মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে রপ্তানির ওপর চাপ পড়েছে, প্রভাব ফেলতে পারে রেমিট্যান্সেও: বাণিজ্যমন্ত্রী
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ | ১৭:২১ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৯
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতায় বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর চাপ পড়েছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্সের ওপরও চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
আজ সোমবার সংসদের বৈঠকে প্রশ্নোত্তরে বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য (পাবনা-৫) শামসুর রহমান শিমুলের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী এ কথা বলেন। এর আগে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।
ওই সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যে প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে এবং বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। বাংলাদেশ থেকে প্রধানত তৈরি পোশাক, ওষুধ, হিমায়িত খাদ্য ও চামড়াজাত ইত্যাদি পণ্য সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের বাজারে রপ্তানি হয়ে থাকে।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে চলমান অস্থিরতা জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রয়েছে, যার আমদানি ব্যয়, শিপিং ও বীমা খরচ বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে রপ্তানি হ্রাস, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টির আশংকা তৈরি করেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে রপ্তানির ওপর কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে। এটি দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্সের ওপরও চাপ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি জানান, চলমান সংকট মোকাবিলায় সামগ্রিক পরিস্থিতি সরকার পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি লজিস্টিক ব্যয় কমানো, যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট এলাকার বাইরের দেশগুলোতে বাজার সম্প্রসারণের চেষ্টাসহ বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা সংসদে তুলে ধরেন।
ঢাকা-১৮ আসনের এমপি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর জানান, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ ছাড়া অন্য সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি সব চেয়ে বেশি।
মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, ভারতের সাথে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ সাত হাজার ৮৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়া অন্যান্য দেশের মধ্যে পাকিস্তানের সাথে ৬৮১ মিলিয়ন, আফগানিস্তানের সাথে ১০ দশমিক ৭১ মিলিয়ন, ভুটানের সাথে ২৯ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন বাণিজ্য ঘাটতি হয়েছে। অপরদিকে নেপালের সাথে ২৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন, শ্রীলঙ্কার সাথে ৬ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ও মালদ্বীপের সাথে দুই দশমিক ৮৫ মিলিয়ন বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে।
কুমিল্লা-৯ আসনের এমপি আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী সংসদে গত ৫ বছরের রপ্তানি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থ বছরে রপ্তানি আয় ৪৫ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন, ২০২১-২২ অর্থ বছরে রপ্তানি আয় ৬০ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে রপ্তানি আয় ৫৩ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে রপ্তানি আয় ৫১ দশমিক ১১ বিলিয়ন এবং ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে রপ্তানি আয় ৫৫ দশমিক ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জাতীয় বাজেটে বিভিন্ন পণ্যের উপর আরোপিত আমদানি শুল্ক হ্রাস অথবা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১১০টি পণ্যের শুল্ক রহিত এবং ৬৫টি পণ্যের শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে।
পরে সম্পূরক প্রশ্নে জ্বালানী তেলের মূল্যবৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিনা, নিলে সেটা কী? তা জানতে চান।
জবাবে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে না বলে মনে করেন বাণিজ্য মন্ত্রী। এর কারণ ব্যাখ্যা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রথমে মূল্যস্ফীতিটা সেভাবে বৃদ্ধি পাবে না কেন এটা একটু বোঝা দরকার। সারা পৃথিবীতে জ্বালানির মূল্য যে অনুপাতে বৃদ্ধি পেয়েছে তার তুলনায় বাংলাদেশে মূল্য বৃদ্ধি অত্যন্ত সামান্য।
মন্ত্রী বলেন, আমেরিকায় স্টেট টু স্টেট ভেরি করে, তাদের নিজস্ব ট্যাক্সের কারণে। এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে অনেক স্টেটে জ্বালানি তেল প্রতি গ্যালন ২ ডলার ৭০ থেকে ৮০ সেন্ট ছিল। তা ৫ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে। আশেপাশের যেকোনো দেশ অথবা বাংলাদেশের সাথে তুলনীয় যেকোনো অর্থনীতির সঙ্গে তুলনা করলে তুলনামূলকভাবে জ্বালানি, পেট্রোলিয়াম পণ্যের মূল্য প্রত্যেকটা দেশে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকগুলো দেশে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির এই প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়। এটার জন্য সরকারের আলাদা পদক্ষেপ নিতে হয় না।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের এখানে যে বৃদ্ধিটা হয়েছে, ১০০ টাকার ডিজেলকে আমরা ১১৫ টাকা করেছি। আমি শুধু বোঝার জন্য বলছি, একটা শিল্প কারখানায় তাদের যে কস্ট অব প্রোডাকশন থাকে, তার মধ্যে ৭ থেকে ৮ শতাংশ থাকে জ্বালানির মূল্য। সেই ৭ থেকে ৮ পারসেন্টের যদি ১০০ পারসেন্ট ধরি তার ১৫% ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি পায়, তবে তা মোট খরচে খুব সামান্য প্রভাব ফেলে। একইভাবে পরিবহনের ক্ষেত্রে, ২০০ কিলোমিটার একটা বাস রান করার জন্য কমবেশি ২৫-৩০ লিটারের মতো ডিজেল লাগে। এই ৩০ লিটার ডিজেলের ক্ষেত্রে সাড়ে চারশো টাকার মতো মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে। এই ৩০ লিটার যদি আমি ট্রাকের পণ্য পরিবহনের জন্য হিসাব করি, তবে এই বাড়তি মূল্যের ভাড়াটা পড়বে ১০ হাজার কেজি পণ্যের উপরে।’
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, তার মানে এমনি শুনলেই যেটা মনে হয় যে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু আমরা যদি পরিবাহিত পণ্যের ইউনিটের হিসাব করি, তাহলে সেই বৃদ্ধিটা মূল্যস্ফীতির জন্য ওরকম উদ্দীপক বা এলিমেন্ট না। এটা ঠিক আপনি অর্থনীতিকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যেতে পারবেন না, যেখানে ফান্ডামেন্টাল ব্যালেন্সটা ইমব্যালেন্স হয়ে যায়। সেজন্য পৃথিবীর সব দেশ যে নীতি নিয়েছে আমরা সেই নীতি মডেসলি নিয়েছি এবং খুবই একটা মডারেট মূল্য বৃদ্ধি করেছি।’
- বিষয় :
- জাতীয় সংসদ
- বাণিজ্যমন্ত্রী
- রপ্তানি
- রেমিট্যান্স
