ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ বিল আকারে পাস হয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন করলে এটি আইনে পরিণত হবে। এরপর বিধিমালা প্রণয়ন ও পাসের মাধ্যমে আইনের প্রয়োগ শুরু হবে। বিলটি পাসের সময় অধিবেশনে জানানো হয়, এই আইন পাস হওয়া কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা এবং শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের প্রতিফলন। এটি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মানদণ্ড নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার ধরে রাখার পাশাপাশি জিএসপি প্লাস সুবিধা প্রাপ্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশের বৃহত্তম একক রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রের ১১ দফার বাস্তবায়নেও এটি কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
বিশিষ্ট শ্রমিক নেতা ও সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ৮০ শতাংশ শ্রমিক এখনও রাষ্ট্রীয় আইনের স্বীকৃতির বাইরেই রইল। কৃষি খামারের শ্রমিকরা আগেও আইনের আওতায় ছিলেন। এবার শুধু সংজ্ঞাটা স্পষ্ট করা হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, মাতৃত্বকালীন ছুটি এ রকম অনেক বিষয়ে আইনে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। যেগুলো শ্রমিক এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রধান উদ্বেগের বিষয় ছিল। এখন বিধিমালা হলে বোঝা যাবে এসব সুরক্ষা কতটুকু প্রয়োগ হবে।
প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের নিট ক্যাটেগরির পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থার নির্দেশনায় অন্তর্বর্তী সরকার ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ কমিটির সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে আইনের কিছু ধারায় কৌশলে অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তি তৈরি করার অপচেষ্টা করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দূতাবাস, যারা বাংলাদেশের শ্রম আইন সংস্কার ও সংশোধনীতে নির্দেশনামূলক ভূমিকা রেখেছে, তারা যেন বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের আন্তর্জাতিক ক্রেতা গোষ্ঠী ন্যায্য ও নৈতিক মূল্য দিচ্ছে কিনা, সেটাও তদারকি ও নজরদারিতে রাখে। অন্যথায় দিনশেষে শিল্পকলকারখানা ও শ্রমিক উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
- বিষয় :
- শ্রম অধিকার
- বিল পাস
- আইন
